আদিব সৈয়দ : ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে আবারও। ঢাকার কাছে টঙ্গীতে এ দুর্ঘটনায় চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক যাত্রী। বিষয়টি দেশের মানুষকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। রাজধানীতে রাজিবের হাত দ্ইু বাস ঘর্ষণে কর্তন করে তার জীবনের বাতি নিভিয়ে ছাড়লো। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও এরকমই দুর্ঘটনার খবর এসেছে, মঙ্গলবার কাজ শেষে হৃদয় টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের আরেকটি বাসে করে গোপালগঞ্জ যাচ্ছিলেন। বাসের পেছনে জানালার পাশের একটি সিটে বসেছিলেন তিনি। ডান হাত দিয়ে জানালার মাঝখানের রড ধরে ছিলেন। গোপালগঞ্জের বেতগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসের পেছন দিক থেকে আসা একটি ট্রাক ওভারটেক করতে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে ট্রাকটি বাসের পেছন অংশ ঘেঁষে চলে যায়। এতে হৃদয়ের ডান হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুর্ঘটনার হিসাব কষে আমাদের নির্ধারণ করতে হবে কী হবে আমাদের গতিপথ। আমার বার্তার খবরে বলা হয়, টঙ্গী রেলস্টেশনের কাছে নতুনবাজার এলাকায় ঢাকা-জয়দেবপুর ক্রসিংয়ে ঢাকাগামী জামালপুর কমিউটার ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পড়ে। এ সময় ট্রেনটির পেছনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হলে প্রাণ বাঁচাতে যাত্রীরা লাফিয়ে নামার সময় হতাহতের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার পর উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার ট্রেন চলাচল পাঁচ ঘণ্টার জন্য বন্ধ ছিল। ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় ট্রেনের গতি কম থাকায় হতাহতের সংখ্যা বাড়েনি। গতি বেশি থাকলে সংখ্যা অনেক বাড়ত। সৌভাগ্য যে সেটা ঘটেনি। তবে উদ্বেগের বিষয় হল, ইদানীং ক্রসিং এলাকায় প্রায়ই ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। গত ফেব্রুয়ারিতে উপবন এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল প্রায় ১৯ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। ট্রেনকে তুলনামূলক নিরাপদ বাহন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে ট্রেন ভ্রমণে মানুষের সেই নিরাপত্তাবোধে যে চির ধরবে, তা বলাই বাহুল্য। কাজেই দুর্ঘটনার কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
যতদূর জানা যায়, অধিকাংশ সময়ে দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্টদের ভুলের কারণে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। লাইনের সংস্কার সময়মতো করা হয় কিনা তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও স্লিপার সংযোগস্থলে লোহার হুক না থাকা ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। কাজেই এসব দিকে নজর দেয়া দরকার গুরুত্ব সহকারে।
চুক্তি ভিত্তিতে নেয়া চালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় এড়াতে তাদের কাউকে কাউকে লোক দেখানো সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যা কিছুদিন পরই স্বাভাবিক হয়ে যায়। ট্রেন চালাতে চালক (লোকোমাস্টার), স্টেশন মাস্টার, গার্ড (পরিচালক), পয়েন্টসম্যান- এ চারটি পদ খুবই জরুরি। এসব পদের লোকই মূলত ট্রেন পরিচালনা করেন।
এর কোনো একটিতে ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনা ঘটে। এসব পদের সব ক’টিতেই দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলওয়ের নিয়মানুযায়ী প্রতিদিন তিনবার পর্যায়ক্রমে পুরো লাইন, সিগন্যাল ও ব্রিজ পরিদর্শন করার কথা। একইসঙ্গে প্রতিটি ট্রেন ছাড়ার আগে ইঞ্জিন এবং বগিগুলোর বিশেষ বিশেষ যন্ত্রাংশ ও চাকা পরীক্ষা করার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। রেলওয়েতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগ দিয়ে, রেললাইনগুলোর সংস্কার করে এবং নতুন ইঞ্জিন যুক্ত করে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিমুক্ত করা হোকÑ এটাই আমাদের প্রত্যাশা।


