এই সময় । তারেক হাবিব
নানামুখী উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশ
স্কুল থেকে একটু দূরে যাদের বাসা, তাদের বেশিরভাগ মাকেই সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়ার মাঝের সময়টাতে বাইরে বসে গল্প-আড্ডায় সময় কাটাতে দেখা যায়। আফরোজ জামান মিলির এভাবে সময় নষ্ট করা ভাল লাগতো না। কিছু একটা করার তাগিদ তাকে তাড়া করে বেড়াতো। শীতের সময় সাধারণত কাঁথা, কম্বল, লেপসহ গরম কাপড়ের কদর বাড়ে। একদিন স্কুলের পাশেই একটি দোকানে গিয়ে কাঁথা বিক্রি করতে দেখে তার মনে হলো, এমন কাঁথা সহজেই তৈরি করা যায়। ঢাকায় এগুলোর দামও বেশ। তিনি দোকানদারকে কাঁথা সরবরাহের প্রস্তাব দিলেন। দোকানদার রাজি হলেন। শুরু হয় মিলির উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন-বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজধানীর মোহম্মদপুরে ২০১০ সালে মাত্র তিন হাজার টাকার পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন আফরোজা।
১১ বছরের ব্যবধানে প্রায় ২০ লাখ টাকা মূলধন গড়েছেন তিনি। ‘হস্ত শৈলী বুটিকস’ এর মালিক ৩৫ বছর বয়সী এই নারী। তবে আজকের এই অবস্থান তৈরি করতে অনেক কঠিন ছিল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তার। বাংলাদেশে তার মতো এমন অনেক নারীই সামান্য পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করে করে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন। ক্ষুদ্র পুঁজি দিয়ে নিজের উপার্জন শুরু করে এখন শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছেন বেকার নারীদের।
রংপুরের ছাদেকুন নাহার চারশো টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে এখন তার প্রতিষ্ঠানে ৩০ থেকে ৩৫ জন নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। উদ্যোক্তা হতে প্রধান বাধা ছিলেন তার স্বামী। কিন্তু তাকে দমাতে পারে নি। ২০০৪ সালে কুরুশকাটার কাজের মাধ্যমে বুটিকসের ব্যবসা শুরু করেন বর্ণালী বুটিকসের স্বত্তাধিকারী ৪০ বছর বয়সী এই নারী। ডিগ্রি পাশ করে প্রথমে বাসায় বাসায় টিউশনি করতেন, পাশাপাশি হাতের কাজ করতেন। তার সেলাইয়ের কাজ দেখে শিক্ষার্থীদের মায়েরা প্রশংসা করেন এবং সেগুলো বানিয়ে দিতে বলেন। এভাবেই যাত্রা শুরু এই উদ্যোক্তার।
ছাদেকুন নাহার জানান, প্রথমে সারা রাত জেগে নিজেই কাজ করতেন, যাতে সময় মতো অর্ডার ডেলিভারি দেয়া যায়। কিন্তু যখন বেশি অর্ডার আসা শুরু হলো, তখন আশপাশের নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে অন্তর্ভূক্ত করেন। ২০১৭ সালে বিসিক নারী উদ্যোক্তা মেলায় রংপুর বিভাগ থেকে প্রথম হন তিনি। ব্যবসা বাড়াতে ব্যাংক থেকে ২ লাখ টাকা এসএমই ঋণ নেন। তার তৈরি হস্তপণ্য, বুটিক পণ্য রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- শিশুদের কুরুশকাটার ফ্রক, কুশন কাভার, সোফার কাভার, বেতের ব্যাগ, পুতির শোপিস, ক্লিপ, বিছানার চাদর, হাতের কাজের শাড়ি, পাটের দড়ি দিয়ে পাপোশ, চটের ব্যাগ ইত্যাদি।
গত বছরের শুরুতে বিশ্ব ব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও আঘাত হানে। সব শ্রেণির মানুষ কম বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, উদ্যোক্তা এবং শিক্ষার সাথে জড়িতদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি। সরকার করোনাভাইরাসজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্থ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রথম প্যাকেজের আওতায় ২০২০ সালের এপ্রিলে ১ লাখ ২১ হাজার ৩ শত ৫৩ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ২ হাজার ৭শত কোটি টাকার আরও দু’টি নতুন প্রণোদনা ঘোষণার ফলে মোট প্রণোদনা প্যাকেজের সংখ্যা ২৩টি, যার মোট আর্থিক পরিমাণ ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশের সমান। এরমধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বিশেষ করে নারীদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ আন্তর্ভূক্ত রয়েছে। এছাড়া এ বছরের ১৮ জানুয়ারি ২ হাজার ৭শ কোটি টাকার দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার, এরমধ্যে ১ হাজার ৫শ কোটি টাকা ক্ষদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য। আর ১ হাজার ২শ কোটি টাকা ব্যয় হবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ১৫০টি উপজেলায় দরিদ্র বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের ভাতা বাবদ।
নতুন প্যাকেজ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এ প্রণোদনার মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী অত্যন্ত উপকৃত হবে। পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতিতেও আরও গতি সঞ্চার হবে। করোনা প্রভাব মোকাবিলায় এসএমই খাতে গতি সঞ্চার, গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং অতিদরিদ্র, বয়স্ক ও বিধবাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করাই এ প্রণোদনাে লক্ষ্য।
গ্রামীণ সমাজের উন্নয়ন তথা সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মমুখী করতে ‘তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ সাধন’ বিষয়ক নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। এই প্রকল্পে বেকার ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের ৬৪ জেলার ৭৮টি উপজেলায় বিউটি পার্লার, ফুডকোর্ট ও বিক্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবারিয়ত হবে। এ জন্য সরকারের ব্যয় হবে ৪২৮ কোটি টাকা।
এখনো গ্রামীণ সমাজের যেসব নারী পিছিয়ে আছে, তাদের অগ্রগামী ও কর্মমুখী করতে সরকারের এই প্রকল্প গ্রহণ। এখানে নারীদের বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। চার মাস প্রশিক্ষণ শেষে তাদের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে। সেই অর্থ দিয়ে তারা যেকোনো ব্যবসা করতে পারবে। জাতীয় মহিলা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিপণনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ প্রকল্পের উদ্যোগে দেশে ৮০টি বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া প্রতি উপজেলায় ৮০টি ফুডকোর্ট ও ৮০টি বিউটি পার্লার স্থাপন করে এক হাজার ৬০০ জন নারী উদ্যোক্তাকে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিপণনে সহায়তার লক্ষ্যে একটি ক্রয়-বিক্রয় সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। সব প্রশিক্ষণার্থীকে নিয়ে একটি ডাটাবেইস সফটওয়্যার তৈরি করা করা হবে। প্রকল্পটি ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারের উন্নয়নমূলক এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নারী সমাজকে মানবসম্পদে পরিণত করে তুলতে সহায়ক হবে। একজন উদ্যোক্তা নিজের জীবিকার পাশাপাশি কয়েক জনের জীবন জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজন অর্থের। এ অর্থের জোগান দিচ্ছে এখন সরকারি ব্যাংকগুলো। ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের বিকাশ, গ্রামীণ পর্যায়ে শিল্প বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি, উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে এবং সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হচ্ছে। এসব ঋণের সুবিধা কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ নারীরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন এবং উদোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, নারীরা দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। তারা সমান যোগ্যতা নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছেন। তৃণমূল পর্যায়ে আড়াই লাখ নারীকে ক্যাটারিং, হাউজকিপিং, বেবি কেয়ার ও বিউটিফিকেশনসহ ৭টি ট্রেডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করা হবে। পাশাপাশি ৩৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী ঢাকায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সম্মেলন কক্ষে ভার্চুয়াল মাধ্যমে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে দুই বিভাগের ১০ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতাকে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অনর্জনকারী, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী, সফল জননী, নির্যাতনের বিভীষিকা মুঝে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা এবং সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা ক্যাটাগরিতে সম্মাননা ক্রেস্ট, সনদ ও পুরস্কারের নগদ অর্থ প্রদান করেন। এবার শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার অর্জন করেছে বগুড়ার নারী মিফতাহুল জান্নাত।
বর্তমান সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই করোনা মহামারি মোকাবিলায় সফল হয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও রয়েছে সঠিক পথে। ব্যবসা-বানিজ্য আরব ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। পোশাক খাতে রপ্তারি বাড়ছে। করোনাকালেও রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স দেশে এসেছে। বিশ্বের বহু উন্নত দেশের অর্থনীতি যেখানে ২ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছে, সেই তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অত্যন্ত ভালো অবস্থায় রয়েছে।
করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ও মাজারি উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের আর্থিক প্রণোদনা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বৈশ্বিক এ মহামারির প্রেক্ষাপটে সরকারের আর্থিক প্রণোদনা ব্যবসা-বানিজ্যে আবার গতি সঞ্চার করেছে। পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে অবহেলিত, দুস্থ এবং দরিদ্র নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় মুজিব বর্ষে দরিদ্রদের ঘর দেয়া হচ্ছে। সরকারের এ সকল উদ্যোগগুলোর ফলে করোনার ক্ষতি কটিয়ে স্বমহিমায় ফিরতে শুরু করেছে বাংলাদেশে। আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
লেখক : কলামিস্ট


