পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : গাজায় ইসরাইলি হামলায় আলজাজিরার পাঁচ সাংবাদিক নিহত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ ও শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের বিচারের দাবিও জোরাল হচ্ছে। গত রোববার গভীর রাতে গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান ফটকের বাইরে একটি গণমাধ্যমের তাঁবুতে ইসরাইলি হামলা চালানো হয়। এতে নিহত হন আলজাজিরার সংবাদদাতা আনাস আল-শরীফ (২৮), সহকর্মী মোহাম্মদ কুরাইকেহ (৩৩), ইব্রাহিম জাহের (২৫), মোহাম্মদ নুফাল (২৯) ও মুয়ামেন আলিওয়া (২৩)।
আলজাজিরা জানায়, হামলায় আরো দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন। এতে মোট মৃতের সংখ্যা সাতজন। গাজার সরকারি গণমাধ্যম দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৩৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডে বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় ফিলিস্তিনিরা রাস্তায় নেমে পতাকা ও নিহত সাংবাদিকদের ছবি হাতে শোক মিছিল করেন। তিউনিসিয়ায় শত শত মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে হামলার জবাবদিহি দাবি করেন।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্ট ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ডাবলিনে বিক্ষোভ হয়, জার্মানির বার্লিন ও নেদারল্যান্ডসে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি, ব্রিটেনের লন্ডন, নরওয়ের অসলো ও সুইডেনের স্টকহোমেও বিক্ষোভ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এনবিসি, ফক্স নিউজ, আইটিএন ও দ্য গার্ডিয়ানের অফিস ভবনের বাইরে সমবেত হন বিক্ষোভকারীরা।
তারা সেখানে হাঁড়ি-পাতিল বাজিয়ে ভেতরে চলমান লাইভ সম্প্রচার বিঘিœত করার চেষ্টা করছিলেন, জানান আলজাজিরার সাংবাদিক শিহাব রাত্তানসি। বিক্ষোভকারীরা বলতে থাকেন, এসব গণমাধ্যমের গাজায় চলমান গণহত্যা বিষয়ে পক্ষপাতদুষ্ট প্রচার ইসরাইলকে এত বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি ও সাংবাদিক হত্যার সুযোগ দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বার্তা ছিল, ‘তোমরা তো সত্য প্রচার থেকে বিমুখ। তোমাদের এই কাভারেজে কিছু যায় আসে না, আমরা জানি গাজায় গণহত্যা চলছে।’
‘সাংবাদিকদের তালিকা ধরে হত্যা করছে ইসরাইলি বাহিনী’ : গাজায় কর্মরত সাংবাদিকরা সরাসরি টার্গেটের শিকার হচ্ছেন, এমনকি তাদের নাম ইসরাইলি বাহিনীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে যাতে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা যায়। গাজা যুদ্ধ কভার করা এক সাংবাদিক এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর মেহের নিউজের।
গাজার পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাওয়ায় স্থানীয় সাংবাদিকরা অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে খবর সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৭০ জন সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীকে হত্যা করেছে ইসরাইল। রোববার ইসরাইলি বাহিনী আলজাজিরার পাঁচজন কর্মীকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে ছিলেন আলজাজিরা সাংবাদিক আনাস আল-শরীফ ও মোহাম্মদ কারাকা, ফটোগ্রাফার ইব্রাহিম জাহের ও মোহাম্মদ নোফাল। এই হামলাটি গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের বাইরে তাদের মিডিয়া টেন্টে সরাসরি চালানো হয়েছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রমাণ করে সাংবাদিকদের ওপর বাড়তে থাকা প্রাণঘাতী হুমকিকে, যারা চলমান সঙ্কট কভার করার চেষ্টা করছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বাস্তবতা বোঝাতে গাজায় কর্মরত একজন স্থানীয় সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।
গাজার যুদ্ধ নথিবদ্ধ করা ফটোসাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ আসাদ মেহের নিউজ এজেন্সিকে বলেন, দুই বছর আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সাংবাদিকরা এমন সব প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন যা বিশ্বের কোনো যুদ্ধ ফটোগ্রাফার আগে কখনো দেখেননি। তিনি বলেন, আমাদের কাছে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন ও জ্বালানি নেই, নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। যেসব বুলেটপ্রুফ ভেস্ট আমরা ব্যবহার করি, সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। আমাদের সরাসরি টার্গেট করা হয়, সাংবাদিকদের নাম সেনাবাহিনীর তালিকায় রাখা হয় পরিকল্পিত হত্যার জন্য। কেউ কেউ ‘রেড জোন’-এ টার্গেট হয়েছেন, আবার কেউ রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন।
আসাদ আরো জানান, তাদের বাড়ি ও অফিস ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে, ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতিপূরণের কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পাশাপাশি, কখনো কখনো যে মোবাইল ফোন দিয়ে খবর পাঠানোর চেষ্টা করি, তার ব্যাটারি শেষ হয়ে আসে, সবসময় চার্জ দেয়ার প্রয়োজন হয়। আমরা যতটুকু সম্ভব কাজ করার চেষ্টা করি, কিন্তু অনেক ঘটনায় পৌঁছানো সম্ভব হয় না। অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে যা আমরা নথিভুক্ত করতে পারি না, কারণ তীব্র গুলিবর্ষণ ও দখলদার বাহিনীর আরোপিত সম্পূর্ণ অবরোধে ক্যামেরা দিয়ে সেগুলো ধারণ করাই সম্ভব হয় না। সবশেষে তিনি বলেন, গাজায় যুদ্ধ থামাতে ও সাংবাদিকদের সাহায্য করতে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের অবশ্যই গাজায় আসতে হবে। দূর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে সংহতি জানানো যথেষ্ট নয়, এটা এখানে পরিস্থিতি বদলাতে পারে না। দখলদার বাহিনী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চালানোর ও গাজা উপত্যকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় আসা প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এখানকার সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
গাজায় ইসরাইলি হামলায় আরো নিহত ৮৯, আহত ৫১৩ : গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত হামলায় আরো অন্তত ৮৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩১ জন ত্রাণসেবী রয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৫১৩ জন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে। এ ছাড়া পূর্ববর্তী হামলায় ধ্বংসস্তূপ থেকে আরো ১১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানায় মন্ত্রণালয়।
ইসরাইলি হামলায় নিহত চার আলজাজিরা সাংবাদিকের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে গাজায়। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে লন্ডন, বার্লিন, তিউনিস ও রামাল্লাসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র জার্মানি এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ একে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে।
গাজায় ইসরাইলিদের ভয়াবহতার বর্ণনা দেয়ার ভাষা নেই’ : গাজা উপত্যকায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও মানবিক সহায়তা কর্মী ডা: আকসা দুররানি ইসরাইলি বাহিনীর নির্মম হামলা ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। আলজাজিরা ও হিউম্যানস অব নিউ ইয়র্ক জানায়, জনপ্রিয় ফটো ব্লগ হিউম্যানস অব নিউ ইয়র্ককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি বহু জায়গায় চরম ক্ষুধার মধ্যে কাজ করেছি, কিন্তু এখানে যা সবচেয়ে ধাক্কা দেয়, তা হলো ইসরাইলিদের নিষ্ঠুরতা এটি যে ইচ্ছাকৃত, তা স্পষ্ট। আমি গাজায় দুই মাস ছিলাম; যা ঘটছে তার ভয়াবহতার বর্ণনা দেয়ার ভাষা নেই। ডা: দুররানি জানান, গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত শিশুদের অবস্থা বীভৎস। কারো হাত নেই, কারো পা, আবার কারো শরীর তৃতীয় ডিগ্রির দগ্ধতায় ঝলসে গেছে। পর্যাপ্ত ব্যথানাশক না থাকায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে। শিশুরা ব্যথার জন্য নয়, ক্ষুধার জন্য চিৎকার করছে ‘আমি ক্ষুধার্ত! আমি ক্ষুধার্ত!
আকসা দুররানি তার ফিলিস্তিনি সহকর্মীদের দুর্দশার কথাও তুলে ধরেন, যারা নিজেরাও খাদ্য ও বিশ্রামের সংকটে ভুগছেন, অথচ রোগীদের চিকিৎসা দিতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, তাদের কেউ কেউ তাঁবুতে বসবাস করছেন। কারো কারো পরিবারের ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। গাজায় চলমান ইসরাইলি অভিযানকে ‘স্পষ্টতই এক গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে ডা: দুররানি। তিনি বলেন, এমন বর্বরতা থামাতে না পারায় আমি লজ্জিত।
ইহুদি উপাসনালয়ের দেয়ালে লেখা ‘গাজায় গণহত্যা চলছে’ : ইহুদিদের প্রার্থনা করার জন্য সবচেয়ে পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত জেরুসালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়ালে গাজায় ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। শহরের অন্যত্র অবস্থিত ‘গ্রেট সিনাগগ’র দেয়ালেও একই রকম বার্তা লেখা ছিল। আরব নিউজ জানিয়েছে, ওয়েস্টার্ন ওয়ালের দক্ষিণ অংশের গ্রাফিতিতে হিব্রু ভাষায় ‘গাজায় একটি গণহত্যা চলছে’ লেখা ছিল।
ইসরাইলি পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় ২৭ বছর বয়সী এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আদালতে হাজির করা হবে। এই ঘটনাটি ইসরাইলে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ইসরাইলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেছেন, তিনি ‘হতবাক’। ওয়েস্টার্ন ওয়াল জেরুসালেমের পুরনো শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এটি ইসরাইলি বাহিনী ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইলি যুদ্ধের সময় দখল করেছিল।


