নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না মজুদ পর্যাপ্ত : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না মজুদ পর্যাপ্ত : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ● আসন্ন রমজানে চাহিদার তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বেশি মজুদ থাকায় দাম স্বাভাবিক থাকবে- এমন দাবি করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। রমজান উপলক্ষে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, পেঁয়াজ, ছোলা, রসুনসহ নিত্যপণ্য চাহিদামাফিক পর্যাপ্ত মজুদ আছে। কোনো পণ্যের সংকট বা সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না। রোজায় চাহিদা অনুযায়ী ভোগ্যপণ্যের জোগান দেয়া সম্ভব তাই মূল্য পরিস্থিতিও স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, রমজান সামনে রেখে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর ও পেঁয়াজের। এই ছয় পণ্যের যাতে কোনো সংকট না হয় সেজন্য ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিন্ডিকেট করে যাতে কোনো পণ্যের দাম বাড়ানো না হয় সে লক্ষ্যে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করাসহ টিসিবিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শুভাশীষ বসু বলেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে চিনি, মসুর ডাল, সয়াবিন তেল, ছোলা ও খেজুর বিক্রি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, রমজান উপলক্ষে অন্যান্যবারের মতো এবারও আমাদের মজুদ পরিস্থিতি খুব ভালো। রমজানে যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে সেগুলোর মজুদ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া টিসিবিতে প্রয়োজনমতো পণ্য মজুদ রাখা হচ্ছে। কোনো রকম সংকটের সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও বলেন, এবার কোনো ধরনের কারসাজির সুযোগ নেই। কারণ যেসব পণ্য বিদেশ থেকে আনতে হয় সেসব পণ্য এবার বেশি বেশি আমদানি করে মজুদ করা হয়েছে।

সম্প্রতি সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, রমজানে কোনো পণ্যের সংকট তৈরি হবে না। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এছাড়া ওই সময় কেউ যদি পণ্যের দাম বাড়ানোর কারসাজি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদিও বাণিজ্যমন্ত্রীর এ ঘোষণার পরও ইতোমধ্যে ছোলা, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে গেছে। ভোক্তারা দাম বাড়া নিয়ে কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে রয়েছেন।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বিপণন ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ভোক্তাদের জন্য সুখবর দিয়ে বলা হয়, রমজানের চাহিদা পুঁজি করে কেউ যাতে অস্বাভাবিকভাবে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে সে লক্ষ্যে বাজারের দিকে গোয়েন্দা সংস্থার তীক্ষ্ম নজরদারি থাকবে। ওই প্রতিবেদনে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ও জোগান বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোজ্যতেল : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত সয়াবিন ও পামঅয়েল আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়। প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ১০ হাজার টন সয়াবিন ও পামঅয়েলের দেশীয় চাহিদা ছাড়াও রমজান ও ঈদুল আজহায় বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি হয়। গত বছরের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সবধরনের ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল ও নিম্নমুখী থাকায় দেশীয় বাজারে দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৯ লাখ ১৯ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ১৭ লাখ এক হাজার টন ভোজ্যতেল দেশে আনা হয়েছে। ফলে মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছোলা : অভ্যন্তরীণ মার্কেটে আস্ত ছোলার চাহিদা ৬০ হাজার টন। এর মধ্যে সাত হাজার টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকিটা আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডালসহ ছোলা তিন লাখ ৫৫ হাজার টন দেশে আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দুই লাখ ৪৫ হাজার টন ডালসহ ছোলা আমদানি হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এক লাখ চার হাজার টন আস্ত ছোলার এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। স্থানীয় বাজারে ছোলার মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পেঁয়াজ : দেশে প্রায় ২২ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ২০ হাজার এবং রমজান ও ঈদুল আজহায় বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ চার হাজার টন পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন হয়। বাকি সিংহভাগ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। তাই ভারতে পেঁয়াজ উৎপাদন ও আমদানি মূল্যের ওপর বাংলাদেশের পেঁয়াজের মূল্য অনেকাংশে নির্ভর করে। গত বছর অতিবৃষ্টির কারণে ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলে দেশেও এর প্রভাব পড়ে, যা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত চার লাখ ৯৮ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা যথেষ্ট স্বাভাবিক ও দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।

মসুর ডাল : দেশে মসুর ডালের চাহিদা তিন লাখ ৭৫ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছর দেশীয় উৎপাদন প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার টন। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর এক লাখ ৯২ হাজার টন মসুর ডাল দেশে এসেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত এক লাখ ৩৬ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছে। আমদানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। একই সঙ্গে বাজার পরিস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রদিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিনি : বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন পরিশোধিত চিনির চাহিদা রয়েছে। তিন বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির মূল্য নিম্নমুখী হওয়ায় দেশীয় বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। বর্তমানে চিনির বাজার স্থিতিশীল এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর ১৭ লাখ ৯৪ হাজার টন চিনি আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ১২ লাখ ২১ হাজার টন চিনি এসেছে। আমদানি করা চিনির ওপর ট্যারিফ মূল্য ৩৫০ মার্কিন ডলার এবং প্রতি টনে আরোপিত দুই হাজার টাকা স্পেসিফিক শুল্কের সঙ্গে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক কর আরোপ করায় চিনির মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৫২-৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে চিনির বাজার ও মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

খেজুর : দেশে প্রায় ১৫ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার টন। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৩শ’ টন খেজুর আমদানি হয়েছে। খেজুরের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। তাই রমজানেও খেজুরের দাম বাড়বে না বলে দাবি করা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *