পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : টিকটক মডেল করার লোভ দেখিয়ে কয়েক শ তরুণীকে পাচার করা হয়েছে প্রতিবেশী ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গালুরুতে ঢাকার এক তরুণীর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় বিষয়টি পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। টিকটক চক্রটি ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণীদের টার্গেট করে এ কারবার চালিয়ে আসছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল ও ভারতের কয়েকটি রাজ্যের কিছু অপরাধী মিলে এই সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রটি গড়ে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘ঠিক কতজন নারীকে এখন পর্যন্ত পাচার করা হয়েছে তার সঠিক তথ্য নেই। তবে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই সংখ্যা অনেক।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরই মধ্যে বাংলাদেশি যেসব নাগরিক ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে দুই দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। যে তরুণীকে পাচারের পর যৌন নির্যাতন করা হয়েছে, তাঁকেও দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের ভাষ্য, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইসহ কয়েকটি দেশে টিকটক চক্রটির নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। এ চক্রের টার্গেটে স্কুল-কলেজপড়ুয়া বখে যাওয়া তরুণী যেমন আছে, তেমনি গৃহিণীরাও আছে। মূলত টিকটক ভিডিও তৈরি করতে গিয়ে তরুণ-তরুণীরা একটি ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হয়। গ্রুপটির মূল পৃষ্ঠপোষক মূলত আন্তর্জাতিক মানবপাচারচক্র জানিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এই গ্রুপের অ্যাডমিনের তত্ত্বাবধানে গত বছরের শেষের দিকে ঢাকার পাশের জেলার একটি রিসোর্টে ৭০০-৮০০ তরুণ-তরুণী পুল পার্টিতে অংশ নেয়। তাদের অনেকেই পাচার হয়েছে। ওই পার্টির অন্যতম সমন্বয়কারী ছিলেন রিফাতুল ইসলাম ওরফে টিকটক হূদয়।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, নারীপাচারের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২৬টি মামলা সিআইডিতে তদন্তাধীন। এর মধ্যে ভারতে নারীপাচারের ঘটনায় দায়ের করা মামলা আছে ১৫টি।
জানা যায়, নারী সদস্যদের ভারতের বিভিন্ন মার্কেট, সুপারশপ, বিউটি পার্লারে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দিয়ে পাচার করে টিকটক চক্রের সদস্যরা। এই চক্রের মূল আস্তানা বেঙ্গালুরুর আনন্দপুর এলাকায়। মূলত যৌনবৃত্তিতে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের ভারতে পাচার করা হয় জানিয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, এই উদ্দেশ্যে চক্রটি প্রথমত ভারতের কয়েকটি রাজ্যের কিছু হোটেলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। পরে ওই হোটেলগুলোর চাহিদামাফিক বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের পাঠানো হয় সেখানে। এ ছাড়া পাচার হওয়া মেয়েদের আনন্দপুরে নিয়ে যাওয়ার পর কৌশলে নেশাজাতীয় বা মাদকদ্রব্য সেবন করিয়ে বা জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে তারা। এরপর পাচার হওয়া নারীরা অবাধ্য হলে বা পালানোর চেষ্টা করলে এই ভিডিও তাদের স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া দুই দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা অন্তত ছয়জন বাংলাদেশি তরুণীর সন্ধান পেয়েছেন, যাদের টিকটক হূদয় ও রাফি সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার করেছিল। নাম-পরিচয় যাচাই করার পাশাপাশি তাদের উদ্ধারের লক্ষ্যে এরই মধ্যে ভারতে নারী পাচার চক্রের মূল হোতা এবং চক্রের শতাধিক সদস্যের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করেছেন পুলিশ ও র্যাবের গোয়েন্দারা।
সূত্রের খবর, ভারতে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রিফাতুল ইসলাম হূদয়কে জেরা করে একাধিক তথ্য হাতে এসেছে বেঙ্গালুরু পুলিশের। বাংলাদেশের অপরাধীদের সঙ্গে জোট বেঁধে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মহিলাদের নিশানা করত এই দল। পাঁচ বছর ধরে এভাবে নারীপাচার চলছেই।
টিকটক চক্রের অন্যতম হোতা আশরাফুল ইসলাম রাফি ও তাঁর স্ত্রী বন্যা খাতুন এবং দুই ভাগ্নে অনিক ও রনিকে গত রবিবার (৩০ মে) আটক করা হয়েছে। আশরাফুলের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপার ৬ নম্বর সারুটিয়া ইউনিয়নের নাদপাড়াতে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয় বলে র্যাব জানায়। এ ছাড়া বেঙ্গালুরুতে তরুণীকে নির্যাতনের ঘটনায় ভিডিওতে দৃশ্যমান দুজন বাংলাদেশের যশোরের বাসিন্দা।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘নারী পাচার চক্রটির অনেক তথ্য এরই মধ্যে আমাদের হাতে এসেছে। বিদেশে নারী পাচার চক্রের সঙ্গে দেশের যারাই জড়িত তাদেরকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’


