দিল্লী-কাকরাইল, কেউ মানছে না আলেমদের নির্দেশনা

দিল্লী-কাকরাইল, কেউ মানছে না আলেমদের নির্দেশনা

দিল্লী-কাকরাইল, কেউ মানছে না আলেমদের নির্দেশনা

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : দাওয়াত ও তবলীগের মেহনত ওলামায়ে কেরামের কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ। এবং আলেমগণের প্রতক্ষ্য মদদে দাওয়াতের মেহনত বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে চলেছে। বার বার প্রমাণিত, আলেমগণের মদদেই এ কাজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি নিজামুদ্দীন মারকাজে যে ঘটনা ঘটেছে। প্রায় দশ জন মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। ১৪০০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো ভারতে তোলপাড় চলছে। নিরীহ তবলীগের সাথীদের প্রতি সমালোচনার তীরও ছুড়ে হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক উস্কানী দিচ্ছে মিডিয়াগুলো। নাজেহাল করা হচ্ছে নিজামুদ্দীন এর তবলীগের সাথীদের।

এই কঠিন বিপদের সময় এগিয়ে এলেন দারুল উলুম দেওবন্দের সিনিয়র মুহাদ্দিস, জমিয়ত ওলামায়ে হিন্দের সভাপতি সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী সাহেব। তিনি নিজামুদ্দীনের পাশে দাঁড়ালেন। ডাইরেক্ট প্রতিবাদ করলেন মিডিয়ার প্রচারগুলোর। সেই সাথে সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণকে সমালোচনা করলেন।

সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী বলেন, সরকার যেভাবে হঠাৎ করে পুরো দেশ লক ডাউন করেছে, তাতে তো দূর- দূরান্তের কেউ বের হতে পারেনি। নিজামুদ্দীন থেকে লিখিত আকারে সরকারের কাছে জানানো হয়েছিল, আমাদের এখানে অনেক সাথী আটকে পড়ে আছে, কিন্তু কেউ তখন কান দেয়নি। তাদের কোন সহযোগিতা করা হয়নি।

অথচ নিজামুদ্দীনকে দোষারোপ করা হচ্ছে। যত দোষ তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আপনারা একটু তাকিয়ে দেখুন, সরকারের লকডাউন ভঙ্গ করে ভারতে বিভিন্ন জায়গায়, অনেক গ্যাদারিং হয়েছে। সে গুলোর ব্যাপারে কেউ কোন টু শব্দ করছে না। পথে পথে হেঁটে ফিরতে গিয়ে অনেকে মারাও গেছে।

সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী বলেন, এখন বিশ্বব্যাপি মহামারি চলছে। আমরা ধর্ম বর্ণ ভুলে গিয়ে মহামারি থেকে বাঁচার চেষ্টা করছি। কিন্তু মিডিয়া এবং সরকার যেটা করছে, সেটা এই মহামারি থেকে আরো মারাত্মক, আরও ভয়াবহ।

একটু পেলে আরেকটু কচলায় মিডিয়া। ভারতে এই অবস্থার মধ্যে সরকারের উচিত হবে, যারা অসুস্থ তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। সাম্প্রদায়িক কোন বিষবাষ্প না ছড়িয়ে সবাই মিলে একতাবদ্ধ হয়ে কিভাবে মহামারী থেকে বাঁচা যায় সেই চেষ্টা করা।

এটার নামই ওলাময়ে দেওবন্দ। মতানৈক্য থাকতে পারে নিজামুদ্দীন এর সাথে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে নিজামুদ্দীন এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন মাদানি পরিবার। বিপদের সময় নিজামুদ্দীন এর জন্য বুক পেতে দিলেন।

এবার আসুন! নিজামুদ্দীন টু কাকরাইল। সব জায়গাতে দাওয়াতের মেহনত চলছে রমরমাভাবে। শত বছর ধরে নিজামুদ্দীন। সেই সাথে কাকরাইলও প্রায় পৌনে একশ বছর থেকে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি কিন্তু কাউকে কটাক্ষ করে কিছু বলছি না। তবলীগের উভয় দলকে ভালবাসি। তারা দ্বীনের মেহনত করে যাচ্ছেন। কিন্তু কথা হল, তবলীগের এই দুই দল, কতটুকু কুরআন সুন্নাহ এবং ওলামায়ে কেরামের পরামর্শ মেনে চলছেন।

যদিও একদল নিজেদের আলমি শূরা যারা আলেম- উলামার জামাত হিসেবে দাবি করছেন। আরেকদল নিজামুদ্দীন এর আমীরের ইতায়াত করে যাচ্ছেন।
এখানে বলুন তো? কোন দলটাই শরয়ী মাপ কাঠি অনুযায়ী পুরোপুরি চলছেন?

দেখুন! অল বিশ্বের উলামায়ে কেরাম যেখানে একই প্লাট- ফরমে। করোনা ভাইরাস মহামারির সময় মুসলিমদের কি করণীয়, সে বিষয়ে বার বার আলেমগণ জাতিকে পরামর্শ দিচ্ছেন। আলেমগণ তো নিজের মনগড়া কিছু বলেন নি, সবই কুরআন – হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

আমি নিজামুদ্দীন এর কথা বলছি না। বাংলাদেশের কথাই ধরুন। সরকার যখন দেশের জনগণকে বার বার সতর্ক করেছেন। এবং বলেছেন, ২৬ মার্চ থেকে গণ পরিবহন বন্ধ থাকবে। সবাইকে ঘরে থাকতে হবে। দেশে র সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হল। এমনকি কওমী মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হল। যে কওমী মাদ্রাসা কোনদিন বন্ধ হয় না, সেটাও বন্ধ করা হল। দেশের সব অফিস আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হল।

কিন্তু আমাদের দেশের তবলীগ জামাতের কার্যক্রম কি বন্ধ করা হয়েছে? বন্ধ হয়নি। কোন গ্রুপেরটা নয়। আলমী শূরা বলেন আর নিজামুদ্দীন এর এতায়াতী বলেন, দুটোই তারা এখনো মাঠে- ময়দানে- মসজিদে।
এই লকডাউনের মধ্যেও তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ওলামায়ে কেরাম যেখানে মসজিদে গ্যাদারিং করতে নিষেধ করছেন, জামাতকে স্বপ্ল পরিসরে দু চারজন মিলে করার পরামর্শ দিচ্ছেন,সেখানে কেন এখনো তবলীগের জামাতের কাজ চলবে?

মাদ্রাসার কার্যক্রম থেকে কি তবলীগের কাজ বেশী বড় হয়ে গেল? মসজিদের জামাত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে,সেখানে কেন আজো তবলীগের কাজকে আপাতত সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি?

আমি আরো আশ্চার্য হলাম, দেশের বিজ্ঞ আলেমগণ ইসলামিক ফাউন্ডেশনে একত্র হলেন। কিন্তু তবলীগের কাজের ব্যাপারে কোন নির্দেশনা তারা দিলেন না। তাদেরও এ বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করা উচিত ছিল।

কাকরাইলে যারা আছেন, তাদের উচিত ছিল, আলেম- উলামা এবং সরকারের সুপরামর্শ মেনে চলা। নিজেদের খেয়াল খুশি মত চলাটা ঠিক হয়নি। কাকরাইলের জিম্মাদারগণের উচিত ছিল, মাঠে – ময়দানে যেখানে জামাত আছে, তাদের ঘরে ফেরার পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু কাকরাইল এর কোন গ্রুপ করেননি। করলেও নামে মাত্র। কেননা, কড়াভাবে কিছু বলা হয়নি। যে কারণে এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জামাত ছড়িয়ে রয়েছে।

এখানেই আমাদের বড় সমস্যা। কোন দলই আলেম- উলামার ফতোয়ার উপরে আস্থা রাখেন না। শুধু মুখে মুখে আমরা বলি, আলেম – উলামার ইজ্জতের কথা বলে অনেক বয়ান করি, কিন্তু আলেমদের ঐক্যবদ্ধ ফতোয়াকে মানি না। এমনিভাবে সরকারের কোন নির্দেশনা মানেন না কেউ। যেটা খুবই দুঃখজনক।

আল্লাহ না করুন, আল্লাহ না করুন। যদি নিজামুদ্দীনের মত কোন ঘটনার পুনারাবৃত্তি হয় এ দেশেও। তখন তো তবলীগের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষেপে যাবে। তবলীগের প্রতি মানুষ আস্থা হারাবে। যেমন নিজামুদ্দীন এর ভুলের কারণে পুরো ভারতের মুসলমানকে দায়ী করা হচ্ছে। যত দোষ হচ্ছে এখন মুসলিমদের। ঠিক অনুরূপ কিছু হয়ে গেলে তখন তো সকলের আফসোস করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সহি বুঝ দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *