ধর্ষণ : সমাজ অবক্ষয়ের নীরব সাক্ষী

ধর্ষণ : সমাজ অবক্ষয়ের নীরব সাক্ষী

সময়ের কথা । ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন

ধর্ষণ : সমাজ অবক্ষয়ের নীরব সাক্ষী

করোনার রেশ এখনো কাটেনি। অপ্রত্যাশিত এক বিরাট দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে পুরো মানবজাতি। সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও এর নাকানি—চুবানি থেকে বাঁচতে পারেনি বিশ্ববাসী। তারপর যা একটু ফুরসত মিলেছিল, সেটা শেষ হতে না হতেই দ্বিতীয় করোনা আক্রমণ প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এই হল আমাদের দেশসহ পুরো বিশ্বের হালচাল। তবে আমাদের দেশে অনাগত শীত এই মৃত্যুর ফাঁদকে আরো গভীর করে তুলবে, এমনটাই ভাবছেন অনেকেই। তাই কিছু বিজ্ঞ-ধীমান চিন্তাবিদ মানুষের কপালে শঙ্কার রেখা পুরু হলেও সাম্প্রতিক করুণ অবস্থা তাদের এই পুরু রেখাকে মসৃণ করে দিয়েছে।

এখন তারা আশাহত, হতভম্ব, ও মানসিক বিপর্যস্ত। হারিয়ে ফেলেছেন মুখের ভাষাটুকুও। যেন নির্বাক অবলোকন ব্যতিরেকে আর কিছুই করার নেই। যেখানে করোনা প্রতিরোধে সকলকে এক সারিতে দাঁড়িয়ে মোকাবেলা করার কথা, তখনও মনুষ্য সমাজে অনৈতিকতা চর্চার চোখ ধাঁধানো স্ফুরণ ঘটেছে। দরিদ্র মানুষের ত্রাণে আর জনসাধারণের মালের উপর শক্তির ভিত গড়েছে অর্থগৃধ্নুরা। অগত্যা এদের নিয়েই যখন করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় আক্রমণ প্রতিহত করার ছক কষা হচ্ছে তখন নীতি-নৈতিকতা মানবিকতা ও মূল্যবোধ বিবর্জিত ধর্ষক ও খুনিরা চিত্রায়িত করেছেন প্রহেলিকাময় করুণ দৃশ্যের। সমাজের কতটুকু অধঃপতন হলে ধর্ষণ আর গণধর্ষণের মত সংবাদ ঘটতে পারে এবং প্রচার হতে পারে অহর্নিশ, তা ভাবতেও অবাক লাগে।

দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা, গুম, খুন আর ধর্ষণ চলছে সমান গতিতে। তবে সম্প্রতি সবকিছুকে পেছনে ফেলে ধর্ষণসংক্রান্ত অপরাধ ছুটছে ঊর্ধ্বগতিতে। যত্রতত্র ধর্ষণ আর গণধর্ষণের ঘটনা ও ধর্ষকদের শাস্তি না পাওয়া এবং তাদের বুক ফুলিয়ে ঘোরাফেরা করার কাহিনী শুনে শুনে হৃদয় এখন হতাশায় ভারাক্রান্ত; বিধ্বস্ত। এই সমাজে নারী-শিশু এমনকি পুরুষ পর্যন্ত নিরাপদ নয়। দশ বছর বয়সী কন্যার শ্রমিক পিতা যখন তার শিশু কন্যার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে, নিজের অসহায়ত্ব সইতে না পেরে কন্যাসহ ট্রেনের নিচে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন। জ্ঞান আহরণ করতে গিয়ে বিদ্যার তীর্থভূমি শিক্ষালয়ে ধর্ষণের শিকার হয় ছাত্রী। এরপর ধর্ষক এর জটিলতা এড়াতে তলব করতে থাকে আইনি ফাঁকফোকর। এক পর্যায়ে এরা সামাজিক অতিরিক্ত প্রতিপত্তি, সম্পদ-বৈভবের অধিকারী ও ক্ষমতার দাপটওয়ালাদের লেজ ধরে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় ঠিকই।

এসব বিবেচনায় মেয়েটির কমজোর হওয়ার খেসারত দিতে হয় বিনা শব্দে বা বিনা প্রতিবাদে ধর্ষণকে মেনে নিয়ে। হয়তো মেয়েটির পরিবার গরিব -ক্ষমতাহীন নয়তো সামাজিক বলয়ে অবস্থান অপেক্ষাকৃত নিচে। এখন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের সংখ্যাধিক্যই যেন একটি পরিহাসমূলক সান্তনা। একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, সম্প্রতি দেশের প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার ধর্ষণ মামলার বিচার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। তবে কারো জানা নেই এই মামলাগুলো আদৌ শেষ হবে কিনা! নাকি মামলাগুলো ফাইলবন্দি অবস্থায় ধূলি-ধূসর হয়ে হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে! আর এদিকে আইনের আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো সঠিক বিচার না পাওয়ার যন্ত্রনা নিয়ে এই ধরণীকে বিদায় জানাবে। তবে আইন বলছে ‘এগুলো ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হবে’।

এখন আমাদের পিঠের সাথে সাথে আইনের পিঠও দেয়ালে ঠেকে গিয়েছে। তাই এবার নতুন সমীকরণ বাদ দিয়ে এর থেকে উত্তরণের সহজ পথ ও পন্থা খুঁজতে হবে। ক্রমবর্ধমান অপরাধ রোধে কার্যকরী দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব প্রয়োজন। এরকম ঘৃণ্য ও জঘন্য ঘটনার ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি আমাদের সমাজের কাঠামো ও ভাবমূর্তিকে কোন অতলে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাও একটা প্রশ্নের জায়গা তৈরি করেছে! “ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড” এটি সম্প্রতি চায়ের টেবিলে আলোচনা-সমালোচনার আলোচ্য বিষয় হলেও ভালো একটি উদ্যোগ। তবে আমাদের দেশে সঠিক আইন থাকার পরও তার যথার্থ প্রয়োগের অভাবে ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের জনগণকে রাস্তায় আন্দোলনে নামতে হয়, এটা আমাদের জন্য হতাশার।

অপরাধীদের চক্র কী এতই শক্তি-সামর্থ্য অর্জন করে ফেলেছে যে, রাষ্ট্রীয় আইনও তাদের শকুনি দৃষ্টির সামনে অসহায়! তাহলে কেন মূল অপরাধী ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা যাচ্ছে না? ধর্ষণের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির কার্যকারিতা কত দিনের শুরু হবে, এর মাঝে আরো কত নারীর সম্ভ্রম-আব্রু লুণ্ঠিত হবে? আমরা জানিনা। সময় বড়ই নাজুক! তাই কালক্ষেপণ না করে এখনই জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া উচিত। না হয় অধঃপতনের এই হিড়িক একবার ঢাল গড়াতে শুরু করলে সেটা হ্রাস কিংবা থামানোর কোন উপায়-উপকরণ পাওয়া যাবে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *