নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। বাস ট্রেন লঞ্চে যাত্রীদের ভিড়। ট্রেনের বিশেষ সার্ভিস বুধবার শুরু হয়েছে। তবে গাবতলী বাস টার্মিনালে আগের চেয়ে এবার ভিড় খনিকটা কম ছিল। দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের ভিড় দেখা যায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। ট্রেনে ঈদযাত্রার চতুর্থ দিনে বুধবার সকাল থেকেই কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘরমুখী যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ১২টি ট্রেন দেরিতে স্টেশন ছেড়েছে। যাত্রীদের মধ্যে এ নিয়ে দেখা যায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
গত দুই দিনের তুলনায় ভোর থেকেই স্টেশনে মানুষের ভিড় বেশি ছিল। সড়কপথে যানজটের ঝক্কি এড়াতে অনেকে বিকল্প হিসেবে রেলপথে ভ্রমণ করছেন। গত তিন দিন বেশির ভাগ ট্রেন নির্ধারিত সময়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েকটি ট্রেন দেরিতে যাওয়ায় যাত্রীরা কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, ভোর থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ৩০টি ট্রেন কমলাপুর থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে। গতাল ঈদ স্পেশাল ট্রেনসহ সারা দিনে মোট ৫৯টি ট্রেন ছেড়েছে কমলাপুর থেকে। রাজশাহী, দেওয়ানগঞ্জ, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট ও খুলনার উদ্দেশে পাঁচটি বিশেষ ট্রেন ছেড়ে যায় স্টেশন। বেলা আড়াইটার দিকে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শনে আসেন। তিনি রাজশাহীগামী সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ও চট্টগ্রামগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেসের যাত্রীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, শুধু একটি ট্রেন যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে দেরিতে ছেড়েছে। সেটি হচ্ছে সুন্দরবন এক্সপ্রেস। মাত্র ৫৫ মিনিট দেরি করেছে। বাকি সব ট্রেনই যথা সময়ে কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে গেছে। আমাদের লক্ষ্য যাত্রীদের সেবা দেওয়া।
তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ও এই প্রতিবেদক স্টেশনে দাঁড়িয়ে দেখেছেন, একটি নয়, দেরিতে ছেড়েছে ১২টি ট্রেন।
প্রতিদিন তিন লাখ যাত্রী ট্রেনে আসা-যাওয়া করছে বলে রেলমন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সেবা দিয়ে ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে সতর্ক রয়েছে। ট্রেনের ছাদে কিন্তু কোনো যাত্রী নেই। কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাত্রীদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে ছাদে ওঠা আইনবহির্ভূত। এ বছর যাত্রীরা ছাদে কেউ ওঠেননি। ঈদে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে যাত্রীদের সেবা নিশ্চিতের জন্য।
তবে কমলাপুর স্টেশন থেকেই কোনো কোনো যাত্রীকে ছাদে ভ্রমণ করতে দেখা গেছে।
বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ট্রেনের ছাদে যাত্রীরা উঠছেÑসাংবাদিকদের এমন তথ্যের ব্যাপারে রেলমন্ত্রী জানান, ছাদে ওঠা আইনে নেই। আমরাও সমর্থন করি না। যারা ওঠেন, তারা নিজ দায়িত্ব উঠছেন। যাঁরা উঠছেন, তাদের নিবৃত্ত করা হচ্ছে।
রেলমন্ত্রী বেলা ৩টা ২০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যান। একই সময়ে নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেসের স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু উপকূল এক্সপ্রেস ৩৭ মিনিট দেরি করে স্টেশন ছাড়ে।
সিল্ক সিটি ট্রেনের যাত্রী লিটন আলী এনজিওতে চাকরি করেন। চার বন্ধু মিলে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ট্রেনে ভ্রমণ সব সময় মজার। কোনো যানজটের চিন্তা নেই। বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্বকাপের গল্প করতে করতে বাড়ি যাব। সিল্ক সিটি নির্ধারিত সময়ে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায়।
যে ১২টি ট্রেন দেরিতে ছেড়েছে : সকালে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৫৫ মিনিট, ঈশা খাঁ এক্সপ্রেস ৪৫ মিনিট দেরিতে ছেড়েছে। দেওয়ানগঞ্জ ঈদ স্পেশাল ট্রেনের ছাড়ার সময় ছিল সকাল পৌনে নয়টায়। তবে তা ছেড়েছে নির্ধারিত সময়ের পৌনে এক ঘণ্টা পর। নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাড়ার সময় সকাল আটটায়। তবে ট্রেনটি আধা ঘণ্টা দেরি করে সকাল সাড়ে আটটায় গেছে। লালমনিরহাটের লালমণি ঈদ স্পেশাল ট্রেন বেলা সোয়া নয়টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা। এটি ছাড়ে বেলা ১১টায়।
রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন সকাল নয়টায় ছাড়ার কথা থাকলেও তা সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ছেড়েছে।
রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ট্রেনে আধা ঘণ্টা দেরি হলেও সয়ে যায়। কারণ, ট্রেনে তো আরামে যাওয়া যায়। সড়কে গেলে তো আরও বেশি জ্যামে পড়তে হতো। মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করতে পারবÑএটাই আনন্দ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস কমিউটার ট্রেন সকাল সাড়ে নয়টার পরিবর্তে ২০ মিনিট দেরি করে নয়টা ৫০ মিনিটে ছেড়ে গেছে। জামালপুরের তারাকান্দি রুটের অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেন আধা ঘণ্টা দেরি করে সকাল সোয়া নয়টায় ছেড়েছে। দিনাজপুরের একতা এক্সপ্রেস ২০ মিনিট দেরি করে বেলা ১০টা ২০ মিনিটে ছেড়েছে। ৩টা ২০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কথা নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেসের। এটি ছাড়ে ৩৭ মিনিট দেরিতে। রাজশাহী এক্সপ্রেস ১২টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও স্টেশন ছেড়েছে বেলা দুইটার দিকে।
রাজশাহী এক্সপ্রেসের যাত্রী মো. তামজিদুল ইসলাম বলেন, বাসে যেতে যানজটে বেশি কষ্ট হয়। তাই ট্রেনে বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু ট্রেনেও যদি দেরি হয়, তাহলে তো খারাপ একটু লাগেই। জামালপুর কমিউটার ট্রেন ৩টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা। এটিকে বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটের মধ্যেও ছাড়তে দেখা যায়নি।
কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, বুধবার ভোর থেকে স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বেশি হয়েছে। কয়েকটি ট্রেন সামান্য দেরি করেছে, এটা বড় কিছু নয়। বিভিন্ন কারণে কয়েকটি ট্রেন দেরি করে গেছে। বাকিগুলো সময়মতো গেছে, দু-একটি হয়তো ৫ থেকে ১০ মিনিট দেরি করেছে। তবে ঈদের সময় ১৫-২০ মিনিট দেরি করে যাওয়াও বড় কিছু নয়। এটা ঠিক হয় যাবে।
এদিকে দিন বাড়ার সাথে সাথে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের ভিড় দেখা যায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। তবে এবার ভিড় না থাকার কারণ হিসেবে অনেকে বলছেন, গত বছর রাস্তা সংস্কারের কাজ থাকায় ভিড় ছিল। এবার ৮ জুন থেকে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে রাস্তায় চলাচলের জন্য। তাই এ বছর ভিড় অনেক কম। তবে ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় থাকলেও, বাসের সিডিউল বিপর্যয়ের কথা জানা যায়নি।
বাস কাউন্টারের মালিক বলছেন, সিডিউল বিপর্যয় এখন পর্যন্ত হয়নি। রাস্তা ঘাট এখনও চলাচলের উপযোগী আছে।
এদিকে রাজধানীবাসী যানজটের কথা চিন্তা করে অনেকে তাদের পরিবারের নারী এবং শিশু সদস্যদের আগেই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ থাকায় তারা আগেই বাড়ি চলে গেছেন। আগাম টিকেট যেগুলো আছে ১৫ তারিখ পর্যন্ত সবাই বাড়ি যেতে পারবে বলে আশা করছেন পরিবহন মালিকরা। এছাড়াও ট্রেন এবং বাসের স্পেশাল সার্ভিস থাকায় সবাই নির্বিঘেœ বাড়ি যেতে পারছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের ভিড় বাড়ছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। তবে সদরঘাটগামী লঞ্চে যাত্রীদের হয়রানি ও যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের একাধিক টিম সড়কে দায়িত্ব পালন করছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে পুলিশ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজধানীর সদরঘাটের আগে রায় সাহেব বাজার থেকেই চোখে পড়ছে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভিড়। নাড়ির টানে হাতে ও কাঁধে একাধিক ব্যাগ, কারো মাথায় বস্তা, মালামাল নিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ চলছেন সদরঘাটের উদ্দেশ্যে। কারণ তারা এ নগরের অস্থায়ী বাসিন্দা। আগামী ১৬ বা ১৭ জুন দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হবে।
ঈদে ঘরমুখো মানুষ বুধবার সকাল থেকেই সদরঘাট আসতে শুরু করেন। দুপুরের মধ্যে বেশির ভাগ লঞ্চ যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায়। এজন্য কয়েকটি লঞ্চ সকালে সদরঘাট ছেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সদরঘাটে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাড়ি ফিরতে সদরঘাটে সবচেয়ে বেশি লোক হবে বৃহস্পতিবার। শুক্রবার আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
বিআইডব্লিউটিএ-এর সদরঘাট বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা) আলমগীর কবির বলেন, ভরে যাওয়ায় সকালে রাঙ্গাবালী ও ভোলার দু’টি লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে গেছে, যদিও এই লঞ্চগুলোর ছেড়ে যাওয়ার সিডিউল ছিল বিকেলে। তিনি বলেন, বুধবার যাত্রীদের চাপ আছে, বৃহস্পতিবার চাপটা হবে সবচেয়ে বেশি। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে আমরাও প্রস্তুত। কোস্টগার্ড, পুলিশ, র্যাব সদরঘাটে দায়িত্ব পালন করছেন। বুধবার বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের জন্য ১২০-১২৫টি লঞ্চ প্রস্তুত আছে বলেও জানান আলমগীর কবির। মূল টার্মিনালে ঢাকা-বরিশাল রুটে চালাচলকারী অ্যাডভেঞ্চার-৯, সুরভী-৭ ও ৯, সুন্দরবন-১০, কীর্তনখোলা-২, পারাবত-৯, ফরহান-৮ লঞ্চ দেখা গেছে। এছাড়া ঝালকাঠি রুটে চলাচলকারী সুন্দরবন-১২; মাদারীপুরে রুটে চলা পারাবত-১৫, ভান্ডারিয়া রুটের অগ্রদূত প্লাস, ফারহান-৭ ও ১০, টিপু-১২, মনিংসান-৯; আমতলী রুটের প্রিন্স অব হাসান-হোসেন-১; বরগুনা রুটের সুন্দরবন-৫, মানিক-৯, যুবরাজ-২; চরফ্যাশন রুটের কর্ণফুলী-২, ফারহান-৬; বোরহানউদ্দিন রুটের গাজী সালাহউদ্দিন; হাতিয়া রুটের ফারহান-৪ ও তাসরিফ-১; ভোলা রুটের গ্লোরী অব শ্রীনগর-৭, কর্ণফুলী-৪ ও ৯; ঘোষেরহাট রুটের প্রিন্স অব রাসেল-৪, গ্লোরী অব শ্রীনগর-৮ লঞ্চ ঘাটে দেখা গেছে। পূর্বদিকের টার্মিনালে ছিল পটুয়াখালী রুটের সুন্দরবন-৭ ও ৯, প্রিন্স অব আওলাদ-৭, জামাল-৫, সাত্তার খান-১ লঞ্চ। এ সব লঞ্চের বেশির ভাগের ছাদেও যাত্রীদের দেখা গেছে। টার্মিনালে জায়গা না থাকায় নদীর মধ্যে নোঙ্গর করা ছিল কিছু লঞ্চ। অনেক যাত্রীকে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় চড়ে সেসব লঞ্চে যেতে দেখা গেছে।
মীরহাজিরবাগ থেকে স্ত্রী ও তিন বছরের সন্তান নিয়ে সদরঘাট এসেছেন শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, যাব পটুয়াখালী কিন্তু লঞ্চ দেখছি অন্য ঘাটে। ছোট বাচ্চা মহিলা নিয়ে তো নৌকা দিয়ে যেতে পারব না। লঞ্চ ঘাটে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। ফারুক, রেজাউল, জাহাঙ্গীর হৈ হল্লা করে জামাল-৫ লঞ্চে উঠছেন। তারা সম্পর্কে চাচাতো ভাই, তারা বাকেরগঞ্জ যাবেন।
ঢাকায় সবাই পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ফারুক বলেন, ঈদের সময় দেশে একসঙ্গে সবাই যাওয়াটাই একটা আনন্দ। কিন্তু আমরা জানি না লঞ্চে একটু বসার জায়গা আমাদের হবে কিনা।
সদরঘাটে বিআইডব্লিউটিএ’র নতুন ভবনের নিচতলায় বিভিন্ন লঞ্চের টিকিট কাউন্টারে গিয়ে দেখা গেছে, সবগুলো কাউন্টার খালি পড়ে আছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা ও লঞ্চ মালিকরা জানিয়েছেন, লঞ্চের কেবিনের টিকিট নিতে কেউ কাউন্টারে আসে না। কেবিনের টিকিট যাত্রীরা তা ফোনে বা লঞ্চে এসেই কেটে ফেলেন। আর ডেকের যাত্রীরা লঞ্চে উঠেই সব সময় টিকিট কাটেন।


