নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে ঘিরে সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও শহরগুলোতে। রায়কে কেন্দ্র করে দেশের কোথাও কোনো ধরনের নাশকতা বা অরাজকতা হতে দেবে না সরকার। এ ব্যাপারে ন্যূনতম ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। রায়ের দিন দলের নেতারা কে কোথায় ও কীভাবে অবস্থান নেবেন এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে জেলাগুলোতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দফায় দফায় বৈঠক করে এবং সর্বশেষ গতকালও সংবাদ সম্মেলন করে বৃহস্পতিবার মাঠে সতর্ক থাকার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপি যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস, জ্বালাও পোড়াও করা শুরু করে তাহলে স্থানীয় জনগণ ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে আওয়ামী লীগ। বিএনপিকে রাজপথে সহিংসতা করতে দেবে না তারা। তবে ক্ষমতাসীনরা কোনো উসকানি দেবে না। কোনো উসকানিতে পা দেবে না বলেও জানিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিও। খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় থেকে আদালত পাড়া পর্যন্ত মানববন্ধন তৈরির মাধ্যমে শক্তির জানান দিতে চায় দলটি। আদালত পাড়ায় লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ ঘটাতে চায় তারা। রাজধানীর বাইরে কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। যদিও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের কথা বলে আসছে দলটি প্রথম থেকেই; তবে খালেদা জিয়ার সাজা হলে পরিস্থিতি কোনদিকে যায় সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন দলের নীতিনির্ধারকরা। তবে গতকালও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলনের নির্দেশ দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে কোনো ফাঁদে পা না দিতেও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ফলে রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা রয়েছে। কী হবে বৃহস্পতিবার—এ নিয়ে নানা চিন্তা মানুষের মধ্যে। রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপি কতটা বেপরোয়া হতে পারে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীনরা কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে—সে ভাবনা পেয়ে বসেছে বেশি। বড় ধরনের কোনো সহিংসতা হবে; নাকি শান্তির্পূণভাবেই কর্মসূচি পালন করবে রাজনৈতিক দল দুটি—সেদিকেই তাকিয়ে সবাই। এমনকি রায়কে কেন্দ্র করে দেশের পরবর্তী সার্বিক রাজনীতি ও পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে—এমন ভাবনাও সর্বমহলে। পাশাপাশি রায়ে সাজা হলে খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবে—সে আলোচনাও চলছে নানা মহলে। এমনকি সাজা হলে দল চলবে কীভাবে, নাকি দলে ভাঙন ধরবে—রাজনীতিতে এমন প্রসঙ্গও আসছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপি কি আন্দোলন চালিয়ে যাবে, নাকি আইনগতভাবে মোকাবিলা করবে—সে ভাবনাও পেয়ে বসেছে মানুষকে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনী রাজনীতিতে আওয়ামী লীগই বা কী ধরনের ভূমিকা রাখবে—সে দিকেও তাকিয়ে সবাই।
এ রায়কে কেন্দ্র করে কেউ যদি নাশকতা, অগ্নি সন্ত্রাস, জানমালের ক্ষতি বা ওই ধরনের কিছু করতে চায়, তাহলে অবশ্যই প্রতিহত করবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, রায় কী হবে, তা আমাদের জানা নেই। কোর্ট যেটাই ডিসিশন দেবে, সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে কোনো নাশকতা করতে দেওয়া হবে না। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক দক্ষ।
অবশ্য রায়কে কেন্দ্র করে ‘উদ্ভূত পরিস্থিতি’তে কোনো ধরনের গুজবে কান না দিতে ও ভীত না হতে দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। কোনো ধরনের অসঙ্গতি দেখলে ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশকে অবহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এমনকি বৃহস্পতিবার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
একইভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের এক বিন্দু ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেছেন, কেউ যদি সহিংসতা করে, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক বিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না।
বৃহস্পতিবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের নামে আসা ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। গত ২৫ জানুয়ারি ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান ২০০৮ সাল থেকে চলমান এই মামলার রায়ের এই দিন ঠিক করে দেন। এই মামলার রায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে খালেদা জিয়ার।
রায়কে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল সরকার। কর্মকৌশল ঠিক করতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। গত সোমবারও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপিকে নিয়ে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতরে বৈঠক করেছেন ঊর্ধ্বতন পুুলিশ কর্মকর্তারা। নাশকতার আশঙ্কা করছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য এসেছে, সড়ক ও রেলপথে হামলা চালানো হতে পারে। এমনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দফতর থেকে সব রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক ও পুলিশ সুপারদের কাছে একটি বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
‘কোনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নের অপপ্রয়াস ঘটাতে পারে’—এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাজধানীতে মিছিল এবং ছুরি-লাঠির মতো অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ভোর ৪টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
রায়কে ঘিরে আজ ঢাকায় কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে দাঁড়াতে দেবে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। সম্ভাব্য সব ধরনের অরাজকতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে র্যাব-পুলিশ। এরই অংশ হিসেবে কয়েক দিন ধরেই চলছে র্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে নজরদারি করছে র্যাব-পুলিশ। ১৪৪ ধারার পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীতে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে রিজার্ভ পুলিশ আনা হয়েছে। রায় ঘোষণার আগে ও পরের পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যেই পুলিশ সদর দফতর থেকে ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসনের অনুরোধে গতকাল সন্ধ্যা থেকে ঢাকায় ২০ প্লাটুন বিজিবি নামানো হয়েছে। এর আগে গত বুধবার থেকে দেশের ছয় জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে ৩ প্লাটুন, বগুড়ায় ৩ প্লাটুন, নারায়ণগঞ্জে ৩ প্লাটুন, নোয়াখালীতে ১ প্লাটুন, লক্ষ্মীপুরে ১ প্লাটুন এবং চাঁদপুরে ১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
বুধবার থেকে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশির পাশাপাশি মহাসড়কে কড়া নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বৃহস্পতিবার রায় বিপক্ষে গেলে বিএনপি সমর্থকরা ঢাকায় জড়ো হয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহনে ব্যাপক তল্লাশির পাশাপাশি রাজধানীতে নিরাপত্তা চৌকির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রামের পুলিশও একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে বন্দরনগরীতে সব ধরনের দেশীয় অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামের সিমেন্ট ক্রসিং থেকে পতেঙ্গার ১১ নম্বর ঘাট পর্যন্ত সড়কে বুধবার বিকেল ৪টা থেকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুর ও নরায়ণগঞ্জেও বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে পুলিশ, সন্দেহ হলেই যানবাহনে চালানো হচ্ছে তল্লাশি।
রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে তাকে কোথায় রাখা হবে, সে ব্যাপারে প্রস্তুতি নিয়েছে কারা প্রশাসন। সূত্র মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া কারাগারে সর্বোচ্চ (ডিভিশন) সুবিধা পাবেন। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়াকে গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় নারী কারাগারে (কাশিমপুর-৩) রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। ওই কারাগারেই ভিআইপি নারী বন্দি রাখার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থাও বেশ ভালো। আবার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের নারী সেলের দোতলার ঘরগুলোও ধোয়ামোছা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিএনপি যাতে বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সেজন্য কাউন্সিলরদের মাঠে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে গজারি হাতে রাস্তায় থাকার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বাস মালিক-শ্রমিকরা। এর বাইরে সরকার-সমর্থক পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা গতকাল বিকেল থেকেই রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে ২০ হাজার মানুষের পাহারা বসিয়েছে। বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।


