দুই পা ফেলিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

দুই পা ফেলিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ভ্রমণকাহিনী — এক

দুই পা ফেলিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পার হওয়ার পর রাতের অন্ধকারে ট্রেনের গতি আরও বেড়ে গেল। পাকশীর পর ঈশ্বরদী স্টেশনে সর্বশেষ আবার থামলো। অপরিচিত জায়গায় মনে মনে খুব অস্বস্তি বোধ করছি তখন। সাথে আবু তালহা ও মাহবুব। আমরা তিনজন মানিকগঞ্জ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। দুপুর বারোটা নাগাদ পাটুরিয়া ঘাট থেকে লঞ্চে করে পদ্মা-যমুনা পাড়ি দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে এসে পৌঁছি।

গোয়ালন্দ রেলস্টেশনে একটি ট্রেন দাঁড়ানো। তিনটার সময় রাজশাহীর উদ্দেশে ছাড়বে। কাউন্টার থেকে তিনজনের জন্য তিনটি টিকিট কেনার চেষ্টা করা হলেও সফল হইনি; কেননা সিটওয়ালা কোনো টিকিটই অবশিষ্ট নেই। সুতরাং, বাধ্য হয়েই আমাদের বিকল্প পথ ধরতে হলো…

ট্রেনে ওঠার পর প্রতিটি স্টেশনেই আমাদের মতোন অনেক অ্যাপ্লিক্যান্টে প্রায় প্রতিটা বগিই টইটুম্বুর হয়ে গেল। কুষ্টিয়ার মিরপুরে এক সহযাত্রীর অ্যান্ড্রয়েড ফোনে কম্পাসের অ্যাপসের মাধ্যমে কেবলা নির্ধারণ করে আসর ও মাগরিবের নামাজ ট্রেনের ভেতরই আদায় করি। আমাদের মধ্যে আবু তালহা কবিত্বপ্রাপ্ত হয়েছে, প্রণয়ের সরোবর রচনায় হাত খুব পাকা, আমি ওর সমস্ত সাহিত্যপ্রতিভা-ব্যয়-করা রোমাঞ্চধর্মী একটি চিঠি টাইপ করে দিয়েছি। তাই ওর সাথে আমার ভাবের আদান-প্রদানও চলে জম্পেশ! সে সূত্র ধরেই অ্যাপ্লিক্যান্টদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেয়ে ছিল; ওরা আমাদের আশেপাশেই অবস্থান করছে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে ওদের ওপর দৃষ্টি পড়ে যায় : তখন আমরা পরস্পরকে বলি এই যে এখানে বেশ কয়েকটা “কল্যাণী” আছে (আমাদের ইন্টারমিডিয়েটের বাংলা সাহিত্যপাঠ বইয়ে রবীন্দ্রনাথের “অপরিচিতা” গল্পের নায়িকার নাম কল্যাণী আর তাকে ঘিরে ট্রেনের ভেতরকার এক কাহিনী সেখানে বিধৃত হয়েছে। এটার সাথে মিলিয়ে আমরাও দুষ্টুমি করে ওদেরকে কল্যাণী আখ্যা দিয়ে মজা করতাম)। যাহোক, এ সমস্ত কল্যাণীদের বইপড়ার আসক্তি দেখে বিরক্তিতে আমার ভিড়মি খাওয়ার দশা হলো; কিন্তু আর খেতে হলো না।

ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা ছুঁই ছুঁই করছে। ট্রেনও সবেগে এগিয়ে যাচ্ছে। জানালার-পাশে-বসা হঠাৎ আমার দৃষ্টিগোছর হলো সুউচ্চ-সুরম্য-সুদীর্ঘ বিল্ডিংসমূহ। আন্দাজে আবু তালহাকে ঠেলা মেরে বললাম : দেখো, রাজশাহী এসে গেছি, এই যে ভার্সিটির বিল্ডিংগুলো। হালকা শীতের ঠাণ্ডা বাতাস জানালা দিয়ে প্রবেশ করছে। রাজশাহী রেলস্টেশন ক্রমেই আমাদের নিকটবর্তী হতে লাগলো।

হুড়োহুড়ি করে সবাই নামলাম। গেইটে টিকিট চেকার টিকিট চেক করছে। আমরা সুকৌশলে তাকে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে গেলাম। সুন্নতী লেবাসে এক ভাই ডাক দিলেন। দাঁড়ালে জিজ্ঞাসা করলেন, অ্যাপ্লিক্যান্ট কি না? সম্মতি দিলে আমার নাম, ইউনিট, রোল, জেলাসহ আরও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি রাখলেন। এই ভাইটিই হলেন মাহফুজ ভাই, রাবি ক্যাম্পাসে আই. ই. আর ডিপার্টমেন্টে পড়েন। পরে ভাইভার সময় কাজলা গেট মসজিদে তাঁর সাথে আমার বিস্তারিত আলাপ হয়।

যাহোক, রেলস্টেশনের বাইরে এসে যেই আমরা অটোতে উঠতে যাব তখনই শুরু হলো এলোপাতাড়ি জমে থাকা যানবাহনের ওপর লাঠির আঘাত। ড্রাইভারদের সাথে তথাকথিত ক্ষমতাবানদের নিষ্প্রয়োজন বাকবিতণ্ডা! আমরা তো পরিস্থিতি দেখে ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজছি পাছে আমাদের পিঠেও লাঠির আঘাত পড়বে এই ভয়ে। কিন্তু তখনই পরিবেশ মারমুখী অবস্থা থেকে স্বাভাবিক হলো। একটি অটোতে করে বিনোদপুর গেটে গেলাম। সেখান থেকে একটু ভেতরে আমজাদের মোড়।

এখানেই মানিকগঞ্জের বড়ভাই রাবির পদার্থবিদ্যার স্টুডেন্ট প্রান্ত ভাইয়ের ম্যাচে থেকে ঊ ইউনিটের পরীক্ষাটা দিয়েছি। পরীক্ষা দিয়ে বুধবারে আবার আমাদের মানিকগঞ্জে ফিরে যাওয়ার গল্পটা পুরোই নাটকীয়। সেদিকে আর নাই গেলাম। বৃহস্পতিবার ভোরে রওনা দিলাম মিরপুরে রেশমা আপার বাসার উদ্দেশে। এখান থেকে রামপুরার বনশ্রীতে। পরের দিন মানে শুক্রবার সকালে কমলাপুর থেকে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম।

অবাক করা বিষয় হলো রাবির জন্য আমি কোনো বই বা শীটই কালেক্ট করিনি বা করতে পারিনি। ছেলেখেলার মতো শুধু পরীক্ষায় অংশ নেয়াই ছিল মুখ্য। এখানেই শেষ নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দিয়ে যখন ঢাকায় ফিরছি তখন ভৈরব রেলওয়ে জংশন পার হবার পর খবর পেলাম রাজশাহীতে আমার মেরিট পজিশন ১৫৮তম। কিন্তু কল্পনায়ও আসেনি যে, আমাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে!

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *