চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : অস্থির সময় যাচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে। নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর দলের হাল কে ধরবেন-এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। কারণ মহিউদ্দিন চৌধুরীর মানের নেতা এখন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে নেই। দলের সহসভাপতিদের মধ্যে যারা সিনিয়র, তারা বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বাকিদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছে নেতাকর্মীদের মনে। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরউদ্দীনকেই মহিউদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত করা হচ্ছে কি নাÑএ নিয়েও চায়ের টেবিল গরম এখন এই বন্দর নগরে।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতে তার জন্য আয়োজন করা মেজবানে ১০ জনের মৃত্যুতে হতভম্ব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে ওই শূন্যপদটি পূরণ করার জন্য একক কোনো নেতাকে ভাবতে পারছেন না ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীরা। কারণ প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমকক্ষ অন্য কোনো নেতা নেই বন্দর নগরে। এখন নেতৃত্ব নির্বাচনে কেন্দ্রের দিকে চেয়ে আছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এদিকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে আ জ ম নাছিরউদ্দীনকে সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করলেও কারো আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একজন নেতা। কারণ নগরীর মেয়র ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এরই মধ্যে দলে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন আ জ ম নাছির।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের এক নম্বর সহসভাপতি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর জহুর আহমেদ চৌধুরীর ছেলে মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। নিয়ম অনুযায়ী তাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে ঘোষণা করার কথা। কিন্তু মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিকভাবে অনেকটা অক্ষম। এ অবস্থায় প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনোনীত করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে মন্ত্রিত্ব ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনÑদুটি একসঙ্গে করবেন কি নাÑএ নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি দলে তেমন একটা সক্রিয় না। মহানগর আওয়ামী লীগের বাকি জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে আছেনÑমহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. আফসারুল আমিন চৌধুরী এমপি, খোরশেদ আলম সুজন ও মুক্তিযোদ্ধা নঈম উদ্দিন। এদের মধ্যে দলীয় সভা-সমাবেশে নিষ্ক্রিয় থাকেন আফসারুল আমিন চৌধুরী। এ ছাড়া দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কিছু নেতার সঙ্গে দূরত্ব রয়েছে সাবেক এই মন্ত্রীর। অন্যদিকে খোরশেদ আলম সুজন সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় থাকলেও তাকে মূল্যায়ন করা হবে কি না বলা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে খোরশেদ আলম সুজন একসময় বাকশাল করার কারণে আওয়ামী লীগের অনেকে তাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাও এর বাইরে যাবেন না বলে অনেকে মত দিয়েছেন। নঈম উদ্দিন মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হলেও এত বড় দল চালানোর ব্যাপারে তাকে নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে। এসব সমীকরণে শেষ পর্যন্ত আ জ ম নাছিরের সভাপতি পদে আসার সম্ভাবনা প্রবল বলে মনে করছেন বেশির ভাগ নেতাকর্মী।
সূত্রমতে, মেয়র নাছিরের বিরুদ্ধে নানান নেতিবাচক গল্পের ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত। এদিকে একাধিকবার চেষ্টার পরও গণভবনে নাছিরকে সাক্ষাতের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বারবার ফিরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন তার বিরক্তির কথা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ করে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনায় আসেন আ জ ম নাছির। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কার্যত নাছিরের এই ধরনের অভিযোগ ভালোভাবে নেননি প্রধানমন্ত্রী। নারায়ণগঞ্জের মেয়রকে উপমন্ত্রী, রংপুরের মেয়রকে যেখানে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়, সেখানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মেয়রের এ ধরনের মর্যাদা নেই। এমন এক অবস্থায় আ জ ম নাছিরকে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে হয়তো আনবেন না শেখ হাসিনা। তবে এসব বিষয় ছাপিয়ে আ জ ম নাছিরকে সভাপতি পদে আনার পেছনে কিছু যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন দলের সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রেও বিবেচনায় আসছে, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আ জ ম নাছিরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এ ছাড়া অনেক বছর ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে থাকার কারণে আ জ ম নাছিরের ভালো যোগাযোগ রয়েছে দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে। এসব কারণে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি পদেও তার নাম আলোচিত হচ্ছে।
গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে জরুরি বৈঠকে বসেন মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, আগামীতে কোনো কর্মসূচি আয়োজনের ক্ষেত্রে উপস্থিত সহসভাপতিদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সভাপতিত্ব করবেন কেউ একজন। পরবর্তীতে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সহসভাপতিদের মধ্য থেকে একজনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনোনীত করা হবে।
সূত্র জানায়, মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দীনকে সভাপতি হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন অনেক নেতা। তবে দল চালানোর জন্য বিকল্প কেউ এ মুহূর্তে নজরে আসছে না বলে তার সম্ভাবনাকে বড় করে দেখা হচ্ছে।
মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছে ২০০৫ সালে। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও কাজী ইনামুল হক দানুর নেতৃত্বাধীন এই কমিটি ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে। এরপর কেন্দ্র থেকে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছিরকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর কমিটির মেয়াদ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। মেয়র পদে নাছিরকে দলীয় মনোনয়ন, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা, চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ, পাথরঘাটায় মৎস্যবন্দর স্থানান্তর, আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিংপুল নির্মাণ ও গৃহকর বাড়ানো ইস্যুতে বিরোধে জড়ান এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং আ জ ম নাছিরউদ্দীন। এদিকে মেয়র আ জ ম নাছিরের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সাংসদ এম এ লতিফেরও। অথচ কিছুদিন আগেও মেয়র আ জ ম নাছিরই ছিলেন রাজনীতিতে এমপি লতিফের ভরসা। বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল ইস্যুতে বিবাদে জড়ান এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে। এর জেরে চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে মহিউদ্দিন অনুসারীদের কাছে নাজেহাল হন এমপি লতিফ। বঙ্গবন্ধুর মুখমন্ডলের সঙ্গে নিজের শরীরে জোড়া লাগানোর ঘটনায় লতিফের পদত্যাগ, বহিষ্কার দাবিতে প্রকাশ্যে সরব হয়ে ওঠেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সেই টালমাটাল সময়ে আ জ ম নাছিরই লতিফকে আগলে রেখেছিলেন। গত সেপ্টেম্বরে বন্দরের সিবিএ নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার মধ্য দিয়ে দুজনের বিভক্তিটা চোখে পড়ে। আ জ ম নাছিরের বাইরে গিয়ে পৃথক প্যানেল ঘোষণা দেন লতিফ। শুরু হয় একে-অপরকে এড়িয়ে চলা। গত ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ড উদ্বোধন অনুষ্ঠান ছিল। এমপি লতিফের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণে সেই অনুষ্ঠানে যাননি নাছির। এর আগে একই দিনে নৌ পরিবহনমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বন্দরসংক্রান্ত একটি মিটিংয়ে মেয়র নাছির ও এমপি লতিফ উপস্থিত থাকলেও কেউ কারো সঙ্গে হাত মেলাননি, কথা বলেননি। গত ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের উপদেষ্টা কমিটির সভায় নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পরে উপস্থিত হন নাছির। এ সময় হাসিমুখে কুশল বিনিময়ে আগ্রহ দেখান অনুষ্ঠান শুরুর পর থেকে উপস্থিত থাকা লতিফ। কিন্তু লতিফের দিকে তাকাননি মেয়র নাছির।


