এই সময় । আমিনুল ইসলাম কাসেমী
গীবতে গীবতে ক্ষয়ে যায় ঈমান-আমল
বড় আফসোস! বড় দুঃখজনক কথা, নিজেরাই নিজেদের ঈমান – আমল ধ্বংস করে ফেলছি। যুগ যুগ ধরে মেহনত- মুজাহাদা-কোরবানীর বিনিময়ে অর্জিত নেক আমলগুলো ঠুস হয়ে যাচ্ছে সব। নিমিষেই বরবাদ হচ্ছে সব কিছু। একদম রিক্ত হস্ত। কোন কিছু আর অবশিষ্ট থাকছে না। আমরা নিজের পায়ে নিজেই বসাচ্ছি কুড়ালের আঘাত। নিজের চলার যোগ্যতা হারিয়ে অসহায়ত্বের রাস্তা অবলম্বন করছি। বড় পরিতাপের বিষয়। আমরা বুঝমান- জ্ঞানী- সচেতন হওয়ার পরেও আমরা যেন উদাসীন। কোন খবর নেই। একেবারে বেখবর।
গীবত মহাপাপ। কবিরা গোনাহ। পবিত্র কুরআনের ইরশাদ হয়েছে, ওয়ালা ইয়াগতাব বা’জুকুম বা’জা” তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না।( সূরা হুজুরাত)
বহু হাদীসে গীবত-শেকায়েতের ব্যাপারে খুব সতর্ক করা হয়েছে। গীবতকারী জান্নাতে প্রবেশ করবেনা এমনও অসংখ্য হাদীস রয়েছে। হাম্মাম রা. বর্ণনা করেছেন, একদিন আমরা হুযায়ফা রা.-এর সাথে ছিলাম। তাঁর কাছে বলা হলো, একজন লোক মানুষের কথা ওসমান রাঃ এর কাছে বলে থাকে( অর্থাৎ চোগলখোরী করে)। তখন হুজায়ফা রাঃ বললেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, চোগলখোর বেহেস্তে যাবে না। ( বুখারী শরীফ)
এরকম বহু হাদীস বিদ্যমান। গীবতের ভয়াবহতা, গীবতের পরিণাম, সবকিছু উল্লেখ আছে। তারপরেও থামছে না আমাদের বাড়াবাড়ি। লাগামহীন ভাবে ছুটে চলেছে।
শুধু গীবত- শেকায়েতের মধ্যেও আমরা সীমাবদ্ধ নেই। ঐ গীবতের সাথে যুক্ত হয়েছে গালিগালাজ। খিস্তিখেউড়। যাকে-তাকে , যখন- তখন গালিগালাজ করছি। এর থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউ।
আরো বড় দুঃখজনক হলো, আলেম- উলামা এবং আল্লাহর ওলীদেরকে গালিগালাজ করছে কিছু লোক। যে সব আল্লাহ ওয়ালা মানুষগুলো আজ অর্ধশত বছর ধরে মানুষের প্রিয়, যাদের ব্যাপারে মানুষের আস্থা- শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে, তাদেরও অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়া হচ্ছে।
একদিন নয় , দুইদিন নয়, এক বছর নয়, এক যুগ নয়, প্রায় পঞ্চাশ/ ষাট বছর ধরে ইলমে শরীয়ত-মারেফত,ইলমে হাদীস নিয়ে গবেষণায় লিপ্ত। যাদের হাতে গড়ে ওঠেছে হাজার হাজার ওলামায়ে কেরাম, মুহাদ্দিস, মুফতী, মুফাচ্ছির, দায়ী। তাদেরকে অপমান- অপদস্হ করা হচ্ছে। তাদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে কিছু মানুষ।
বড় আশ্চর্য লাগে, গালিগালাজ করা, দোষ চর্চা করা বড় অপরাধ, সেটা জানার পরেও তারা যেন হণ্যে হয়ে ছুটে চলেছে।গোনাহকে আর গোনাহ মনে করছে না। অন্যায়কে অন্যায় ভাবে না। অনৈতিক কাজগুলো যেন তারা পেশা বানিয়ে নিয়েছে।
যারা গালিগালাজ করে, যারা অন্যকে কষ্ট দেয়, যারা অন্যের সন্মানের হানি ঘটায়, তাদের যে আখেরাতে কি পরিণতি হবে, সেটা শুনলে গা শিউরে ওঠে। ভয়ে জড়-সড় হয়ে যেতে হয়। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, তিনি যেন আমাদের হেফাজত করেন।আমিন।
সর্বাপেক্ষা দরিদ্র কে?
হাদীস শরীফে এসেছে, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তোমরা বল প্রকৃত দরিদ্র কে? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন। হে আল্লাহর রাসুল! আমরা তো প্রকৃত দরিদ্র ঐ ব্যক্তিকেই মনে করি যার কাছে কোন টাকা- পয়সা নেই।
উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, প্রকৃত দরিদ্র ওই ব্যক্তি নয় যার কাছে টাকা-পয়সা নেই বরং প্রকৃত দরিদ্র হল ওই ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে উপস্হিত হবে শূণ্য হাতে।অথচ তার আমলনামায় অনেক নামাজ- রোজা-অজিফা,তাসবীহ থাকবে। নফল ইবাদতও বিপুল পরিমাণ থাকবে। কিন্তু অন্যদিকে দেখা যাবে সে কারো সম্পদ মেরে দিয়েছিল।
কাউকে ধোঁকা দিয়েছিল। কারো মনে কষ্ট দিয়েছিল।কাউকে গালি দিয়েছিল। এভাবে সে বহু মানুষের অধিকার নষ্ট করেছিল। এখন সে হকদাররা আল্লাহ তায়ালার সামনে উপস্থিত হয়ে নিজ নিজ অধিকার খর্বিত হওয়ার কথা বলে এর প্রতিকার চাইবে। কিন্তু আখেরাতে তো টাকা- পয়সা, ডলার থাকবে না যে, সেই টাকা -পয়সা, ডলার দিয়ে তার পাওনা পরিশোধ করে দিবে। বরং সেখানে থাকবে শুধু নেকী। ফলে খর্বিত অধিকারের বিনিময়ে তখন পাওনাদারকে আমলনামা থেকে নেকী দেওয়া শুরু হবে। কোন হকদারকে নামাজ দেওয়া হবে।কাউকে রোজা দেওয়া হবে। এভাবে প্রত্যেক হকদার তার অর্জিত নেকীগুলো আপন আপন হক অনুপাতে তার আমলনামা থেকে তুলে নিয়ে যাবে। ফলে তার সব নেক আমল শেষ হয়ে যাবে। আর সে খালি হাত নিয়ে পড়ে থাকবে। নামাজ- রোযা ইত্যাদির বিপুল পরিমাণ নেক আমল থাকা সত্বেও দেখা যাবে পাওনাদারদের হক পরিশোধ করতে গিয়ে তা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তখনও হকদার রয়ে গেছে। তখন আল্লাহ বলবেন, এদের পাওনা পরিশোধ করার পদ্ধতি হল পাওনাদারদের আমলনামায় রক্ষিত গোনাহগুলো এনে এর আমলনামায় রেখে দাও।
সুতরাং ওই ব্যক্তি নেকীর বোঝা নিয়ে এসেছিল কিন্তু পাওনা পরিশোধ করতে গিয়ে সব নেকী শেষ হয়ে গেছে। এখন সে অন্যের বোঝা বহন করে ফিরে যাচ্ছে। এই ব্যক্তি হল প্রকৃত দরিদ্র। ( মুসলিম শরীফ, সুনানে তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে আবু হুরায়রা)
চিন্তা করুন! একজন নেকীর বোঝা নিয়ে কিয়ামতে ওঠার পরেও সে রিক্ত হস্ত হয়ে যাবে। কত আমল ছিল তার। কিন্তু কিছুই থাকবে না। শুধু মাত্র মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কারণে, কাউকে গালি দেওয়ার কারণে, কারো মাল- সম্পদ লুন্ঠন করার দ্বারা সেসব পাওনাদারদের সব দিয়ে দিতে হবে। পরিশেষে যখন কিছু থাকবেনা,তখন অন্যের পাপের বোঝা নিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। বড় বেদনাদায়ক।
বান্দার হকটা এরকমই। কেননা বান্দার হক-অধিকার খর্ব করলে তার খেসারত দিতেই হবে একদিন। দুনিয়াতে খেসারত দিতে হবে আবার আখেরাতে আল্লাহর আজাবের সম্মুখিন হতে হবে তাকে।
অথচ অনেক বড় বড় গোনাহ আছে , যে গুলো আল্লাহর কাছে খাঁটি দিলে তওবা করলে তিনি মাফ করে দিবেন। কিন্তু বান্দার হক নষ্ট করার গোনাহ তিনি মাফ করবেন না।
মুমিনকে গালি দেওয়া ফাসেকী কাজ
মু’মিন কে গালি দেওয়াটা ফাসেকী চরিত্র। হাদীস শরীফে এসেছে, ” ছিবাবুল মু’মিনিনা ফুসুকুন ” মুমিনদের গালি দেওয়া ফাসেকী কাজ। হাদীসটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ ও হযরত জাবের রাঃ প্রমুখ বড় বড় সাহাবী বর্ণনা করেছেন।( জামেয়ে সগীর)
একজন সাধারণ মুমিনকে গালি দেওয়া যদি ফাসেকী কাজ হয়, তাহলে একজন আল্লাহর ওলীকে গালি দেওয়া কত বড় অপরাধ। কিছু ভাই তো কোন কিছু মানেন না। কোন মুরুব্বী মানেন না। কোন বুজুর্গ -ওলী কোন কিছু তারা পরওয়া করেন না। নিজের মতের খেলাফ হলেই গালি বর্ষন করতে থাকেন।
একজন আলেম, শায়খুল হাদীস, আবার তিনি হাজারো মুহাদ্দিস-শায়খুল হাদীসের উস্তাদ। তরিকতের লাইনে শায়েখে কামেল, তাঁর শত শত খলিফা। এমন ব্যক্তিকে মুর্খ-আনপড় লোকেরা গালি দিচ্ছে। অথচ যিনি গালি দিচ্ছেন, তার বয়সটা হবে ঐ বুজুর্গ আলেমের নাতির বয়সের সমতুল্য।
একজন মানুষের ভুল হতে পারে। কেউ কিন্তু ভুলের উর্ধে নয়। তাই বলে আমরা তাঁকে গালিগালাজ করব? এমনও হতে পারে তিনি তাঁর ভুল থেকে ফিরে আসতে পারেন। একজন বয়োবৃদ্ধ আলেমের হাজারো অবদান। পঞ্চাশ/ ষাট বছর ধরে আলেম তৈরী করছেন। সামান্য ভুলের কারণে তাঁকে অপমান- অপদস্হ করা হবে? যুগের পর যুগ তিনি যে অবদান রেখে আসছেন, সেটাকি বৃথা যাবে?
একটা জঘন্যতম কাজ। গালি দেওয়া কোন ভাল মানুষের খাছলৎ হতে পারেনা।
অন্য হাদীসে রয়েছে, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সাথে দুশমুনি করবে আমার পক্ষ থেকে যুদ্ধ ঘোষণা।(বুখারী শরীফ, মেশকাত) উক্ত হাদীসটি আবু হুরায়রা রাঃ এর সুত্রে বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে।
এবার বলুন তো, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার সামর্থ্য কার আছে। কোন শক্তি আছে আল্লাহর শক্তিকে মোকাবেলা করবে। কেউ কোন আল্লাহর ওলীর সাথে দুশমুনি করা মানেই আল্লাহর সাথে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হওয়া। অন্য হাদীসে আছে , যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীকে লাঞ্ছিত করল, সে মোকাবেলা করার জন্য আমার সামনে এসে গেল।( ফতহুলবারী)
কে আছে আল্লাহর সাথে মোকাবেলা করবে। কারো কি সাধ্য আছে? তাহলে কেন আমরা আল্লাহর ওলীদের কে লাঞ্ছিত করব। কেন অপমান- অপদস্থ করব দেশ সেরা আলেমদের।
একটু ভাবা দরকার। কি করছি আমরা। নিজেরা ইসলামী লেবাসধারী হয়ে, ইসলামী সংগঠনের পরিচয় বহন করে, কেউ আলেম সেজে, বয়োজৈষ্ঠ আলেমদের শানে বিষোদগার করে যাচ্ছি। বড় পরিতাপের বিষয়।
প্রকৃত মুসলমান কে?
প্রকৃত মুসলমান হল, যার হাতের দ্বারা, মুখের দ্বারা অন্য মুসলমান নিরাপদ। হাদীস শরীফে আ্ছে, আল মুসলিমু মান ছালিমাল মুসলিমুনা মিল লিছানিহি ওয়া দিহি। প্রকৃত মুসলমান সেই, যার হাত থেকে, মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে।( বুখারী ও মুসলিম)
এবার বলুন! যারা গালিবাজ, যারা আল্লাহর ওলীদের গালি দেয়, কোন মানু্ষকে কষ্ট দেয়, সে কি প্রকৃত মুসলমান? কশ্চিনকালেও সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারবে না। মুসলমান হতে হলে নিজের যবান, নিজের হাতকে কন্ট্রোল করতে হবে। অন্য কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
মুসলমানের ইজ্জত সন্মান অনেক বড় জিনিস। ইসলামে একজন মানুষের ইজ্জত – আব্রু হেফাজতের ব্যাপারে খুবই সজাগ। কারো ইজ্জতের হানি হোক, এটা কোনদিন ইসলামে চায় না। কোন মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া কবিরা গোনাহ। মদ খাওয়া, জিনা- ব্যভিচার, ডাকাতি যেমন বড় গোনাহ তদ্রুপ কোন মানুষকে কষ্ট দেওয়া, কারো ইজ্জত হানি করা কবিরা গোনাহ।
ইবনে মাজাহ শরীফে আছে, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করছিলেন। সঙ্গে ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি তাওয়াফ করার সময় লক্ষ্য করলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা শরীফকে লক্ষ্য করে বলছেন- হে বায়তুল্লাহ! তুমি কতনা মর্যাদাময়। সন্মানিত পুত- পবিত্র। কিছুক্ষণ পর আমি শুনতে পেলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করছেন, কিন্তু একটি জিনিস এমন আছে যার মর্যাদা ও পবিত্রতা তোমার চাইতেও অনেক বেশী। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: বলেন একথা কানে পড়তেই আমি চমকে গেলাম। বায়তুল্লাহ থেকে বেশী সন্মানিত পবিত্র সে আবার কী? শুনলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করছেন, সে হলো একজন মুসলমানের জীবন, তার সম্পদ ও সম্ভ্রম।
সুতরাং মুসলমানের জীবন, সম্পদ, ইজ্জত- আব্রু বায়তুল্লাহর থেকেও দামী এবং সন্মানিত। বায়তুল্লাহকে ধ্বংস করলে যে গোনাহ হবে, তার থেকে বড় অপরাধ কোন মুসলমানের ইজ্জত সন্মান নষ্ট করা এবং কাউকে কষ্ট দেওয়া।
বায়তুল্লাহ ধ্বংস করার জন্য এসেছিল আবরাহার বাদশাহ হস্তিবাহিনী নিয়ে। মহান আল্লাহ তাদের সমুলে ধ্বংস করে দিয়ে ছিলেন। আর সেই বায়তুল্লাহ থেকে অধিক সন্মানী হলো, মুসলমানের মান- মর্যাদা। একজন ওলীর শান- মান নিঃসন্দেহে অনেক উপরে। তাঁর ইজ্জত- আব্রুর দাম অনেকগুন বেশী। সুতরাং কোন আলেম,কোন আল্লাহর ওলীকে গালি দেওয়া কত বড় গোনাহের কাজ চিন্তা করে দেখুন।
এজন্য সাবধান! ছাত্র বন্ধু,দ্বীনদার ভাই,মুসলিম ভাই, যবানের হেফাজত করুন। জবানকে, হাতকে কন্ট্রোল রাখুন। আর বেপরোয়া গতিতে চালাবেন না। রসিয়ে রসিয়ে আর কারো গীবত- শেকায়েত নয়। মুখে তালা লাগাতে হবে। নচেৎ গীবত – শেকায়েতের কারণে ঈমান আমল ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে চলে যাবে।
আল্লাহ আমাদের ঈমান আমলকে হেফাজত করার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


