‘তুই জ্বালাচ্ছিস’ বলে রাত্রে বাসার দরজা ভেঙে সাংবাদিককে আটক

‘তুই জ্বালাচ্ছিস’ বলে রাত্রে বাসার দরজা ভেঙে সাংবাদিককে আটক

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : কুড়িগ্রামের বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে মাদক বিরোধী অভিযানে আটক ও পরে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদালত। অভিযানের সময় মাদকসহ আরিফুল ইসলাম রিগানকে আটক করা হয় বলে দাবি করেছেন অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা। তবে আরিফুল ইসলামের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার বলেছেন, ‘মধ্যরাতে বাড়ির দরজা ভেঙে ঢুকে আরিফকে পেটানো, জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কোনো মাদক পাওয়া যায় নি।’

‘মাদক বিরোধী অভিযানের’ উদ্যোগ জেলা প্রশাসন না মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয় নিয়েছিল— তা নিয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালকের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাত ১২টার দিকে তার কুড়িগ্রাম শহরের চড়ুয়াপাড়াস্থ বাড়ি থেকে আটকের পর সাজা দিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়।

রাতের বেলা এক সাংবাদিককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানে রংপুরের অতিরিক্ত কমিশনার পৌঁছেছেন। তাঁকে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন আজকালের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে।

অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ, আনসার ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানের সময় মাদকসহ আরিফুল ইসলাম রিগানকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে সে দোষ স্বীকার করায় এক বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

মোস্তারিমার অভিযোগ, ‘কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন তাঁর নিজ নামে একটি পুকুর করেছিলেন। আরিফুল এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিলেন। এ ছাড়া সম্প্রতি একটি নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে ডিসির বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। এ সবই তাঁর কাল হয়েছে।’

তবে মোস্তারিমার স্ত্রীর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেছেন, ‘আমার নামে কোনা পুকুরের নামকরন হয়নি। এক বছর আগে এমন প্রতিবেদন করেছিলেন আরিফুল। এ জন্য তিনি ক্ষমাও চেয়েছেন। ওটা বিষয় না।’

জেলা প্রশাসক পারভীন সুলতানা বলেন, ‘অ্যাজ ইউজুয়াল টাস্ক ফোর্স অভিযানে গেছে। মাদকদ্রব নিয়ন্ত্রণ অফিসের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আমার একজন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের কয়েকজন ফোর্স, ব্যাটালিয়ান আনসারের পাঁচজন আর মাদকদ্রবের তিনজন ছিলেন। তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই অভিযান হয়। মাদক দ্রব্যই আমাদের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট চেয়েছিল।’

তবে আজ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবু জাফর বলেছেন, তিনি এলাকায় ছিলেন না। আজ শনিবার দুপুরে কার্যালয়ের পরিদর্শক জাহিদ সাহেব তাঁকে জানিয়েছেন, রাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের অভিযানের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়।’

আবু জাফরের এই বক্তব্য জেলা প্রশাসককে জানালো হলে তিনি বলেন, ‘মাদকদ্রব্য কার্যালয়ের পক্ষ থেকেই চাওয়া হয়েছিল। তারপর এরা (ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা) বলেছে যে, যাওয়া যাবে। অবশ্য আমি তো কাল ছিলামও না, আমি রৌমারিতে ছিলাম।’

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, তাঁরা বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারকে বলেছেন।। আজকালের মধ্যে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামও বলেছেন, বিভাগীয় কমিশনারকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। সেখান থেকে অতিরিক্ত কমিশনারকে ঘটনাস্থলে পাঠানোও হয়েছে।

আরিফের স্ত্রী মোস্তারিমা গতকাল রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাতে ঘুমোনোর আয়োজন চলছে, সেই সময়ে দরজায় আঘাত। কে ডাকছে, এ প্রশ্ন কোনো সাড়া নেই। সন্দেহ তাই বাড়ে। আরিফুল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে ফোন দেওয়ার যখন চেষ্টা করেছেন, তখনই হুড়মুড় করে দরহজা ভেঙে সাত থেকে আটজনের একটি দল ঢুকে পড়ে। তাদের মধ্যে তিনজন জাপটে ধরে আরিফুলকে পেটাতে থাকে। আমাকেও মারার উপক্রম করে, গালিগালাজ চলতে থাকে। একজন আরিফুলকে বলে, ‘তুই খুব জ্বালাচ্ছিস।’

মোস্তারিমা বলেন, গতকালের অভিযানে অন্তত ৪০ জন ছিল। আজ শনিবার জেলা প্রশাসকের অফিসে তাদের ডাকা হয়। পরিবারের কয়েকজনকে সঙ্গে করে নিয়ে যান তিনি। মোস্তারিমার অভিযোগ, সেখানে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার নাজিমউদ্দিন বলেন, ‘পানিতে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করবেন না।’ তবে নাজিম উদ্দিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘উনি আমার সম্পর্কে না, অন্য কারও কথা হয়তো বলেছেন। আমি এ ধরণের কথা বলিনি।’

বাংলা ট্রিবিউন ডটকমের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইমন বলেন, তারা বিষয়টি আইনমন্ত্রী ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। আজ শনিবার বন্ধের দিন থাকায় আইনি পদক্ষেপ দিতে পারেননি। আরিফুল ইসলামের জন্য তারা প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপে যাবেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *