- আমিনুল ইসলাম কাসেমী
প্রেমের টানে, হৃদয়ের টানে, আত্মশুদ্ধির মানসে মন ছুটে চলেছে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল বেলংকার ইজতেমাতে। মাত্র একবার গিয়েছি সেখানে। কিন্তু তার প্রেমসুধা আমাকে পাগল করেছে। তাড়াইল ইজতেমাতে কী এক আকর্ষণ, কী এক সৌন্দর্য, সেটা বর্ণনা করার ভাষা নেই। তবে ইসলাহ বা সংশোধনের মারকাজ বলা যায় তাকে। এক ব্যতিক্রমধর্মী খানকা। যেখানে সত্যি মানুষ নিজেকে পাপ-পঙ্কিলতা ত্যাগ করে মহান রবের প্রতি নিগুঢ় ভালবাসা জন্মাবে। দুনিয়ার সব লোভ-লালসা ত্যাগ করে মহান প্রভুর দিকে রুজু হবে।
কুতুবে রব্বানী, ফকীহুন নফস রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী (রহ.) এর আজাল্লে দরজার খলিফা ছিলেন কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) আর হযরত মাদানী এর খলিফা ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.)। আবার ফেদায়ে মিল্লাতের অন্যতম এক খলিফা হলেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাতবারাকাতুহুম। মানে এক মোবারক সিলসিলা। সুত্রপরম্পরা অত্যন্ত মজবুত। এই তরিকার সাথে সম্পর্ক রাখা বড় সা’দাতমান্দী।
কুতুবে রব্বানী রশিদ আহমাদ গঙ্গুহী যিনি হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী থেকে খেলাফত-ইজাজত লাভ করেন। আর হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী যিনি একজন বিশ্ব কুতুব এবং মর্দে মুজাহিদ ব্যক্তি ছিলেন। জীবনের শেষ বয়সে খানায়ে কাবার পাশে হিজরত করেন। তাঁর শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ হয় সেখানে। মক্কা মোকাররমার জান্নাতুল মুয়াল্লাতে তাঁর সমাধি।
পথহারা বান্দাকে সহীপথে আনার ব্যাপারে তাঁরা বিশাল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যার উপমা হয় না কখনো।
এই সিলসিলার সাথে তায়াল্লুক রাখা, ওই সকল মুরুব্বীগণের রুহানী ফয়েজ প্রাপ্ত হওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। ওই সকল মনীষীগণ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহবান করেছেন। রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা মোতাবেক মানুষকে চলার সুপরামর্শ দিয়েছেন। মানুষকে সীরাতে মুস্তাকিমের উপর চালানোর জন্য তাঁদের ত্যাগ কোরবানীর অন্ত নেই। পথহারা বান্দাকে সহীপথে আনার ব্যাপারে তাঁরা বিশাল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যার উপমা হয় না কখনো। আকাবিরে দেওবন্দ যেসব ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেটা নজীর বিহীন। সেটা ইতিহাস হয়ে আছে। যে ইতিহাস কখনো মুছে যাবেনা এই ধরা থেকে।
শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাতবারাকাতহুম ওই সকল মনীষীগণের অনুগামী। হুবহু তাঁদের অনুসরণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেই সকল মনীষীগণ যেভাবে মানুষকে লিল্লহিয়্যাতের সাথে বক্ষে ধারণ করেছেন, কাছে টেনেছেন, তিনিও সেভাবে তাঁদের অনুসরণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন। কোনো লৌকিকতা নয়, পার্থিব স্বার্থ নয়, নেই কোনো ছলচাতুরী। মহান মাশুকের প্রেম-ভালোবাসা হাসিলের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রাণান্তর কোশেশ। আকাবির-আসলাফদের মত তাঁর মিশন অব্যবহিত ভাবে ছুটে চলেছে।
যেন তেন ব্যক্তি আল্লামা মাসঊদ নন। সাধারণ কোনো আলেম নন। তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং যোগ্যতা সর্বজন বিদিত। তাঁর মা’লুমাত সর্বজন স্বীকৃত। দারুল উলুম দেওবন্দের এ যাবত কালের মেধাবীমুখদের অন্যতম এক আলেমেদ্বীন। যার খ্যাতি এখন বিশ্ব জুড়ে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের ইসলামী স্কলারদের মধ্যমণিতে তিনি পরিণত হয়েছেন।
এরকম খ্যতিমান ব্যক্তি সুলুকের লাইনের মহান সাধকের ভূমিকায় মেলাভার। শুধুমাত্র দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবিরদের মাঝে এমন বৈশিষ্ট খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁরা যেমন খ্যতিমান আলেম আবার ইলমে তাসউফে ছিল জগৎসেরা ব্যক্তিত্ব। তদ্রুপ দারুল উলুম দেওবন্দের এই সূর্যসন্তান সেই সব মহান আকাবিরদের পথ আঁকড়ে আছেন। তাঁদেরকে পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন।
বেলংকার ময়দান এখন খোদাপ্রেমিকদের পদভরে মুখরিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ জামাতবদ্ধ হয়ে হাজির।
বর্তমানে আল্লামা মাসঊদ সাহেব দেশব্যাপি মানুষের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাদের খেদমতে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এখন তাঁর খানকা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মানু্ষকে আত্মশুদ্ধির মেহনতে ধাবিত করছেন। হাজারো উলামা-তলাবা সেই মেহনতে শরীক হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গাতে আলেমদের মাঝে তাঁর খানকার প্রসিদ্ধ লাভ করছে।
গতকাল ৪ মার্চ শুক্রবার থেকে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলাধীন বেলংকাতে তিনদিন ব্যাপি তাঁর ইসলাহী ইজতেমা শুরু হয়েছে। বেলংকার ময়দান এখন খোদাপ্রেমিকদের পদভরে মুখরিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ জামাতবদ্ধ হয়ে হাজির। নিজের আত্মার ইসলাহ বা সংশোধন এবং মহান আল্লাহর রাহে চলার বাসনা এবং পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী নিজের জীবন গঠন করার প্রত্যয় নিয়ে তাদের এই আগমণ।
আমার মন ছুটে চলেছে সেই খোদাপ্রেমিকদের মিলনমেলায়। এ হৃদয় যেন ব্যাকুল হয়ে আছে। কখন পৌছাবো সেখানে। প্রিয় শায়েখের মজলিসে বসব। প্রাণভরে কথা শুনব তাঁর। দূর হবে মনের যাতনা। হে আল্লাহ, তুমি সহজ করো, কবুল করো। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট


