ডিসেম্বরের মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণে অনিশ্চয়তা

ডিসেম্বরের মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণে অনিশ্চয়তা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক ● আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের আওতায় দেশের ৯ কোটি ভোটারকে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়া হবে। তবে দেশে বর্তমানে ভোটার ১০ কোটি ১৭ লাখের কাছাকাছি। এ অবস্থায় বাকি এক কোটি ১৭ লাখ ভোটার কবে, কিভাবে তাদের স্মার্ট এনআইডি কার্ড পাবে-এ প্রশ্নের জবাব মিলছে না।

এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই গত মাস থেকে চট্টগ্রামে এনআইডির স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু করা হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে রাজধানীতেও শেষ ধাপে স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হয়। এছাড়া এপ্রিলের শুরুতে রাজশাহীতে স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু হয় এবং খুলনা, সিলেটসহ অন্য সিটি করপোরেশন এলাকাতেও কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেহেতু বর্তমান প্রকল্পে ৯ কোটির বেশি ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি কার্ড দেওয়ার সুযোগ নেই, সেহেতু গ্রাম এলাকার ভোটাররা আপাতত বঞ্চিত থাকতে পারে। আর ডিসেম্বরের মধ্যে ৯ কোটি ভোটারকে কার্ড দেওয়া সম্ভব হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। সূত্র মতে, ফ্রান্সের কোম্পানি অবার্থুর টেকনোলজির মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড প্রস্তুতের কাজ করছে ইসি।

ওই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ৭৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার চুক্তিতে এ কাজের মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। স্মার্ট কার্ডে তিন স্তরে ২৫টি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকবে। এ কার্ডের মধ্যে যে মাইক্রোচিপ দেওয়া থাকবে তাতে একজন নাগরিকের সব তথ্য পাওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে ২৫টি কাজে ব্যবহার করা যাবে এই কার্ড। সরকারি সব অনলাইন সুবিধা, টিআইএন প্রাপ্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, সম্পত্তি কেনাবেচা, ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যাংক ঋণ, সরকারি ভাতা উত্তোলন, সহায়তা প্রাপ্তি, বিআইএন, শেয়ার-বিও অ্যাকাউন্ট, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, বীমা স্কিম, বিয়ে রেজিস্ট্রেশন, ই-পাসপোর্ট, ই-গভর্ন্যান্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল সংযোগ, হেলথ কার্ড, ই-ক্যাশ, ব্যাংক লেনদেন ও শিক্ষার্থীদের ভর্তির কাজে ব্যবহার করা হবে স্মার্ট কার্ড। ফ্রান্সের প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অবার্থুর টেকনোলজি সময়মতো স্মার্ট কার্ড না দিলে ইসি পদক্ষেপ নিবে বলে এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন এনআইডি শাখার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম। সাইদুল ইসলাম বলেন, ৯ কোটি ভোটারের স্মার্টকার্ড বিতরণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৫ কোটি ২০ লাখ ব্লাক কার্ড ফ্রান্সের প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অবার্থুর টেকনোলজিজ হস্তান্তর করেছে।

অবশিষ্ট ৩ কোটি ৮০ লাখ কার্ড আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সরবরাহ না করলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য, স্মার্টকার্ড তৈরি করার আগে ফ্রান্স থেকে ‘ব্লাঙ্ককার্ড’ দেশের আসার পর ব্যবহার উপযোগী করা হয়। স্মার্টকার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের লক্ষ্যে অবার্থুর টেকনোলজিসের সঙ্গে চুক্তি ছিল নয় কোটি কার্ডের। দফায় দফায় পিছিয়ে সেই কার্ড বিতরণ শুরু হয় ২০১৬ সালে। এর মধ্যে আরও সোয়া কোটি ভোটার যুক্ত হয়ে হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ কোটি ১৭ লাখ। এখন তালিকার বাকিদেরকে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় স্মার্টকার্ড দেওয়ারও সম্ভাবনা যাচাই-বাছাই করছে নির্বাচন কমিশন-ইসি। সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন ওই ৯ কোটির বাইরে যত কার্ড আগামীতে তৈরি করবে, তা দেশের কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রস্তুত করে নেবে। তবে পুরনো নয় কোটি ভোটারের স্মার্টকার্ডের জন্য ছাপার মেশিনের অপ্রতুলতা রয়েছে বলেও জানান জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্ল্যাঙ্ককার্ডে স্মার্টকার্ড ছাপাতে তাদের মাত্র ১০টি প্রিন্টার মেশিন রয়েছে। এ বছরের মধ্যেই সব নাগরিকের হাতে কার্ড পৌঁছে দিতে হলে আমাদের বাড়তি আরও ১৮টি প্রিন্টার মেশিনের প্রয়োজন। এ অবস্থায় ১০টি মেশিনেই শিফট সংখ্যা বাড়িয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে ১০টি মেশিনে এক শিফটে কাজ করা হতো। পরে দুই শিফটে প্রিন্ট শুরু হয়। এখন সবগুলো দিয়ে তিন শিফটে কাজ করতে হবে। এদিকে গত বছর রাজধানীতে স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরু হওয়ার পর ঢাকায় এ পর্যন্ত ৫৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, আগামীতে যারা ভোটার হবেন, তাদের স্মার্টকার্ড কীভাবে সহজে দেওয়া যায়, তা নির্ধারণে সম্প্রতি একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছে ইসি। যে কমিটিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনামুল কবীরও রয়েছে। কয়েক মাস ধরে যাচাই-বাছাইয়ের পর ওই কমিটি একটি সুপারিশ দিয়েছে।

যেখানে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে স্মার্টকার্ড প্রস্তুত করে দেওয়ার কাজে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। টেকনিক্যাল কমিটির ওই সব সুপারিশের একটি অনুলিপি হাতে এসেও পৌঁছেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, স্মার্টকার্ডের গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে কমিটি মনে করে এই কার্ড বাংলাদেশে থেকে ক্রয় করা যেতে পারে। যেহেতু এনআইডি দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং এই তথ্য যথেষ্ট সংবেদনশীল, তাই তথ্যের সুরক্ষা ও বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে দেশের প্রস্তুতকৃত কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে দেশীয় প্রতিষ্ঠনকে সম্পৃক্ত করা হবে এবং বিদেশ নির্ভরতা কমবে। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) যেহেতু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই বিএমটিএফ এর বর্তমান অবকাঠামো নিশ্চিত সুবিধা ও পূর্বের কাজের সফলতা বিবেচনা করে দেখা যায়, বিএমটিএফ এই কার্ড প্রস্তুত করতে সক্ষম।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *