নেয়ামত ও রহমত | সাখাওয়াত রাহাত

নেয়ামত ও রহমত | সাখাওয়াত রাহাত

নেয়ামত ও রহমত | সাখাওয়াত রাহাত 

(বাস্তবতার নিরিখে)

এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র ছেলের সঙ্গে বছর পাঁচেক আগে নুজহাতের বিয়ে হয়েছে। এরইমধ্যে তাদের পরিবারে ফাতিমা ও সাফিয়া নামে দু’জন কন্যা সন্তান জন্ম নিয়েছে। পরপর দুই মেয়ে জন্মগ্ৰহণ করায় শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মন খারাপ। তাই পুরো পরিবার শহরের নামকরা ডাক্তারের কাছে এসেছে। এবার তাদের ছেলে-ই চাই!

নুজহাতের স্বামী বললেন: ডাক্তার সাহেব! এমন কোনো ওষুধ দিন যেন এবার ছেলে-ই জন্মগ্ৰহণ করে! আগে থেকেই আমাদের দুটি মেয়ে আছে। তাই আমরা চাই- এবার যেন ছেলে-ই হয়!

এমন অদ্ভুত আবদার শুনে ডাক্তার বললেন: চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন কোনো ওষুধ নেই যা খেলে ছেলে হবে! ডাক্তারের কথায় হতাশ হয়ে শাশুড়ি বললেন: তাহলে অন্য বড় কোনো ডাক্তারের সন্ধান দিন; যার কাছে এই ওষুধ পাওয়া যাবে!
ডাক্তার বললেন: আপনি হয়তো আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেননি। আমি কিন্তু এটা বলিনি- আমার কাছে ওষুধ নেই! বরং আমি বলেছি- চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন কোনো ওষুধ নেই!

কৌতুহল নিয়ে শ্বশুর বললেন: কিন্তু ওমুক মহিলা ডাক্তার তো..! ডাক্তার বললেন: সে ভুয়া ডাক্তার! এই ধরনের অযৌক্তিক দাবি কেবল ভুয়া ডাক্তার পীর হাকিম ফকির প্রমুখ করে থাকেন। মূলত এরা সবাই ধোঁকাবাজ! মারাত্মক লেভেলের প্রতারক! এ কথা শুনে স্বামী বললেন: তারমানে আমাদের বংশধারা আর সামনে বাড়বে না?

ডাক্তার বললেন: বংশধারা সামনে বাড়ার মানে কী? আপনার জিন পরবর্তী প্রজন্মের শরীরে ট্রান্সফার হওয়া-ই তো বংশধারা সামনে বাড়া, তাইনা? এটাতো আপনার মেয়েদের মাধ্যমেও হয়ে যাবে। ছেলেই কেন দরকার?
আর আপনি তো একজন সাধারণ মানুষ। আপনার বংশের এমন বিশেষ কী গুণ আছে যা ছেলেদের মাধ্যমেই সামনে বাড়তে হবে?

ডাক্তারের প্রশ্ন শুনে চুল কচলাতে কচলাতে শ্বশুর বললেন: দুঃখিত! আমি বুঝতে পারছি না- আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?
ডাক্তার বললেন: হলস্টেন জাতের গাভীর একটি বিশেষত্ব আছে। এরা অন্য গাভীর চেয়ে অনেক বেশি দুধ দেয়। তাই দূর্ঘটনাবশত যদি এ জাতের মাত্র একটি গাভী বেঁচে থাকে তাহলে এই ভেবে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, দুশ্চিন্তা করা উচিত- যদি হলস্টেন জাতের গাভীর বংশধারা টিকে না থাকে তাহলে কী হবে? সোজা কথায় এর উত্তর হলো- অধিক দুধ প্রদানকারী গাভী বিলুপ্ত হয়ে যাবে!

ময়না বা তোতা পাখির একটি বিশেষ প্রজাতি আছে যেগুলো কথা বলতে পারে! যদি কোনোদিন এই প্রজাতির শুধু একটি পাখি বেঁচে থাকে তাহলে পেরেশান হওয়া উচিত। কেননা যদি এটাও মরে যায় তাহলে কথাবলা ময়না ও তোতা পাখি চিরতরে হারিয়ে যাবে!

আপনারাও অন্য দশজনের মতোই সাধারণ মানুষ। আপনাদের মধ্যে এমন বিশেষ কী গুণ আছে যা পৃথিবীতে টিকে থাকা দরকার?

শ্বশুর বললেন: ডাক্তার সাহেব! এমন কোনো গুণ আমাদের নেই। কিন্তু মরার পর পৃথিবীতে নাম নেওয়ার মতোও তো কেউ থাকা চাই!

ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন: আচ্ছা, আপনার পরদাদার নাম কী? আপনার কি মনে আছে তাঁর নাম? প্রশ্ন শুনে শ্বশুর এদিক সেদিক তাকাতে লাগলেন। কাচুমাচু করে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না।

ডাক্তার আবার বললেন: বুঝতে পেরেছি- আপনি তাঁর নাম জানেন না! আপনার পরদাদাও সম্ভবত এই বিশ্বাস রেখে মারা গেছেন যে, মৃত্যুর পরও আমাকে স্মরণ করার মতো কেউ পৃথিবীতে আছে! অথচ আজ তাঁর বংশধররা তাঁর নামটি পর্যন্ত ভুলে গেছে!

বস্তুত আপনার মৃত্যুর পর কেউ আপনাকে স্মরণ করুক বা না করুক তাতে আপনার লাভক্ষতি কিছুই হবে না। আপনার নাম জপলে কি কবরে থাকা আপনার হাড্ডিগুলোতে শীতলতা অনুভূত হবে? এতে আপনার কী এমন উপকার হবে?

দেখুন, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মাওলানা ভাসানী চলে গেছেন বহুবছর আগে; অথচ এখনো মানুষের মুখে মুখে তাদের নাম! হাজী মোহাম্মদ মহসিন মারা গেছেন এক শতাব্দী আগে; কিন্তু দানশীলতার কারণে জনহিতৈষী এ দানবীর মরেও মানুষের মাঝে অমর হয়ে আছেন!

১৯০৫ সালে ইব্রাহিম মোহাম্মদ ডুপ্লে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম’ নামের ইসলামী জনকল্যাণ সংস্থা। তখন এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামিক রীতি অনুসরণপূর্বক বেওয়ারিশ মুসলমানদের লাশ দাফনের ব্যবস্থা করা। বর্তমানে এর পাশাপাশি সংস্থাটি ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস প্রদান (জাতি ধর্ম নির্বিশেষে),

মুসলিম এতিমখানা পরিচালনা, স্কুল ও কলেজ পরিচালনা, ঈদে দুঃস্থ মুসলিম পুরুষ ও মহিলাদের মাঝে নতুন কাপড় বিতরণ, দুঃস্থ ও অক্ষম মুসলিম পরিবারদের সাহায্য প্রদান, বিভিন্ন দুর্যোগের সময় দুর্গত এলাকায় ত্রাণকার্য পরিচালনাসহ নানামুখী খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছে। তাই তাঁর নাম পৃথিবীতে এখনো টিকে আছে এবং থাকবে।

হাজী সাহেব! এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ আছে। নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ অবিনশ্বর হয় কর্মগুণে। মানব কল্যাণে ব্যয়িত জীবন মানুষের মনে বেঁচে থাকে অনন্তকাল। বস্তুত মানব জীবনের সার্থকতা এখানেই নিহিত। মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মের মাধ্যমে; বংশধরদের মাধ্যমে নয়। কত কোটি কোটি মানুষ এ পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু মৃত্যুর পর কেউ তাদের মনে রাখেনি। তারা ভেসে গেছে কালস্রোতে। কিন্তু কীর্তিমান ব্যক্তিবর্গ যারা মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে মৃত্যুবরণ করেন, তারা অমর।

আপনিও এমন কিছু করে যান যেন মানুষ আপনাকে মনে রাখে। সর্বদা শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনাকে স্মরণ করে। নিঃসন্দেহে আপনার বংশধররা একদিন আপনাকে ভুলে যাবে। কিন্তু মানুষের জন্য যদি কিছু করে যান তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনাকে মনে রাখবে। আপনার জন্য দোয়া করবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে গ্ৰহণযোগ্য ও প্রিয় ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনীর ওপর একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে পুত্র সন্তান দান করে আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন! তবে চারজন কন্যা সন্তান দান করে তাদের মাধ্যমে তাঁর পবিত্র বংশধারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন!

কন্যা সন্তান মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পরিবারের জন্য একটি বিশেষ রহমত। কন্যা সন্তানকে অশুভ মনে করা কাফিরদের বদস্বভাব। কন্যা সন্তানকে অপসন্দ করা খাটি মুমিনের পরিচায়ক নয়। কন্যা সন্তান অশুভ নয়, অকল্যানকর নয়; বরং কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়া খোশ কিসমতী ও সৌভাগ্যের নিদর্শন!

ছেলেরা আল্লাহর নেয়ামত। আর সব নেয়ামতেরই কিন্তু হিসাব নেওয়া হবে। অন্যদিকে মেয়েরা আল্লাহর রহমত! আর রহমতের কোনো হিসাব হয় না!

প্রিয় পাঠক! সন্তান দেওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা। তিনি কাউকে শুধু কন্যা সন্তানই দান করেন। আবার কাউকে পুত্র সন্তান। কাউকে আবার পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন। কাউকে আবার কোনো সন্তানই দান করেন না। এ বণ্টনও তাঁর বিশেষ হিকমত ও কল্যাণ-জ্ঞানের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। যার জন্য তিনি যা উপযোগী মনে করেন তাকে তা দান করেন।

এদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব আল্লাহ তায়ালারই। তিনি যা ইচ্ছা, সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাশীল।'[১]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কন্যাদের সঙ্গে অত্যন্ত মহব্বত ও স্নেহের আচরণ করতেন। তিনি যখন কোনো সফরে যেতেন, সবশেষে ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে দেখা করে যেতেন। আবার যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, সর্বপ্রথম ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে দেখা করতেন।

কন্যা সন্তান লালনপালন সংক্রান্ত যে পরিমাণ ফজিলতের কথা তিনি বলেছেন, পুত্র সন্তান লালনপালনের ক্ষেত্রে সে পরিমাণ বলেননি। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, ‘যে ব্যক্তি দু’টি কন্যাকে তারা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এ দু’টি আঙ্গুলের মতো পাশাপাশি আসবো (অতঃপর তিনি তাঁর আঙ্গুলগুলো মিলিত করে দেখালেন)’।[২]

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ওই নারী বরকতময়ী ও সৌভাগ্যবান, যার প্রথম সন্তান মেয়ে হয়। কেননা, (সন্তানদানের নেয়ামত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে) আল্লাহ তায়ালা মেয়েকে আগে উল্লেখ করে বলেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।'[৩]

কন্যা সন্তান প্রতিপালনে শুধু পিতাকেই নয়; ভাইকেও উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বোনের কথাও বলা হয়েছে হাদিসে।
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কারও যদি তিনটি মেয়ে কিংবা বোন থাকে অথবা দু’টি মেয়ে বা বোন থাকে, আর সে তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের সঙ্গে সদাচার করে, তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।'[৪]

কন্যা সন্তান প্রতিপালনে যেন বৈষম্য না করা হয় এবং বস্তুবাদী ব্যক্তিরা যেন হীনম্মন্যতায় না ভোগে, তাই তাদেরকে কন্যা সন্তান প্রতিপালনে ধৈর্য ধরার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। শোনানো হয়েছে পরকালে বিশাল প্রাপ্তির সংবাদ। আউফ বিন মালেক আশজায়ি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির তিনটি মেয়ে রয়েছে, যাদের ওপর সে অর্থ খরচ করে বিয়ে দেওয়া অথবা মৃত্যু পর্যন্ত, তবে তারা তার জন্য আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে। তখন এক নারী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আর দুই মেয়ে হলে? তিনি বললেন, দুই মেয়ে হলেও।'[৫]

তাই যেভাবে ছেলেদের লালনপালন করা হয় ঠিক সেভাবেই পূর্ণ খুশি ও সন্তুষ্টির সঙ্গে মেয়েদেরও লালনপালন করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।
_____________________________________
[১] আল কুরআন; ৪২:৪৯-৫০

[২] মুসলিম শরিফ; হাদিস নং ২৬৩১, তিরমিজি শরিফ; হাদিস নং ১৯১৪, মুসনাদে আহমদ; হাদিস নং ১২০৮৯, ইবনু আবি শাইবা; হাদিস নং ২৫৯৪৮

[৩] কানজুল উম্মাল ১৬:৬১১

[৪] মুসনাদে আহমদ; হাদিস নং ১১৪০৪, আদাবুল মুফরাদ লিল-বুখারি: ৭৯

[৫] বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান; হাদিস নং ৮৩১৩

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *