ড. কাফিল খান কেন বন্দি?

ড. কাফিল খান কেন বন্দি?

সময় সংলাপ । চৌধুরী আতিকুর রহমান

ড. কাফিল খান কেন বন্দি?

ডাক্তার সাহেবের উপর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (এন এস এ) প্রয়োগ করা হয়েছে। তার মানে দাঁড়ায় উনি দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক ভয়ঙ্কর ব্যক্তি। তিনি যে ভয়ঙ্কর কাজটি করেছেন, তা হল আলীগড় বিশ্ব বিদ্যালয়ে এক সমাবেশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘মোটা ভাই’ ভারতীয় মুসলিমদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’-এ পরিণত করেছে। প্রসঙ্গত এনআরসি ও সি এ এ-র বীরুদ্ধে এই সমাবেশ আয়োজিত হয়েছিল।

কি ভয়ঙ্কর কথা? থুড়ি কর্মকান্ড। মোটা কে উনি মোটা বলেছেন, যদিও ভাই বলে নিকটাত্মীয় করে নিয়েছেন। আবার ভাইয়ের মন্ত্রণাদাতা সংস্থা আরএসএস-এর ব্রান্ড ‘খ্রিস্টান ও মুসলিম ভারতে থাকতে পারবে তবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে’- এই বক্তব্য কেউ হাইজ্যাক করে নিয়েছেন। তাই জেলই ঘর।

আলিগড় পুলিশের বক্তব্য, ডাক্তার সাহেবের এই ‘ভয়ঙ্কর’ বক্তব্যের পরই আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫-ই ডিসেম্বর থেকে এনআরসি-সি এ এ বিরোধী এমন দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুধু করে যে আলিগড়ের বাসিন্দারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আর এই দাঙ্গা-হাঙ্গামার জন্য কাফিল খানের বক্তব্যই দায়ী। তবে ২০১৯ ডিসেম্বরের প্রথমে এই বক্তব্য দেওয়ার পর তিনি মুক্তই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। বিহারে গেছেন, সেখানকার মানুষদের দাতব্য চিকিৎসা দিয়েছেন, জানুয়ারির শেষে মুম্বাই এয়ারপোর্টে তিনি গ্রেপ্তার হন। মুম্বাই যাওয়ার উদ্দেশ্য সিএএ, এনআরসি বিরোধী সমাবেশে যোগদান।

স্বৈরাচারীরা মানুষের জনপ্রিয়তাকে ভয় পায়। মোদি যোগী শাহ ত্রয়ী ভয় পেয়েছিলেন কাফিল খানের জনপ্রিয়তাকে।

গ্রেফতার হলেন, এর আগেও হয়েছিলেন, যখন ২০১৭- তে গোরখপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬০ শিশুর মৃত্যু হয়। যোগী সরকারের অভিযোগ ছিল ডাক্তার সাহেব নাকি কাজের গাফিলতি দেখিয়েছিলেন। তবে আদালত তাঁকে চিকিৎসার গাফিলতির অভিযোগ থেকে সসম্মানে মুক্ত করে দেয়।

মুক্তই ঘুরছিলেন, জনসেবা করছিলেন। কিন্তু শকুনেরা ইউএপিএ সংশোধনী বিল পাশের অপেক্ষায় ছিল। ২০১৯-এ পুনরায় ক্ষমতায় এসে শেষ দিকে সংশোধনী বিলটি পাস করেই কাজে নেমে পড়ে। যেই সরকারের বিরোধিতা করে কোনো বক্তব্য রাখছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে তাকেই ধরে জেলে ভরে দিচ্ছে। সফুরা জারগার, আজম খান, কাফিল খান, সারজিল উসমানি লম্বা তালিকা।

গ্রেফতার হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্ট দ্বারা তিনি মুক্ত হন। তবুও বিনা কারণে তিন দিন আটক করে রাখা হয়। কাফিলের ভাই আদিল বলছেন, আদালত অবমাননার মামলা করলে জেল কর্তৃপক্ষ মুক্তি দেওয়ার আশ্বাস দান করার পরই হঠাৎই ডাক্তার সাহেবের উপর এনএসএ প্রয়োগ করা হয়। ইকোনমিক টাইমস লিখছে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চন্দ্রভূষণ সিং-এর এনএসএ প্রয়োগের অর্ডারটা তারা দেখেছে। যা দেখে একজন অজ্ঞ মানুষও বলে দেবে প্রতিশোধ স্পৃহায় আটকের মূল কারণ। আদিল বলেছেন, গোরক্ষপুর হাসপাতালের ৬০ শিশুমৃত্যুর মূল কারণ প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে গ্রেপ্তারি। কারণ যাই হোক, তিন মাস মেয়াদের জেল মে মাসে আরও তিন মাস বাড়ানো হয়।

ইতিমধ্যে জেলের ভিড় ও শৌচালয়ের স্বল্পতা ও দুরবস্থা নিয়ে তিনি চিঠি লিখেছেন। একজন চিকিৎসক যাঁর কাজই হল সাধারন মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখা তিনি কিরকম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণায় আছেন তা সহজেই অনুমেয়।

আসলে নগ্ন প্রতিশোধ প্রিয়তা আইপিএস সঞ্জীব ভাট থেকে কাফিল খান সর্বত্রই আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই জুটি যেন সবরকম সমালোচনার ঊর্ধ্বে।

সামনে ইনসাফের অপার সমুদ্র, সমুদ্রকে মানুষ বাগে এনেছে, পৃথিবীর বাইরে চাঁদ-মঙ্গল বিজয়ের দিকে দৌড়াচ্ছে। কোথায় চেঙ্গিজ, কোথায় তৈমুর, কোথায় মুঘল, কোথায় ইংরেজরাজ? সব ইতিহাস। কিছু মানুষকে পকেট এ পোরা যায়, সব মানুষকে নয়। ইতিহাস তোমাদেরও ক্ষমা করবে না।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *