জমহুর ও জামায়াতের ইন্দ্রজাল— একটি পর্যালোচনা

জমহুর ও জামায়াতের ইন্দ্রজাল— একটি পর্যালোচনা

জমহুর ও জামায়াতের ইন্দ্রজাল— একটি পর্যালোচনা

ওয়ালী উল্লাহ মাসুদ :  বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার অনুসারীগণ সংঘবদ্ধ হলে— এটা একটি অজেয় শক্তি। সকলেই এই বাস্তবতাকে স্বীকার করবেন। এটা শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয়, পৃথিবীর তাবৎ গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট হয়তো এমনই। অন্যদিকে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ নামে মিস্টার মওদুদী কর্তৃক ইসলাম নামধারী ক্যাডারভিত্তিক একটি দল আছে এ দেশে। যদিও বলা হয়, ইসলামের দল কিন্তু ইসলামের মৌলিক বিষয় অর্থাৎ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত পরিপন্থী তাদের অনেক বিশ্বাস ও বোধ রয়েছে।

মুফাসসিরগন কুরআনুল কারীমের এক আয়াতকে অন্য আয়াতের ব্যাখা স্বরূপ সমনে থাকেন, সাথে হাদীসে নববী তো আছেই। সুতরাং ইসলামের যে কোন বিষয়ে যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করার জন্য কুরআনুল কারীদের বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্য তালাশ করে ইসলামের বিষয়গুলো প্রমাণ করে থাকেন। সরাসরি এক আয়াতের শাব্দিক তরজমা দিয়ে কোন মৌলিক বিষয় প্রমাণ সাধারণত মুফাসসিরগণ বা উলামায়ে কেরামের মূলনীতিবিরোধী। তাই তাদের সাথে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে কওমি মাদরাসা বা দেওবন্দী আলেমদের সাথে মতবিরোধ সমাজ সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ক্ষমতায়ন এবং প্রতিনিধিত্ব নিয়েও তাদের সাথে মতদ্বৈততা রয়েছে। তারা যে স্টাইল বা রঙে ঢংগে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার কথা বলেন, তার সাথে একমত নন কওমি ঘরানার উলামায়ে কেরাম।

সুতরাং কওমী ঘরানার উলামায়ে কেরাম যেন কখনো একজোট না হতে পারেন। একতাবদ্ধ হয়ে দেশ গঠনের সম্মুখ ভূমিকায় কোনরূপে না আসতে পারেন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কোন পজিশনে যেন কওমী ঘরানায় কেউ আসীন না হতে পারেন, এটা তাদের রাজনৈতিক অন্যতম কৌশল বলে প্রমাণিত সত্য। কারণ কওমী ঘরানার কেউ রাষ্ট্রীয় কোন পদে সমাসীন হলে তাদের ইসলাম কায়েমের মুখরোচক বুলিতে অনেকটা ভাটা পড়ে যাবে। তাই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কর্তৃক দেওবন্দী ধারার রাজনীতি এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এবং বৈরীভাব তৈরীর একটু পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশ হবার আগের আলোচনা করব না, বাংলাদেশ হওয়ার পরে থেকে নিয়ে পর্যালোচনা করছি।

মুসতাজাবুদ দাওয়া হযরত মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. যখন তওবার ডাক দিয়ে রাজনীতির ময়দানে এলেন, তখন জামায়াত প্রথমে হাফেজ্জী হুজুর রহ.কে ভারতের দালাল হিসাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে। যখন এই প্রোপাগান্ডা মানুষকে গিলাতে ব্যর্থ হল তখন তারা অন্য কৌশল আরম্ভ করল। হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর হাতে বায়আত বা মুরীদ হওয়ার বাহানা দিয়ে ঘনিষ্টজন হতে চেষ্টা শুরু করলো এবং সফলও হলো। এর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অধ্যাপক আখতার ফারুক।

উল্লেখ্য যে, হাফেজী হুজুর রহ. এই তওবার রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া প্রায় সব ইসলামী দল একতাবদ্ধ হয়েছিল। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ তাদের দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর খেলাফত আন্দোলনে শরীক হয়। সারাদেশে খেলাফত আন্দোলনের অবস্থান তখন খুবই সুসংগঠিত। এরই মধ্যে হাফেজ্জী হুজির রহ. ইরাক-ইরান দ্বন্দ্ব মেটানোর মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে গেলেন। ঘনিষ্ঠজনদের এক বিরাট বহর হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর সাথে। এই বছরে ঠাঁই করে নিল আখতার ফারুক। মওকা মিলে গেল খেলাফত আন্দোলনকে টুকরো টুকরো করার। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে অধ্যাপক আখতার ফারুক সাহেব এক বই বোমা বিস্ফোরণ ঘটালেন।

কৌতূহলী পাঠক হয়তো বলবেন, আমি কেন একটি বইকে বোমা বললাম? করণ হল ইসলামের বিকৃত সাধন করতে মুনাফিকুনরা সর্বদাই ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এই ষড়যন্ত্র চলমান। ইসলামকে বিকৃতকারী এই মুনাফিকুনদের অন্যতম একদল হল শিআ। ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। সংক্ষেপে বলছি, ইমাম শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. কর্তৃক লিখিত ‘তোহফায়ে ইসনা আশায়ারিয়া’ পাঠে জানা যায়, শিআদের মধ্যে ৭২টি উপদল, এর মধ্যে একটি দল ছাড়া সবাই ভ্রান্ত, সাথে সাথে বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক মাওলানা মনজুর নোমানী রহ. কর্তৃক লিখিত ‘ইমাম খোমেনী আওর ইরানী ইনকিলাব’ নামক বই পাঠে ইমাম খোমেনীর যে বোধ ও বিশ্বাস ছিল তাতে কোনভাবেই মুসলিম বলা যায় না।

অধ্যপক আখতার ফারূক ‘মধ্যপ্রাচ্যের হাফেজ্জি’ নামক বইতে লিখেছেন যে, হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. খোমেনির পেছনে নামাজ পড়েছেন, যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদার বিশ্বাসী অনেক আলেমই মেনে নিতে পারলেন না। যেই জমিয়তে উলামায় ইসলাম নিজেদের দল স্থগিত ঘোষণা করে খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলো, তাদের প্রধান ছিলেন কায়িদুল উলামা হযরত মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া, জমিয়তের তৎকালীন মহাসচিব হযরত মাওলানা শামসুদ্দীন কাসমী, খেলাফত আন্দোলনের কাযা তথা বিচার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক মুহাদ্দীসে আজীম মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদসহ বরেণ্য অনেক উলামায়ে কিরাম খেলাফত আন্দোলন থেকে বেরিয়ে গেলেন, ভেঙে গেল খেলাফত আন্দোলন। এক বইয়ের কারণে কওমী ঘরানার আলেমগণ একসাথে আর থাকতে পারলেন না।

উল্লেখ, খেলাফত আন্দোলন টুকরো হওয়াটা দুনিয়াবি কোন বিষয় ছিল না। ছিল আকিদাগত বিষয়। তার পরেও হাফেজ্জী হুজুর রহ. তার ভক্তকুল নিয়ে চলছিলেন। কিন্তু তার একান্ত ভক্ত-অনুরাগী এবং শিষ্য শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর সাথে খেলাফত আন্দোলনের আভ্যন্তরিন বিরোধ ঘটল, শোনা যায় যে, এই আভ্যন্তরিন দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্যের পেছনেও কলকাঠী নেড়েছেন অধ্যপক আখতার ফারুক। তাই আরেকবার ভেঙে গেল খেলাফত আন্দোলন। সৃষ্টি হলো খেলাফত মজলিস নামে আরেকটি দল। দেখা গেল ভাঙাগড়ার ঐ কুশীলব অধ্যপক আখতার ফারুক ছেড়ে দিলেন হাফেজ্জী-এর দলকে, যোগ দিলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের সাথে। সঙ্গে যোগ দিলেন এক সময়ের যুব শিবিরের নেতা আহমদ আব্দুল কাদের বাচ্চু এবং এম. আর আব্দুল মতিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বোদ্ধারা মনে করেন অধ্যপক আখতার ফারুক হাফেজ্জী-এর দলকে ছেড়ে দেওয়ার কারণ ছিল তখন হাফেজ্জী হুজুর রহ. দলের ছিল পড়ন্ত বেলা। দলও দুবার ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তার দলের সাথে থেকে তো তাদের উদ্দেশ্য সাধনের আর কিছু বাকী নেই । আর শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর রাজনৈতিক উত্থানের দিনগুলো সামনে। সুতরাং, তিনি যেন বেশি বাড়তে না পারেন তাই তার সাথে থেকে শায়খুল হাদীসের দল আবারো ভাঙতে হবে।

যা হোক, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. অধ্যপক আখতার ফারুক এবং আহমদ আব্দুল কাদেরকে নিয়ে চলতেছিলেন। উলামায়ে কিরাম যখন তাকে বলতেন আপনার সাথে জামায়াতে ইসলামী আছে। তিনি বলতেন, ওরা তওবা করেছে।

দল চালাতে হলে দলের গঠনতন্ত্র একান্ত প্রয়োজন। তাই খেলাফত মজলিস এবং তাদের ছাত্রদের উইং ইসলামী ছাত্র মজলিসের গঠনতন্ত্র প্রণয়নের করা হলো। দেখা গেল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র শিবিরের গঠনতন্ত্রের সাথে মিল রেখেই প্রনয়ন করা হল খেলাফত মজলিস ও ছাত্র মজলিসের গঠনতন্ত্র। যাতে তারা থকবে কওমী মাদরাসার ছাত্র, শিক্ষক। কিন্তু মন-মানসিকতায় হবে জামাতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র শিবির। যাতে এক সময় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এবং ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথে কওমী ঘরানার আলেমদের দূরত্ব কমে যায়। তাদের বিরোধিতা না করা হয় এবং তাদের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয়।

আরেকটা বিষয় উল্লেখ না করলে নয়। চরমোনাইয়ের মরহুম পীর মাওলানা ফজলুল করীম রহ. হলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর ছাত্র। ছাত্র হয়েও তিনি নীতির উপর অটল ছিলেন। তিনি শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর জামায়াতে ইসলামীর সাথে মিলে চলাকে মেনে নিতে পারেন নি। তিনিও একটা দল গঠন করলেন। নামকরণ করা হলো ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। অনেকে মনে করেন, এই দলের মধ্যেও একজন জামাতের চর ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি হলেন ব্যারিস্টার কোরবান আলী। পরে মরহুম ফজলুল করীম রহ. ব্যারিস্টার কোবরান আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। কোরবান আলীও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (কোরবান) নাম দিয়ে কিছুদিন পরিচালনা করেছিলেন। তারপর তিনি মারা গেলে তার দলও মারা গেল।

হযরত মাওলানা ফজলুল হক আমিনী রহ. হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর হাতধরেই রাজনীতিতে আসেন। কিন্তু তখনো তত লাইম লাইটে ছিলেন না তিনি। কিন্তু ১৯৯৩ সালে ভারতে উগ্রবাদী হিন্দু কর্তৃক বাবরী মসজিদ শহীদ হলে বাবরী মসজিদ পুনঃ নির্মাণের দাবিতে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর নেতৃত্বে লংমার্চ ঘোষণা করা হয়। লংমার্চের সদস্যসচিব ছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.। এরপরই তিনি চলে এলেন আলেম সমাজের সর্বোচ্চ নেতার কাতারে। লংমার্চ হলো। বেনাপোল যাওয়ার পথে তৎকালীন সরকারের এক মন্ত্রীর নির্দেশে লংমার্চে গুলি করা হল। ৫ জন যুবক শহীদ হলেন। গুলির মুখে লংমার্চ ফেরৎ আসল। যাওয়া হলো না ভারতের অযোধ্যায়। বাস্তবতা হল- ভারতের উগ্রবাদী হিন্দু কর্তৃক শহীদ বাবরী মসজিদ নির্মাণে বাংলাদেশ থেকে লংমার্চ করে যাওয়ার কর্মসূচি রাজনৈতিক এবং ভৌগলিক বোদ্দাদের কাছে অলীক স্বপ্ন মাত্র। এটা আবেগ নির্ভর বাস্তবতা বিরোধী কর্মসূচী।

লংমার্চ থেকে ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এবং মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. এর মাঝে সম্পর্কের অবনতি হল। শোনা গিয়েছিল, এ সম্পর্কের অবনতির কারণও নাকি জামায়াতে ইসলামী প্রভাবিত তৎকালীন সরকারের কর্তৃক দেয়া হাদিয়ার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। ফলশ্রুতিতে জামিয়া রহমানিয়ায় নাটক করে মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.কে ‘মিরজাফর’ উপাধি দেয়া হয়েছিল।

এভাবে চলতেছিল আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনে এলো ১৯৯৬ এ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কওমী ঘরানার সব রাজনৈতিক দলগুলো এক প্লাটফর্মে আসার জন্য প্রতিষ্ঠা হল ইসলামী ঐক্যজোট। ঐক্যজোটের প্রতষ্ঠিাতা সভাপতি হলেন শাইখুল হাদীস আজিজুল হক রহ. এবং সদস্য সচিব হলেন মুফতী মোহাম্মদ ওয়াকাসস। কিছুদিন পরই শাইখুল হাদীস আজিজুল হক রহ.কে বহিষ্কার করে পীর মাওলানা ফজলুল করীম সাহেবকে সভাপতি বানানো হল। অল্প দিন পরেই আবার আমীরের পদ ফিরে পেলেন শাইখুল হাদীস আজিজুল হক রহ.। পরবর্তীতে সদস্য সচিব হলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.। তারা আওয়ামীবিরোধী এবং ধর্মীয় অনেক ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করে জেল জুলুমের শিকার হলেন। ২০০১ এ নির্বাচন এল। ইসলামী ঐক্যজোট বিএনপি-জামায়াত জোটের সাথে মিলে নির্বাচনে গেল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল চার দলীয় ঐক্যজোট। আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইসলামী ঐক্যজোট মন্ত্রিত্ব পাবে। এখানে এক কৌশলী চাল চাললো জামায়াতে ইসলামী। কেননা, কওমী ঘরানার কেউ মন্ত্রিত্ব পেলে সরকারি-বেসরকারি সকল সেক্টরে সংগঠন মজবুত করবে। ইসলামী খেলাফতের গ্রহণযোগ্যতা মানুষের সামনে তুলে ধরবে।

যদি মন্ত্রিত্বের অংশীদারিত্বের সুবিধাগ্রহণ করে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব ক্ষেত্রে জামায়াতের ভ্রান্ত মতবাদের মুখোশ উন্মচন করে দেয়, তাহলে জামায়াত যে ভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সকল সেক্টরে ওদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা আর সম্ভব হবে না। ভাটা পড়বে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে, ইসলামের মূলদর্শন সাধারণ মানুষ পেয়ে গেলে জামায়াতে ইসলামীর উগ্রবাদী দর্শন আর কেউ গিলবে না। এই নকশা বাস্তবায়ন করার জন্য একজন কওমী ঘরানার প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন যিনি জামায়াতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা সম্মানী পেতেন। আর একজন আলিয়া মাদরাসায় পড়াশুনা করলেও কওমী ওয়ালাদের সাথে তার সার্বক্ষণিক চলাফেরা ছিল। এই দুইজনের মাধ্যমে উদ্দেশ্য সাধন করল। আমিনী সাহেবকে বোঝান হল, জেল খেটেছেন আপনি। জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন আপনি। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার মূল দাবিদার আপনি। কিন্তু বাধা হল আপনি ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব। পার্টির চেয়ারম্যান হলে আপনি মন্ত্রিত্ব পাবেন। কওমি ঘরানার আলেম ওলামাদের ভবিষ্যতের পরিণামের কথা না ভেবে আমিনী সাহেব তার বুখারীর শায়েখ হযরত আজিজুল হক রহ.কে কোন মিটিং ছাড়াই বহিষ্কার করে এক রাতেই নিজেকে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ঘোষণা করলেন। বিরোধ হল শায়খুল হাদীস ও আমিনী সাহেবের মধ্যে। শালিস মানা হলো ঐ প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন যিনি জামায়াতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা সম্মানী পেতেন। আরেকজন আলিয়া মাদরাসার শিক্ষিত কিন্তু সখ্যতা দেওবন্দীদের সাথে। তারা রায় ঘোষণা করলেন, আমিনীই বৈধ চেয়ারম্যান। তাই আমিনী সাহেবও গেলেন মন্ত্রিত্বের জন্য। শাইখুল হাদীস সাহেবও গেলেন। বিএনপি থেকে বলা হল আপনাদের কাকে মন্ত্রিত্ব দেব। আগে এক হয়ে আসেন। তারপর মন্ত্রিত্ব। একও হতে পারলো না। মন্ত্রিত্বও পেল না। সফল হল জামায়াতে ইসলামীর মিশন। এরপর নেজামে ইসলামও তিন ভাগে বিভক্ত হল। সবাই নাম দিল ইসলামী ঐক্যজোট।

এরপর শাইখুল হাদীসের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস ও ভাঙনের কবলে পড়ল। এম আর আব্দুল মতিন আপন নীড় জামায়াতে ইসলামীতে চলে গেল। আহমদ আব্দুল কাদের গং ইয়াহইয়া খানের মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ইসহাক সাহেবকে নিয়ে গড়ে তুললো বিকল্প খেলাফত মজলিস (ইসহাক গ্রুপ)। তারা থাকল না শাইখুল হাদিসে সাহেবের সাথে। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এবং মুফতি ফজলুল হক আমিনী সাহেব ইন্তিকাল করলেন। কওমী ঘরানার রাজনীতিবিদরা অভিভাবক শূন্য হয়ে গেল। তারা হামলে পড়ল শাইখুল ইসলাম সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানীর খলিফা অশীতিপর বৃদ্ধ আল্লামা শাহ আহমদ শফীর উপর। তারা অখণ্ড-ভারতের দাবিতে ছিল চির সোচ্চার। শাইখুল ইসলাম আওলাদে রাসূল সা. হযরত মাদানীকে মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তানপন্থীরা এহেন কোন অপদস্থ নেই যা তাকে করেনি। এমনকি শারীরিকভাবেও তাকে লাঞ্ছিত করেছেন। তার খলিফাগণ অনেকেই বিভিন্ন কারণে রাজনীতিবিমুখ।

যাক, আল্লামা শাহ আহমদ শফী দা. বা. আধ্যাত্মিকতা ও ব্যাক্তিত্বকে পূঁজি করে উত্থান হল শাপলা চত্বরের। শাপলার মূল দাবির সাথে কোন মুসলিম বিরোধ করতে পারে না। কিন্তু তাদের কর্মপন্থা নিয়ে কোন কোন ভাবুক এবং গবেষক আলেমের মতানৈক্য ছিল। তারপর যা হবার তা-ই হল। শোনা গিয়েছে, এখানেও নাকি কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যার ডোনার হলো জামায়াতে ইসলামী এবং জামায়াত নিয়ন্ত্রীত কিছু সংস্থা। শত বছর ধরে যে কওমী মাদরাসার ছাত্রদেরকে সাধারণ জনগণ জানতো নিরীহ। ইসলামের শান্তির সুশীতল বাতাস বইয়ে দেয়াই তাদের কাজ। তাদের উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ পাককে খুশি করা। এই কওমী মাদরাসার ছাত্র শিক্ষকদেরকে কলংকের কালি লেপন করা হল খুব চাতুর্যের সাথে। সাধারণ মানুষের মনে কওমি মাদরাসার প্রতি একটা বৈরীভাব তৈরী করা হলো।

১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী এদেশের সাধারণ জনগণের বিরোধিতায় লিপ্ত ছিল। সাধারণ মানুষ তাদেরকে বাঁকা চোখে দেখেছে। তাদেরকে উগ্রবাদী বলেই জানত আমজনতা। তাদেরকে মনে করত ইসলামের মূল স্প্রীট থেকে দূরে। কিন্তু শাপলায় কওমী ঘরানার কোন ছাত্র শিক্ষক জ্বালাওপোড়াও এর সাথে সম্পৃক্ত না থাকলে দোষ চাপে তাদের ঘাড়ে। ফলশ্রুতিতে কিছু মানুষ ইসলামকেই উগ্রবাদের মূল কেন্দ্র ভাবতে শুরু করে। এখানেও জামায়াতে ইসলামী সফল হল। পূর্বে সাধারণ মানুষ শুধু জামায়াতকেই উগ্রবাদী ভাবতো, এখন তাদের সঙ্গে কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা যুক্ত করলো।

হেফাজতের মর্মান্তিক ট্রাজেডির পর কওমী মাদরাসাগুলো অনেকটা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। এ সময় তাদের পাশে দাঁড়ালেন দারুল উলূম দেওবন্দের অন্যতম তরজুমান, বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ইসলামী স্কলার আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। তিনি প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন কওমি মাদরাসার অসামান্য অবদান। কোমায় চলে যাওয়া স্বীকৃতি আন্দোলনকে সকালের সূর্যের মতো করে আবার স্পষ্ট করলেন। ছিনিয়ে আনলেন স্বীকৃতি। সহ্য হলো না পুরনো শকুনদের। টেনে আনল মাওলানা সাদ কান্দলভী এবং তাবলীগ ইস্যু। যারা তাবলীগকে কখনো পছন্দ করত না. গাল-মন্দ করত যারা তাবলীগে যেত, যুক্তি তুলে ধরত তাবলীগে না যাওয়ার পক্ষে, তারা মায়া কান্না শুরু করে দিল। গেল! গেল! গেলরে! সবশেষ হয়ে গেল।

আমি পিছনেই উল্লেখ করেছি যে, খেলাফত মজলিস এবং ছাত্র মজলিসের গঠনতন্ত্র এমনই যে বাস্তবে থাকবে কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক। কিন্তু মনস্তাত্মিকভাবে হবে জামায়াতী। এই খেলাফত মজলিস থেকে উঠে আসা প্রোডাক্ট কথিত উগ্রবাদী এক মাওলানা, যাকে সবাই সাউন্ড গ্রেনেড হিসেবেই জানে। তাকে ভোকাল হিসেবে ফিট করল। শুরু হল আবার উগ্রবাদের বিস্তার। দুঃসময়ে কওমীদের কাণ্ডারী আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করার সব ষড়যন্ত্রই করা হল। মিথ্যা অভিযোগ আরোপিত হল। আসলে আমরা কওমিওয়ালারা কী বিবেক শূন্য?

হাদীসে কুদসীতে আছে, যারা আমার ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসার অন্যতম মুরব্বী ছিলেন ব্রাক্ষণবাড়িয়ার জামিআ ইউনুসিয়ার প্রিন্সিপাল ও শাইখুল হাদীস মুফতী নূরুল্লাহ রহ.। কওমি মাদরাসার সকলের কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। যাকে সবাই সাহেবে কাশফ বলতেন। তিনি বলতেন- ও মিয়ারা! তোমরা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে আজে-বাজে বল। আমি তো দেখি পেয়ারে রাসূল সা. তাকে সবসময় ঘিরে রাখে।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ আল্লাহর দরবারে কতটুকু কবুল তা বুঝতে হলে ২০০৫ এ যখন গ্রেফতার করা হয়েছিল তখনকার আইজি প্রিজন এর সাথে যোগাযোগ করে জানা যেতে পারে। আমি না হয় না’ই লিখলাম। সুতরাং কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের বলব- আরেকটুকু ভাবুন! কে আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী খুঁজে বের করুন। জজবা আর আবেগে ভেসে জাতির ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না।

আবারও জামায়াতে ইসলামী আলেম উলামাকে বগলদাবা করেই পার পেতে চাইবে তা হলফ করেই বলা যায়। স্বাধীনতার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের এই পরাজিত শক্তি বার বার আলেমদের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকারের চেষ্টা করেছে। আহলে ইলম, আহলে দেওবন্দীদের বিতর্কিত করার জন্য জামায়াতই সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। অনেক তরুণ নিজেই জানে না, সে জামায়াতের কণ্ঠে পরিণত হয়েছে। মিথ্যাকে সত্যের অধিক মনে করছে। আল্লাহ তাআলা সবার হিদায়াত দিন। আমীন।

লেখক : আলেম ও সমাজ বিশ্লেষক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। দায় একান্ত লেখকের

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *