নিজস্ব প্রতিবেদক ● দেশে প্রচলিত মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মূলত জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বর্তমানে যে কেউ শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি মুঠোফোনের নম্বর দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক হতে পারেন। এখন থেকে ব্যাংকে সাধারণ হিসাব খুলতে যেসব ডকুমেন্ট দিতে হয়, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক হতেও একই ধরনের ডকুমেন্ট জমা দিতে হবে। ব্যাংকে গ্রাহকের তথ্য যেভাবে সংরক্ষণ করা হয় এক্ষেত্রেও তা করতে হবে। এখন ফুটপাত বা যে কোনো জায়গায় বসে একজন এজেন্ট কার্যক্রম চালাতে পারেন। কিন্তু নতুন নিয়মে তাদের নির্ধারিত ঠিকানায় অফিস থাকতে হবে।
পাশাপাশি সব ধরনের লেনদেনও নির্ধারিত রেজিস্টারে লিখতে হবে। সম্প্রতি সচিবালয়ে জঙ্গিবাদের অর্থের উৎস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা এবং এ কার্যক্রম অধিকতর সমন্বয়ের লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্সের সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। আর সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ওই নির্দেশনা কার্যকর করা হবে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক জঙ্গি অর্থায়ন ঠেকাতে ব্যাংকে নগদ লেনদেন সীমিত করার জন্য একটি নীতিমালা করছে। টাক্সফোর্স এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী মোট ১৭টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ৩৭ লাখ। সারাদেশের প্রায় ৭৬ লাখ এজেন্টের মাধ্যমে ওসব হিসাব থেকে গত জুন মাসে মোট ৩০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। দৈনিক গড়ে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা। সাধারণত চাকরিজীবী, গার্মেন্ট শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিয়ে থাকে। এ মাধ্যমে বড় লেনদেন করার সুযোগ নেই।
বর্তমানে দিনে দু’বারে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা জমা এবং ১০ হাজার টাকা তোলা যায়। এর আগে দৈনিক ২৫ হাজার টাকা জমা ও তোলা যেত। সাধারণত বাড়িতে বা আত্মীয়স্বজনের কাছে বিকাশ বা রকেটসহ অন্যান্য এজেন্টের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হলে এই সেবা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র জানায়, নতুন কড়াকড়িতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তাতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সংকুচিত হয়ে যাবে। পাশাপাশি খরচও বাড়বে। সাধারণ গ্রাহক হাতের কাছে আর ওই সুবিধা পাবে না। তবে অভিযোগ রয়েছে জঙ্গিদের অস্ত্র-গোলাবারুদ কেনা ও প্রশিক্ষণে টাকার লেনদেনের বেশির ভাগই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। ওই ব্যবস্থায় অর্থ লেনদেন সহজ ও ধরা পড়ার ভয় কম থাকায় জঙ্গিরা তা বেছে নিয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিবিড় পর্যবেক্ষণে এলে ওই ধরনের সুযোগ বন্ধ হবে। সূত্র আরো জানায়, জঙ্গিবাদে অর্থায়নকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে টাস্কফোর্স কমিটির সভায়।
পাশাপাশি সন্দেহজনক কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস ও সন্দেহজনক টেলিযোগাযোগে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। টাস্কফোর্সের সভায় ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ও ঋণগ্রহীতাদের নিয়েও আলোচনা হয়। সভায় অনেকে অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকের কতিপয় ঋণগ্রহীতা ও কর্মকর্তা নানাভাবে জঙ্গি অর্থায়নে জড়িত। তাদের চিহ্নিত করা ছাড়াও সব ব্যাংকে অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও অস্বাভাবিক লেনদেনে আরও কঠোর নজরদারি করতে বলা হয়। এদিকে এ প্রসঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র টেলিকম ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসটিএ) সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন মোহন জানান, তারাও একটা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আসতে চান। তবে তাদের রেজিস্ট্রেশন, গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ বা অফিস নেয়ার ক্ষেত্রে যাতে হয়রানি বা ভোগান্তির শিকার না হন কর্তৃপক্ষকে সেদিকে নজর দিতে হবে। অন্যদিকে জঙ্গিবাদে অর্থের লেনদেন ঠেকাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কড়াকড়ির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, টাস্কফোর্সের নেয়া সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা এলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। এখনো টাস্কফোর্সের নতুন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।


