পাথেয় টেয়েন্টিফোর ডটকম : পেট্রোলিয়ামের পর এবার ইরান থেকে ধাতু আমদানির উপরেও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন৷ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমাজের পরমাণু চুক্তি বাতিল করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন৷ এর আগে ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি বাতিল করলেও বাকি স্বাক্ষরকারী দেশগুলি চুক্তিটিকে চালু রাখার অঙ্গীকার করে। পরবর্তিতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য গোটা বিশ্বের উপর চাপ সৃষ্টি করেন মার্কিন প্রশাসন।
ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পরে ইরানের উপরে নতুন করে নানা নিষেধাজ্ঞা জারি করে ট্রাম্প প্রশাসন। যার ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেনি তেহরান। আপাতত নিষেধাজ্ঞা তুলতে মরিয়া ইরান সরকার। এর মধ্যে দু’দিন আগে পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের গোষ্ঠী এবং বোমারু বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় আমেরিকা। সেই সঙ্গে আমেরিকার বন্ধু দেশ ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিইয়াহুও স্পষ্ট জানিয়েছেন, তেহরানকে কোনও মতেই পরমাণু অস্ত্র বানাতে দেওয়া যাবে না। আমেরিকাও স্পষ্ট বলেছেন তেহরান যদি কোনও ভাবে আমেরিকা বা তার শত্রু দেশগুলিকে আক্রমণ করার কথা ভেবে থাকে, তা হলে তার জবাব দিতে প্রস্তুত ওয়াশিংটন। এর মধ্যে আকস্মিক মার্কিন বিদেশ সচিব মাইক পম্পেয়ো ইরাক সফরেও যান এবং ইরাকের সঙ্গে আলোচনা করে উপসাগরীয় অঞ্চল মার্কিন রণতরী আর যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা শুরু করেছ।
ওয়াশিংটন থেকে প্রবল চাপের মুখে ইরান পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক সমাজের সহায়তা চাইছে৷ বাকি দেশগুলি ইরানকে ট্রাম্প প্রশাসনের রোষ থেকে রক্ষা না করলে ইরানকে বাধ্য হয়ে অন্য পথে হাঁটতে হবে – এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান৷ ইরান সরকার জানিয়ে দিয়েছে, ওই চুক্তি মোতাবেক বেশ কিছু ‘সীমা’ এখন থেকে তারা আর মানবে না। ইরান চুক্তিতে থাকা বাকি পাঁচটি দেশকে দু’মাস সময় দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রৌহানি। ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না উঠলে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ফের ভাবনা-চিন্তা করবে তাঁর দেশ। মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক চলাকালীনই রৌহানি স্পষ্ট জনান, বেঁচে যাওয়া সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ভারী জল এখন থেকে আর বিদেশে রফতানি করবে না তাঁর দেশ। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এক টেলিভিশন ভাষণে এসব বলেন যা সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে ইরানের টিভিতে।
রুহানি আরো বলেন, আজই পরমাণু চুক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে না৷ তবে তিনি জানিয়েছেন, ৬০ দিনের মধ্যে ইরান নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া আবার শুরু করবে৷ সাধারণত পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এমন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়৷ এই পদক্ষেপও চুক্তির আওতায় পড়ে৷
ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংঘাত শুধু নিষেধাজ্ঞা ও মতবিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না৷ গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা আরও বাড়ানোর ঘোষণা করেছে৷ ইরান পারস্য উপসাগরে হোরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবার হুমকি দিয়েছে৷ উল্লেখ্য, গোটা বিশ্বে সমুদ্রপথে পেট্রোলিয়াম রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে৷ সেই এলাকা ইরানের বৈধ জলসীমার মধ্যে পড়ে৷
এমন প্রেক্ষাপটে ইউরোপ উভয় সংকটে পড়েছে৷ ইরান এ পর্যন্ত পরমাণু চুক্তি লঙ্ঘন না করায় জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন চুক্তির শর্ত মেনে চলার পক্ষে সওয়াল করে এসেছে৷ কিন্তু ওয়াশিংটনের চাপে ইউরোপের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ছে৷ তবে তথাকথিত ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকেল’ কাজে লাগিয়ে ইউরোপ ইরানের সঙ্গে ডলারে লেনদেন ছাড়াই বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে৷ ফ্রান্স ও জার্মানি পরমাণু চুক্তি চালু রাখার অঙ্গীকার করেছে৷ তবে ইরানকে পরমাণু চুক্তি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে দুই দেশ৷ রাশিয়া ও চীনও পরমাণু চুক্তি কার্যকর করার পক্ষে বলছে৷ এই দুই দেশ ইউরোপের উদ্দেশ্যে নিষেধাজ্ঞা থেকে ইরানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য চাপ দিচ্ছে৷
এরই মধ্যে ইরানের বিদেশমন্ত্রী সরকারি সফরে রাশিয়া আছেন। আজ রৌহানির বার্তার পরেই মুখ খুলেছে মস্কো। রুশ বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এক সাংবাদিক বৈঠকে বলেছেন, ‘‘আমাদের মনে হয় এখন সমাধানের সময়। আর তার জন্য ইউরোপের বাকি দেশগুলির উচিত চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলা।’’


