তাবলিগের মারকাজে গোপন জ্যামার

তাবলিগের মারকাজে গোপন জ্যামার

পাথেয় ডেস্ক : রাজধানীর কাকরাইলে তাবলিগ জামাতের মারকাজে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রাখতে গোপনে জ্যামার বসিয়েছিলেন এক প্রকৌশলী। এলিফ্যান্ট রোডের একটি দোকান থেকে তিনি জ্যামার দুটো কেনেন। এরপর মারকাজের দক্ষিণ পাশের ভবনের তৃতীয় তলার দুটো কক্ষে সেগুলো স্থাপন করেন। পুলিশ বলছে, ‘বড় ধরনের ক্ষতিসাধনের লক্ষ্যে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করার উদ্দেশ্যে’ এসব জ্যামার বসানো হয়েছিল।

গত ২৭ এপ্রিল রাজধানীর কাকরাইলে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র (মারকাজ) সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিরোধীরা দখল করে নেন। বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে কাকরাইল মসজিদে এনে তাঁরা মারকাজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগের দিন (২৬ এপ্রিল) রাতে জ্যামার দুটি মারকাজে বসানো হয়েছিল। এ সময় মারকাজে অনেক বিদেশি অবস্থান করছিলেন।

২৭ এপ্রিল তাবলিগের মারকাজ সাদ–বিরোধীরা দখল করেন
হাজারো শিক্ষার্থীকে এনে মারকাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়
২৬ এপ্রিল রাতে মারকাজে জ্যামার বসানো হয়েছিল
ঘটনার সময় মারকাজে অনেক বিদেশি ছিলেন

ওই দিনের ঘটনা উল্লেখ করে রমনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ মোশাররফ একটি মামলা করেন। তিনি এজাহারে বলেন, তাবলিগ জামাতের লোকজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে জানতে পেরে ২৬ এপ্রিল রাত নয়টার দিকে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। পুরো বিষয়টি মুঠোফোনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে গিয়ে দেখেন মোবাইলের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন। সেখানে উপস্থিত অন্যরাও নেটওয়ার্ক পাচ্ছিলেন না। এরপর তল্লাশি চালিয়ে রাত পৌনে ১২টার দিকে প্রকৌশলী মাহফুজের কক্ষের বাথরুমের সিলিংয়ের ওপর থেকে একটি সিলভার কালারের জ্যামার উদ্ধার করেন। এর কিছুক্ষণ পর তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা মো. হোসাইনের কক্ষ থেকে আরেকটি জ্যামার উদ্ধার করা হয়।

মামলায় বলা হয়, সংশ্লিষ্টরা ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(৩) ধারায় অপরাধ করেছেন। ওই ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কারও কার্যকারিতা বা কর্মক্ষমতা নষ্ট করতে পারেন না। আইনের লঙ্ঘনকারীদরে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলিস্তানের স্টেডিয়াম মার্কেটের ‘পিএবিএক্স সিসিটিভি’ বিক্রেতা মো. শামসুজ্জামানের মধ্যমে জ্যামার দুটি সংগ্রহ করেন মাহফুজ মান্নান। আর শামসুজ্জামান সেই দুটি কিনেছিলেন এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের ‘ডিগনিটি ডিস্ট্রিবিউশন’ নামক কম্পিউটারের উপকরণ বিক্রির দোকান থেকে। জ্যামার দুটো বসিয়েছিলেন শামসুজ্জামানের টেকনিশিয়ান ইউনুসসহ তিনজন। এ সময় প্রকৌশলী মাহফুজও সেখানে ছিলেন।

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শামসুজ্জামান বলেছেন, প্রকৌশলী মাহফুজ তাঁর পূর্বপরিচিত। তাঁর অনুরোধে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের একটি দোকান থেকে সেগুলো কিনে দেন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা মাহফুজ মান্নান তাবলিগেরই একজন সাথি। তিনি কাকরাইল মারকাজের বিভিন্ন নির্মাণকাজ দেখাশোনা করেন। তাবলিগের শুরা সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। মারকাজের যে স্থানে শুরা সদস্যদের জন্য কক্ষ রয়েছে, সেখানে তাঁরও একটি কক্ষ রয়েছে। ট্রাস্ট বিল্ডার্স নামে একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মের স্বত্বাধিকারী তিনি। মতিঝিলের জীবন বিমা টাওয়ারের নবম তলায় তাঁর কার্যালয়। তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তিনি সাদবিরোধী অবস্থান নেন। সাদ অনুসারীদের অভিযোগ, তাবলিগের দুই পক্ষের মধ্যে বিভেদ তৈরির পেছনে মূল ক্রীড়নকের কাজ করছেন এই প্রকৌশলী।

দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মাহফুজকে গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রমনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকৌশলী মাহফুজকে আমরা গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। তিনি পলাতক আছেন।’ তবে প্রথম আলোর প্রতিনিধির সঙ্গে মাহফুজের দেখা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলে মোফিজুর রহমান হেসে ওঠেন। তিনি তখন এই প্রতিবেদকের কাছে প্রকৌশলী মাহফুজের অফিসের ঠিকানা জানতে চান।

জ্যামার বসানোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে প্রকৌশলী মাহফুজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সবকিছু মিথ্যা দাবি করেন এবং এই প্রতিবেদককে মতিঝিলে তাঁর ‘ট্রাস্ট বিল্ডার্সের’ কার্যালয়ে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে ফোন দিলে তিনি কার্যালয়ে নেই বলে মুঠোফোনে জানান। কিছুক্ষণ পর তৌহিদুল ইসলাম নামে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠান। কথাবার্তার একপর্যায়ে তৌহিদ কিছু টাকা এই প্রতিবেদকের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সূত্র : প্রথম আলো

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *