দেশটা ব্রিটিশ-পাকিস্তানের কলোনী নয়

দেশটা ব্রিটিশ-পাকিস্তানের কলোনী নয়

দেশটা ব্রিটিশ-পাকিস্তানের কলোনী নয়

সরকারি অনুদান নাগরিক অধিকার

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : দেশটা বৃটিশ কলোনী নয়, পাকিস্তানী কলোনীও নয়। একটা স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশ। বাংলাদেশ। আমার প্রিয় মাতৃভূমি। আমার জন্মভূমি। আমি জন্ম সূত্রে এ দেশের নাগরিক। এ দেশের মাটি মানুষের সাথে আমার সম্পর্ক।

আমি গর্ব করি, লাখ লাখ বাঙালীর পবিত্র রক্তের বিনিময়ে হলেও একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব ভূমি পেয়েছি। একখণ্ড শান্তির ভূমি আমাদের বাংলাদেশ। কোনো শাসকগোষ্ঠীর আর চোখ রাঙানী নেই। কেউ আর সেবার নামে এসে এ দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিতে পারছে না। কেউ এ দেশের উপর জুলুম-নির্যাতনের ষ্টীম-রোলার চালাতে পারছে না। আর কেউ জিম্মি করতে পারছে না এ দেশের মানুষকে।

আমি মুক্ত, আমি স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের নাগরিক। এ দেশে রয়েছে আমার নাগরিক অধিকার।

১৮৫৭ সনে সিপাহী বিদ্রোহীর পরে কী যে এক দুর্যোগ নেমে এসেছিল, সেটা তো কারো অজানা নয়। বৃটিশ বেনিয়াদের নির্মম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল এ দেশের মানুষ। হাজার হাজার আলেম-উলামাকে শহীদ করা হল। ইতিহাসে প্রমাণ করে সে-সময় বায়ান্ন হাজার আলেম শাহাদাৎ-বরণ করেন। দিল্লীর রাস্তার পাশের গাছগুলিতে শ্রদ্ধেয় আলেমদের লাশ ঝুলেছে। সে এক ভয়াবহ নিষ্ঠুর ইতিহাস, অত্যন্ত নির্মম ইতিহাস! আলেম-উলামা এবং মুসলমানদের চরম দুর্দিন ছিল সে-সময়ে। এ অঞ্চলে ইসলাম ও মুসলমান টিকিয়ে রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ, বড় নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।

তবে পূর্বেই বলেছি, ভারতবর্ষের আলেমসমাজ বুক চিতিয়ে দিয়ে ছিলেন। তাঁরা নানাভাবে ইংরেজ বাহিনীকে পরাস্ত করার কৌশল করেছিলেন।

ওলামায়ে কেরাম সরাসরি যুদ্ধও করেছিলেন। শামেলীর প্রান্তরে ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াই হয়েছিল।

বহু সংগ্রাম করেছেন আলেমসমাজ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়েছেন। তবুও নতি স্বীকার করেন নি ঐ বেনিয়াদের কাছে। হাজার হাজার আলেম শাহাদাৎ-বরণ করেছেন। তারপরেও ইংরেজদের সামনে তাঁরা ছিলেন উন্নত-শীরের অধিকারী এক-একজন মহা বীর!

ইংরেশ শাসকগোষ্ঠী যখন আলেম-উলামাদের পাইকারী হারে হত্যা শুরু করল, এ দেশ থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ করে দিল। (কেননা, এই বঙ্গেই তো ছিল আশি হাজার মাদ্রাসা। যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো বৃটিশ সরকার বন্ধ ঘোষণা করল।) তখন এই ভারত উপমহাদেশের ইসলাম এবং মুসলমান নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। সেই নাজুক পরিস্থিতিতে আলেমসমাজ গ্রহণ করলেন, ইংরেজ হটানোর নয়া কৌশল।

এবার আর সরাসরি যুদ্ধ নয়। এবার হবে কিতাবী যুদ্ধ। মানুষকে দ্বীনমুখী করা, মানুষকে দ্বীন ইসলামের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নয়া আন্দোলন, দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হল। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের আরেক ভিত স্থাপন হল।

এই দারুল উলুম প্রতিষ্ঠার সময় “উসুলে হাস্তেগানা” বা “অষ্টম মূলনীতি” প্রণয়ন করা হল। যে মূলনীতির উপর মাদ্রাসা চলবে।

উসুলে হাস্তেগানার একটি হল, এই প্রতিষ্ঠান, সব-সময় সরকারের সাহায্য মুক্ত থাকবে। সরকারের সাহায্য গ্রহণ করবে না।

সেই থেকে অবধি দারুল উলুম দেওবন্দ এবং তার শাখা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারী অনুদান মুক্ত। তারা কখনো সরকারের সাহায্য গ্রহণ করে না। তারা ব্যক্তির সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণ করে অর্থাৎ কওমের সহায়তা নিয়ে থাকে…।

১৮৬৬ সনে যে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই থেকে কখনো তারা সরকারের কাছে ধর্না দেয় নি। বরং সরকারের অনুদানকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

এ সকল প্রতিষ্ঠান সরকারের অনুদান গ্রহণ না করার কারণ হল, সরকারের অনুদান নিলে তার “সেবাদাসে” পরিণত হতে হয়। নিজস্ব কোনো অবস্থান থাকে না। ইসলামের সঠিকবাণী প্রচারে বাধাগ্রস্ত হতে হয়।

আমাদের বাংলাদেশে যত কওমী মাদ্রাসা আছে, সবই দারুল উলুম দেওবন্দের নিয়মনীতি মোতাবেক চলে। দেওবন্দকে অক্ষরে অক্ষরে ফলো করার চেষ্টা করে আসছে এ দেশে কওমী মাদ্রাসাগুলো শুরু থেকে।

বৃটিশ বিদায় নিয়েছে ১৯৪৭ সনে। পাকিস্তানের বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে ১৯৭১ সনে। অর্থাৎ, এখন আর বৃটিশদের চোখ রাঙানী নেই। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর জুলুম নির্যাতন আর নেই। আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। তবে, এরপরেও আমরা সেই উসুলে হাশ্তেগানাকে মান্য করে চলেছি এবং চলব ইনশা-আল্লাহ। অবশ্য বর্ণিত স্বাধীনভূমি, মহামারী আক্রান্ত সময়, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রেরিত অনুদানের ধরন এবং বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামের মাদ্রাসাগুলোতে এই দুর্যোগকালীন হাল ইত্যাদি ঠাণ্ডা-মাথায় বিশ্লেষণ করলে এই সিদ্ধান্তে সহজে আসা যায়– এই পরিপ্রেক্ষিতে বিপদগ্রস্ত মাদ্রাসাগুলোর সংশ্লিষ্টগণ এই অনুদান নেওয়াতে ঐ আট মূলনীতির কোনোটাই খেলাফ হওয়ার কথা নয়।

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার সময় তো ছিল, ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। বৃটিশ বেনিয়ারা একদিকে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে আলেমদের উপর। আরেকদিকে দ্বীনী শিক্ষার সূতিকাগারকে বন্ধ করার কৌশল এঁটে যাচ্ছিল তারা। সে কারণে তাঁরা কিন্তু ঐ শত্রু-সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তখন তো তাঁরা চাচ্ছিলেন বৃটিশদের বিদায়। দেশে স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হোক সেই কামনা করছিলেন।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে কিন্তু আলেমসমাজ সরকারের অনুদান নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। যা ছিল শ্রেয় কাজ, যথার্থ সিদ্ধান্ত।

বৃটিশদের বিদায়ের পরে যখন পাকিস্তান এল। পুরোপুরি আমাদের উলামায়ে কেরাম উসুলে হাশ্তেগানার উপরে টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁরা সরকারের অনুদান একদম নেন নি, সেটা বলা যাবে না।

পাকিস্তান সরকারের সময়ে সাব্বীর আহমদ উসমানী রহঃ এবং মুফতী শফী রহঃ-এর মতো বরেণ্য আলেমে-দ্বীন সরকারের অনুদান গ্রহণ করেছেন।

বাংলাদেশের মাওলানা আতহার আলী রহঃ সে সময়ে সরকারের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণ করে মাদ্রাসা চালিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

আমাদের বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বহু সরকারী অনুদান কওমী মাদ্রাসায় এসেছে। মুফতী আমিনী রহঃ তাঁর এলাকাতে, মুফতী ওয়াক্কাস সাহেব, মু্ফতী শহীদুল ইসলাম, শাহিনূর পাশা… এ রকম বহু এমপি-মন্ত্রীদের অনুদান কওমী মাদ্রাসায় প্রবেশ করেছিল।

উসুলে হাশ্তেগানার এক মূলনীতির খেলাফ (!) হলেও, উলামায়ে কেরাম নীরব ছিলেন। ফলে, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যদি মাদ্রাসার স্বকীয়তা নষ্ট না হয়, তাহলে গ্রহণ করাতে কোনো আপত্তি আসে না।

যেমনটি সাব্বীর আহমদ উসমানী রহঃ মুফতী শফী রহঃ এবং আতহার আলী রহঃ অনুদান গ্রহণ করেছিলেন।

বিভিন্ন সময়ে আমাদের কওমী মাদ্রাসাগুলোতে অনুদান আসে। সরকারের উপরস্থ ব্যক্তি বিশেষ দিয়ে থাকেন। সেগুলো সাদরে গ্রহণ করা হয়। কেউ আর উসুলের খেলাফ বলেন না।

বর্তমান পরিস্থিতি খুবই নাজুক। শত বছরের মধ্যে এ রকম অবস্থায় সৃষ্টি হয় নি। করোনাভাইরাস নামক মহামারীতে পুরো বিশ্ব স্থবির। এর প্রভাব পড়েছে সব জায়গাতে।

আমাদের কওমী অঙ্গনে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ। বহু প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা বন্ধ।

আমাদের সরকার সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু আমাদের মুরুব্বীগণ তা নাকচ করে দিয়েছেন। সাহায্য নিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।

সেই উসুলে হাশ্তেগানার খেলাফ!!! সাময়িক অনুদান সরকারের। একদম স্হায়ী করে নিচ্ছে না কওমী মাদ্রাসাকে। মাদ্রাসার শিক্ষা-ব্যবস্হা বা নীতি-আদর্শের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এমন কোনো শর্ত জুড়ে দিয়ে অনুদান দিচ্ছে না কিন্তু তারপরেও মুরুব্বীগণ না করছেন। বিগত সরকারের সময় যেভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল, সেই একই সিষ্টেম। তবুও মুরুব্বীগণের সিদ্ধান্ত, নেওয়া যাবে না।

তবে কে দেখবে কওমীর অভুক্ত শিক্ষকদের? এভাবে কঠোরতা অবলম্বন না করলেই মনে হয় ভাল হত।

আমি কিন্তু এই স্বাধীন দেশের নাগরিক। দুর্যোগের সময় অন্তত সরকারের অনুদান পাওয়া তো আমার নাগরিক অধিকার। কেননা, আমি সরকারকে ট্যাক্স দিই। আমাদের ট্যাক্সে সরকার চলে।

তাই আমি তো আমার নাগরিক অধিকার হারাতে পারি না। দেশটা এখন স্বাধীন। বৃটিশ বা পাকিস্তানের কলোনী নয়। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক
মতামতের জন্য সম্পাদক কোনোভাবেই দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *