ঢেউপাশি হুজুরের হিরন্ময় স্মৃতি

ঢেউপাশি হুজুরের হিরন্ময় স্মৃতি

স্মরণ । শাহ নজরুল ইসলাম

ঢেউপাশি হুজুরের হিরন্ময় স্মৃতি

(১৯৫২-২০২০খ্রি./১৩৭১-১৪৪১হি.)

তিন.
العلم نور وخير الناس تطلبه
يا طالب العلم لا تبغي به بدلا
والجاهلون لأهل العلم أعداء
الناس موتى وأهل العلم أحياء
‘ইলম হচ্ছে নূর কেবল সভ্যরাই তার অন্বেষী,
হে তালেবে ইলম! এর বদলে অন্য কিছু নিও না।
আর জাহেলরা তো আলেমদের দুশমন,
মানুষ তো মৃত; কেবল জীবিত আলেমগণ।’

কবিতাটি হযরত আলী রা. এর রচিত।এতে তিনি ইলম ও আলেমের মর্যাদা ও তাৎপর্যের প্রতি আলোকপাত করেছেন।

ঢেউপাশী হুজুর ইলম ও আলিমের এই মর্যদা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করেছিলেন একেবারে ছাত্র জীবন থেকেই।এজন্য ছাত্র জীবন থেকেই ইলমের জন্য সীমাহীন ত্যাগ ও কুরবানী করেছেন।দিনে দিনে তার ইলমের পিপাসা কেবল বেড়েছে এবং তিনি জ্ঞান চর্চায় ব্যাকুল মশগুল থেকেছেন।আর মহান আল্লাহ তার কদর ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থেকেছেন। ইলমের সাধনাই তার জীবনের পেশা আর নেশা ছিল। এ নিয়েই ছিল তার রাত দিনের ব্যতি ব্যস্ততা। তাঁর কাছে বসলে তিনি ইলমেরই নাড়াচাড়া করতেন। আর তার সান্নিধ্য প্রার্থিরা ইলমের ঘ্রাণ পেতেন।

আমরা জানি যে, ইলম শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন-
العلم بالكسر وسكون اللام: في عرف العلماء يطلق على معان منها، الإدراك مطلقا
ইলম এর একাধিক অর্থ রয়েছে। এর একটি অর্থ হচ্ছে অনুধাবন ও উপলব্ধি করা। দার্শনিকগণ এই অর্থের প্রবক্তা। কেউ কেউ বলেন,
ومنها التصديق مطلقا، يقينياكان أو غيره والعلم بمعنى اليقين في اللغة
‘ইলমের অর্থ সত্যায়ন করা। চাই তা ইয়াকিনী হোক বা অন্য কিছু। আর অভিধান অনুযায়ী ইলম অর্থ ইয়াকিন বা বিশ্বাস।’
এর এক অর্থ হচ্ছে التعقل বা আকলের সাহায্যে অনুধাবন করা। আর এই অর্থের ভিত্তিতেই ইলম শব্দটি কল্পনা, ধারণা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইলমের আরেকটি অর্থ হচ্ছে-
إدراك المسائل عن دليل
তথা দলীলের ভিত্তিতে মাসআলা আয়ত্ব করা। বস্তুত ইলম হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার সিফাত বা অনন্য গুণাবলিসমূহের একটি, যা ইলমের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে।

এ সব অর্থের প্রতিফলন ছিল হুজুরের মাঝে।তাঁর অনুধাবন ও উপলব্ধি ছিল সুগভীর।তাঁর জ্ঞান ছিল প্রত্যয়পূর্ণ সুদৃঢ় বিশ্বাসের আলিঙ্গনে আবদ্ধ।শরীয়ার দলীল নির্ভর ইলমে তিনি ছিলেন হৃদ্য।

ইলমের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পূর্বসূরীগণ এর অন্তর্নিহিত একটি সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন। যে সংজ্ঞায় ইলমের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত ইলমের আলামত ফুটে ওঠে। যেমন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. বলতেন,
ليس العلم بكثرة الرواية، إنما العلم خشية الله
‘বেশি বর্ণনা করা ও অধিক পরিমাণ আক্ষরিক জ্ঞান হাসিল করার নাম ইলম নয়, বরং ইলম হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার ভয়ের নাম।’

সুবহানাল্লাহ! ঢেউপাশী হুজুরের মাঝে আমরা সে ভয় দেখেছি প্রতিনিয়ত।সুদিনে নিদানে সুখে দুঃখে, রাত দিনে তাঁর মাঝে তাকওয়া বিরাজমান ছিল। মালিকের ভয়ে তিনি কম্পমান ছিলেন। ইমাম মালেক রহ. বলতেন,
الحكمة والعمل نور يهدي به الله من يشاء وليس بكثرة المسائل ، ولكن عليه علامة ظاهرة وهو التجافي عن دار الغرور والإنابة إلي دار الخلود
‘হেকমত ও আমল হচ্ছে একটি নূর। যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা তাকে পথ দেখান। আর বেশি বেশি মাসআলা জানার নাম ইলম নয়। এর একটি আলামত আছে। তা হচ্ছে, ইলমের বদৌলতে প্রতারণার এই জগত থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং চিরস্থায়ী জগতের দিকে ধাবিত হওয়া।’ আমার হুজুর দুনিয়া নির্মূহ দুনিয়া বিমুখ এক আখিরাতমুখী আলেম ছিলেন।দুনিয়া তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি কোন দিনও।

ইমাম শাফেয়ী রহ. বলতেন, وما العلم إلا العمل به والعمل به ترك العاجل للآجل ‘ইলম হচ্ছে আমলের নাম। আর আমল হলো স্থায়ী জগতের স্বার্থে ক্ষণস্থায়ী জগত পরিহার করা।’ এ বক্তব্য ঢেইপাশি হুজুরের ক্ষেত্রে প্রজোয্য ছিল। মহান আল্লাহ আমার হজুরের সকল প্রচেষ্টাকে কবূল ও মনযূর করুন।
লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *