জোর করে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : রোহিঙ্গাদের জোর করে ভাসানচরে পাঠানো হয়নি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে যারা গেছেন, তারা সবাই স্বেছায় গেছেন। বুধবার মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, গত ৪ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ১৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পাঠানো হয়। আর ২৯ ডিসেম্বর ১৮০৪ জনকে পাঠানো হয়েছে। কোনো রোহিঙ্গাকে জোর করে বা আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে ভাসানচরে পাঠানো হয়নি। আর যারা সেখানে গেছেন, তাদের জোর করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ৩০ বছরের পুরোনো ভাসানচর পুরোপুরি সুরক্ষিত। আম্পানের সময়ও এ দ্বীপে কোনো ক্ষতি হয়নি। এখানে আবাসন, সুপেয় পানি, চিকিৎসাসহ নানা ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। মিয়ানমারের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে উদ্বেগ জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলছে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মঙ্গলবার দেশটির ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করে।
ইউএসসিআইআরএফের ভাইস চেয়ারম্যান অরুনিমা ভার্গাভা এক বিবৃতিতে বলেন, বার্মায় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জাতিসংঘ বিবেচিত অনিরাপদ একটি অঞ্চলে স্থানান্তরিত করায় আমরা উদ্বিগ্ন। ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্থানান্তর অবশ্যই স্বেছায় হওয়া উচিত। সেখানে কোনো রোহিঙ্গাদের পাঠানো উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ত ৪ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ১৬৪৫ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ২৯ ডিসেম্বর ১৮০৪ জনকে ভাসানচরে নেওয়া হয়।
এদিকে বিবিসিতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে দুই দশক আগে জেগে ওঠা দ্বীপ ভাসানচরে একটি দিন পার করেছে সেখানে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। সেখানকার পরিবেশ দেখে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা তাদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন।
তবে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়াই সরকারের রোহিঙ্গাদের এভাবে স্থানান্তর করা উচিত হয়নি।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের ওপর চাপ কমাতে শুক্রবার নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের তত্ত্বাবধানে ১৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে ৭টি জাহাজে করে ভাসান চরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই প্রত্যেকের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা ও হাত ধোয়ানো শেষে তাদের ক্যাম্পে থাকার নিয়মকানুন সম্পর্কে ব্রিফ করে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা।
এরপর প্রতিটি পরিবার যার যার ঘর ও মালপত্র বুঝে নেন। জানা গেছে ২২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের মানবিক সহায়তা দিতে ভাসানচরেই অবস্থান করছে। প্রথম কয়েকদিন নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানেই রোহিঙ্গাদের খাবার সরবরাহ করা হবে।
ভাসানচরে থাকার জন্য মানসম্মত নতুন পাকা ঘর এবং বসবাসের মতো স্বাস্থ্যসম্মত এলাকা পেয়ে উছ¡াস প্রকাশ করেছেন রোহিঙ্গারা।
কুতুপালং ১৭ নম্বর ক্যাম্প থেকে আসা আরোপা বেগম বলেন, জাগা দেকি, বাসা দেকি ভালা লাগসে। ওহানে পাহাড়, বাচাকাচা খেলাইতো পারে না। গরু চরতে পারে না। এখানে তো সব সমান। ভালো লাগসে।
লালু বেগম বলেন, ওহানে তো দুযোখো ছিলাম। এহানে জাগা বড়, সমান। এখানে নিরাপত্তা আছে। পানি আছে, বাথরুম আছে। আমাদের কষ্ট করতে হবে না। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করতে ২০১৭ সাল থেকেই দ্বীপটিতে এই আশ্রয়ণ প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ সরকার।
তখন থেকেই জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন সংস্থাগুলো এর বিরোধিতা করে আসছে। সবশেষ জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিভেন দুজারিচ এই স্থানান্তরকে অনুচিত বলে মন্তব্য করেছেন।
এর আগে ভাসানচরে স্থানান্তর অবিলম্বে বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাদের বিবৃতিতে আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ভাসানচরে স্থানান্তরের আগে সব আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কারিগরি ও সুরক্ষাগত মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে আসছিল জাতিসংঘ।
সেটা ছাড়াই রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি। আমাদের প্রশ্ন হল, এতো তাড়া কেন? কোন টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট ছাড়া তাদের এতো তাড়াতাড়ি শিফট করা উচিত হয়নি। এটা তো একটা চর। এখানে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় হয়, এখানে মানুষের থাকা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার এই ঝুঁকি কেন নিল? তাদের উচিত ছিল আরও সময় নিয়ে সঠিক নিয়মে আগানো।


