চতুর্থ সপ্তাহে চলমান ইরানের বিক্ষোভ

চতুর্থ সপ্তাহে চলমান ইরানের বিক্ষোভ

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : স্কুলছাত্রীরা স্লোগান দিচ্ছেন, শ্রমিকরা ধর্মঘটে যোগ দিয়েছেন এবং দেশজুড়ে রাজপথে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। কুর্দি তরুনী মাহশা আমিনি হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হওয়া বিক্ষোভ চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানোর পর এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে ইরানে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এমন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

২২ বছর বয়সী মাহশা আমিনি ১৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর পর এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ইরানে নারীদের জন্য কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের দায়ে তাকে তিন দিন আগে গ্রেফতার করেছিল দেশটির নৈতিকতা পুলিশ।

শুক্রবার কর্তৃপক্ষের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, মাথায় আঘাতে নয়, পুরনো অসুস্থতায় মৃত্যু হয়েছে আমিনিরি। যদিও নিহতের পরিবার দাবি করেছে, তিনি সুস্থ ও সবল ছিলেন। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।

তেহরানের নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় আল-জাহরা ইউনিভার্সিটির নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু উপলক্ষে শনিবার প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশ করেছেন। ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রী রাইসির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছেন।

সরকার চলমান বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করছে। একই সঙ্গে সশস্ত্র ভিন্নমতালম্বীদেরও বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য দায়ী করছে তেহরান। চলমান সহিংসতায় এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ২০ সদস্য নিহত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাইসি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে বলে কল্পনা করছে। তাদের জানা নেই আমাদের শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকরা সতর্ক এবং শত্রুদের লক্ষ্য অর্জন করতে দেবে না।

কুর্দিস্তান প্রদেশে নিহত আমিনির নিজ শহর সাকেজে স্কুলছাত্রীরা স্লোগান দিচ্ছে, ‘নারী, জীবন, মুক্তি’ এবং মাথার ওপর হিজাব উড়িয়ে তাদের রাজপথে মিছিল দিতে দেখা গেছে।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আরেক দল ছাত্রী একই স্লোগান দিচ্ছে যখন তারা কুর্দিস্তানের রাজধানী সানন্দাজের একটি স্কুলে প্রবেশ করছে।

টুইটারে আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সানন্দাজে একটি গাড়ির চালকের আসনে বসা অবস্থায় এক ব্যক্তি গুলিতে নিহত হয়েছেন। অপর ফুটেজে গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা তাজাগুলি ব্যবহার করে না। ওই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন প্রতিবিপ্লবীদের গুলিতে।

দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা আইএসএনএ রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভ সীমিত বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, শহরের দশটি স্থানে সীমিত বিক্ষোভ ছিল। ধর্মঘটের কথা অস্বীকার করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা অনেক মালিক তাদের দোকান-পাট বন্ধ রেখেছে।

ব্যাপক ধর্মঘট

বিক্ষোভকারীদের সমবেত না দেওয়া এবং দমন-পীড়নের ছবি প্রকাশ যাতে না হয় সেজন্য ইন্টারেনেট পরিষেবা সীমিত করা হয়েছিল। তবে বিক্ষোভকারীরা বিকল্প কৌশল অবলম্বন করে সবার কাছে বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

মধ্যাঞ্চলীয় তেহরানের মডারেস মহাসড়কে একটি বড় ব্যানার টানানো হয়েছে। এতে লেখা রয়েছে, ‘আমরা আর ভয় পাই না। আমরা লড়াই করব।’

নরওয়েভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, সাকেজ, সানন্দাজ ও দিভানদারেহ শহর ও পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের মাহাবাদেও ব্যাপক ধর্মঘট চলছে।

একটি সোশাল মিডিয়া চ্যানেলে দাবি করা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শিরাজে বিক্ষোভ হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক ইরান ওয়ার নিউজ ওয়েবসাইট বলেছে, ইসফাহান ও তাবরিজে বিক্ষোভে যোগ দিতে শিক্ষার্থী ক্লাসে হাজির হচ্ছে না।

বিক্ষোভের মাসে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসি ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ক্ষতি করতে চাওয়া মানুষদের সব পন্থা অবলম্বনের পরও ইসলামিক ইরানের দৃঢ় ও কঠোর পরিশ্রমকারী মানুষেরা ঐক্য ও সম্মিলনের মাধ্যমে সব সমস্যা মোকাবিলা করবে।

নির্বিচার আটক

বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য বারবার বাইরের শক্তিকে দোষারোপ করে আসছে ইরান। গত সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছে, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসসহ ৯ বিদেশিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নির্বিচার আটকের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে শুক্রবার ফরাসি সরকার ইরানে অবস্থানরত নাগরিকদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে।

ডাচ সরকারও নিজেদের নাগরিকদের ইরান সফর এড়াতে বা দেশটিতে অবস্থানরতদের নিরাপদে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। এক বিবৃতিতে দেশটি বলেছে, ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ চলছে যা সহিংসতায় গড়াতে পারে। পুলিশ অনেক সময় কঠোরভাবে পরিস্থিতি দমন করতে পারে। বিদেশি নাগরিকদের নির্বিচারে বন্দি করতে পারে কর্তৃপক্ষ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *