পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ফিলিস্তিনের গাজা সিটি দখলে পরিকল্পিত স্থল অভিযানের ‘প্রাথমিক পদক্ষেপ’ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তারা ইতোমধ্যে অবস্থান নিয়েছে গাজা উপত্যকায়। এ দিকে ইসরাইলি বাহিনীর পরিকল্পিত স্থল অভিযানের খবরে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি শহর ছাড়ছে বলে শহরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। টানা কয়েক দিনের তীব্র বোমা হামলা এবং গোলাবর্ষণের পর শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছে ইসরাইলি সেনারা, যেখানে বসবাস দশ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির। বিবিসি, রয়টার্স।
গত মঙ্গলবার গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনার অনুমোদন দেন ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ। চলতি সপ্তাহে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে ইসরাইলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভায়। এ অভিযানে অংশ নিতে আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৬০ হাজার সংরক্ষিত সেনা তলব করা হচ্ছে। তাদের রণাঙ্গনে লড়াইরত সেনাদের পরিবর্তে মোতায়েন করা হবে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস বলছে, ইসরাইল গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নির্মম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এক বিবৃতিতে হামাস নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘গাজা সিটির নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এনেছে। পাশাপাশি তারা আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের প্রতি তার অবহেলার সমালোচনা করেছে। ইসরাইল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিকল্পনার জবাব দেয়নি। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির জন্য নতুন করে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন একটি আক্রমণ যা অনিবার্যভাবে মৃত্যু ও ধ্বংসলীলা ডেকে আনবে, তা এড়ানো প্রয়োজন।
ইসরাইলের একজন সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে জেইতুন ও জাবালিয়া এলাকায় সেনারা এরইমধ্যে কাজ করছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি গাজায় ‘শেষ সন্ত্রাসী ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলো দখলের জন্য সময়সীমা কমিয়ে আনছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) বলেছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতা বেড়ে গেলে গাজার ২১ লাখ মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
গাজা শহর দখলের ইসরাইলি পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে : হামাস
গাজা সিটি দখলের জন্য ইসরাইলের পরিকল্পিত সামরিক অভিযানও অতীতের মতো ব্যর্থ হবে বলে মন্তব্য করেছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। বুধবার এক বিবৃতিতে এমন মন্তব্য করে হামাস। খবর আনাদোলুর। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বুধবার গাজা শহর দখলের উদ্দেশে অপারেশন ‘গিডিয়নস চ্যারিওটস ২’ নামে অভিযান শুরুর পরিকল্পনা অনুমোদনের পর হামাস এ বিবৃতি দিলো। হামাস বলছে, এই অভিযান আগেরগুলোর মতোই ব্যর্থ হবে। ইসরাইল তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না এবং গাজার দখল আর আনন্দের হবে না।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনাটি গাজা উপত্যকায় ২২ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান গণহত্যা বন্ধে যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তিতে কাজ করা মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টাকে অসম্মান করে। বিবৃতিতে হামাস জোর দিয়ে বলেছে, তারা মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থাপিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ করলেও, ইসরাইলি সরকার শহরটিকে ধ্বংস এবং দক্ষিণে জনগণকে বাস্তুচ্যুত করার লক্ষ্যে গাজার নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।
এতে আরো বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যস্থতাকারীদের প্রস্তাবের প্রতি অবজ্ঞা এবং সাড়া না দেয়া থেকে বোঝা যায় যে, তিনিই চুক্তি লঙ্ঘনকারী, বন্দীদের জীবনের তিনি পরোয়া করেন না এবং তাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আন্তরিক নন। বিবৃতিতে মধ্যস্থতাকারীদের প্রতি ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা বন্ধে ইসরাইলের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
গাজার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী রাতভর গাজা শহরে তীব্র বোমাবর্ষণ করেছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে গাজা শহর দখলের পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকের আগে এই হামলা চালানো হয়।
অনাহারে আরো মৃত্যু : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনাহার ও অপুষ্টিতে আরো দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গাজায় অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭১ জনে, যার মধ্যে ১১২ জন শিশু। তা ছাড়া গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৭০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন ত্রাণ সংগ্রহকারী ছিলেন। আহত হয়েছেন আরো ৩৫৬ জন। মে ২৭ তারিখে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থার মাধ্যমে নতুন ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা চালু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২,০৩৬ জন ত্রাণ সংগ্রহকারী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৫,০৬৪ জনের বেশি।
গাজায় ৮০ শতাংশের বেশি ত্রাণ কেন্দ্র ধ্বংস : গাজায় আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিন থেকেই ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের মানবিক সহায়তার কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে উপকূলীয় এই অঞ্চলের মানুষ খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে চরম সঙ্কটে পড়েছে। গাজার ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের মহাপরিচালক আমজাদ শাওয়া আলজাজিরাকে বলেন, ফিলিস্তিনি নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো বহুবার হামলার শিকার হয়েছে। এতে ২৩০ জন ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন, শত শত আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮০ শতাংশ ত্রাণকেন্দ্র ও অফিস ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, এই সংগঠনগুলো এখন তীব্র আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এ দিকে আল-খাইর ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আল-নাজ্জার বলেন, স্থানীয় মানবিক সংগঠনগুলোকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার সৃষ্টি এখন সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি বলেন, এই ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠান, যা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো ত্রাণ বিতরণকে ব্যক্তিগত কোম্পানি ও দক্ষিণ গাজার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে বেসরকারীকরণ করা।
গত তিন দিনে গাজায় মাত্র ২৫০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ : গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, গত তিন দিনে মাত্র ২৫০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করেছে। এর বেশির ভাগই লুট হয়ে গেছে। তারা বলেছে, এই সময়ের মধ্যে ১,৮০০টি ট্রাক প্রবেশ করার কথা ছিল, যা থেকে অনেক কম সংখ্যক ট্রাকই পৌঁছেছে।
অফিস আরো জানিয়েছে, ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞার কারণে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যসামগ্রী গাজায় ঢুকতে পারছে না। এর মধ্যে রয়েছে ডিম, লাল গোশত, মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য, সবজি এবং পুষ্টি-সম্পূরক। তারা আরো বলেছে, এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য ইসরাইল ও তার মিত্রদের সম্পূর্ণভাবে দায়ী করা হচ্ছে। তারা জাতিসঙ্ঘ, আরব ও ইসলামী দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ‘সাংঘর্ষিক এলাকাগুলোর সীমান্ত খুলে দেয় এবং খাদ্য, শিশুখাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধসহ ত্রাণ প্রবাহ নিশ্চিত করে। একই সাথে যেন বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সঙ্ঘটিত অপরাধের জন্য দখলদার শক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়।
পশ্চিমতীরে ৩৪০০ বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন
ফিলিস্তিনের দখলকৃত পশ্চিমতীরের একটি এলাকায় বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সতর্ক করেছে, প্রকল্পটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কার্যকর করার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ হবে। তীব্র আন্তর্জাতিক বিরোধিতার কারণে বছরের পর বছর ধরে স্থগিত থাকা জেরুসালেমের পূর্বে ‘ই১’ নামে পরিচিত প্রকল্পটি বুধবার (২০ আগস্ট) অনুমোদন দেয়া হয়।
জাতিসঙ্ঘ প্রধান অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এটি কার্যকরভাবে পশ্চিমতীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করবে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ সৃষ্টি করবে। গত সপ্তাহে ইসরাইলের কট্টর-ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ জেরুসালেম ও ইসরাইলি বসতি মালে আদুমিমের মধ্যে অবস্থিত অতি-সংবেদনশীল জমিতে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন। ১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলের সমস্ত বসতি আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) সর্বশেষ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান বাস্তবায়নের, একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ক্ষুণœ করে। এটি ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত ঐক্যকে ভেঙে দেবে। এতে আরো বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপের ফলে পশ্চিমতীরকে বিচ্ছিন্ন এলাকা এবং ক্যান্টনে বিভক্ত করা হবে, যা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রকৃতপক্ষে কারাগার হয়ে উঠবে।


