নৌপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ

নৌপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক ● সরকার মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের নৌপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে এদেশের বেশিরভাগ নৌপথ। ফলে বদলে যাচ্ছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের চালচিত্রও। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অভ্যন্তরে বহমান নদ-নদী ও খালসমূহ সুরক্ষায় কোনো পরিকল্পনা না থাকায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। খনন না করায় দেশের অনেক বড় বড় নদী এখন মুমূর্ষু। বড় নদীগুলোর থেকে ছোট নদী মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া, প্রতিকূল পরিবেশ, ভারত থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণেও এদেশের নদীগুলো প্রচ- হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ১৩টি নদী। আরো ৭টি নদী মৃতপ্রায়। যে কোনোদিন সেগুলোতে পানি থাকবে না। ইতোমধ্যে এদেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থেকে হারিয়ে গেছে ২১ হাজার কিলোমিটার। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্র মতে, ব্যাপকভাবে দেশের নদ-নদীর অপমৃত্যুর কারণে জলাদ্ধতা, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে। কমছে আবাদি জমি। হুমকির মুখে নদীভিত্তিক অর্থনীতিও। বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়। বাস্তুহারা ও অভিবাসী হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবে আগামি ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে উপকূলীয় ১২টি জেলার প্রায় ২ কোটি মানুষ অভিবাসী হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার সারাদেশের নদ-নদী, ছোট-বড় খাল ও পুকুর খননে মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করছে। তার আওতায় পদ্মা ও মেঘনাসহ মোট ৪০৫টি নদী, ৬ হাজার ৫৩৬টি খাল এবং ১৮ হাজার ৪০৩টি পুকুর খনন করা হবে। মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি- তিনটি ধাপে মোট ২১টি প্রকল্পের মাধ্যমে ওই কাজ শেষ করা হবে। প্রকল্পের মধ্যে থাকছে নদ-নদী খনন, প্রধান প্রধান নদীর নাব্যতা ও নদী ভরাট, জলাবদ্ধতা এবং নদী খননে ড্রেজার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কেনা। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং অ্যান্ড রিভার স্ট্র্যাটেজি অব বাংলাদেশ’। সূত্র জানায়, দেশের মোট ৪০৫টি নদীর মধ্যে তিনটি মিয়ানমার ও ৫৪টি ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত বলে মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ভাটিতে হওয়ায় বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোতে প্রতি বছর ১ দশমিক ২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) ঘনমিটার পলি প্রবাহিত হয়। তার বড় অংশই নদীর তলদেশে জমে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করছে। মহাপরিকল্পনার আওতায় তিন প্রধান নদী যমুনা, পদ্মা ও মেঘনাসহ মোট ৪০৫টি নদী, ৬ হাজার ৫৩৬টি খাল এবং ১৮ হাজার ৪০৩টি পুকুর খনন করা হবে। নদীগুলোতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হবে। প্রধান তিন নদী খননে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৬২ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। বাকি নদী, খাল ও পুকুর খননে ধরা হয়েছে ৬ লাখ ১১ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত করেছে ড্রেজিংসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি। মূলত দেশের নদীগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনতে এবং পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার বাড়াতেই মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া তৈরি করা হয়। তার আগে কখনো নদীকেন্দ্রিক মাস্টারপ্ল্যান করা হয়নি। সূত্র আরো জানায়, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী প্রথম ধাপে ৫ বছর এবং দ্বিতীয় ধাপে ১০ বছর সবমিলিয়ে ১৫ বছরেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম পাঁচ বছরে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা এবং পরবর্তী ১০ বছরের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। আগামী ১৫ বছরে মহাপরিকল্পনা বান্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে ৩টি মন্ত্রণালয়কে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়-মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো দুই ধাপে খনন কাজ পরিচালনা করবে। তবে এখনো মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোন্ সংস্থা কী কাজ করবে, কোন্ নদী বা খাল খনন করবে তাও ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট করা হলেও সমীক্ষা ছাড়াই তা তৈরি করা হয়েছে। তবে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নৌপথের গভীরতা ও দৈর্ঘ্য বাড়ার পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আরো গতিশীল হবে তা নিশ্চিত। ফলে শিল্প-কারখানার পণ্য পরিবহণ খরচ কমে আসবে। কৃষিকাজের সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে মাছের উৎপাদন। সুপেয় পানির চাহিদা মিটবে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যমে হচ্ছে নৌপথ। এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পবর্জ্যরে দূষণ, অবৈধ দখল ও অতিরিক্ত পলি জমে ভরাট হয়ে অধিকাংশ নদ-নদী হুমকির মুখে। প্রতি বছর নদীগুলো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ১.২ বিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে যায়। অতিরিক্ত পলি জমে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার চার নদীসহ শহরের বুক দিয়ে বয়ে চলা অধিকাংশ নদ-নদীর শিল্পবর্জ্যর দূষণে প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। নদীর বুকে চলছে অবৈধ দখল। স্বাধীনতার পর বিআইডব্লিউটিআইয়ের পক্ষ থেকে যে জরিপ চালানো হয়েছিল তাতে বাংলাদেশে নৌপথের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। অথচ সাম্প্রিিতক বিভিন্ন জরিপে দেশের নৌ-পথের দৈর্ঘ্য দেখানো হচ্ছে মাত্র চার হাজার কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে এর পরিমাণ আরো নিচে নেমে আসছে। অন্যদিকে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান জানান, দেশে একসময় ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল। কিন্তুনদীর প্রতি অবহেলার কারণে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কিলোমিটারে। নৌপথের গতিবেগ ফিরিয়ে আনতে গত ৮ বছরে এক হাজার ১০০ কিলোমিটারের বেশি নদীপথ খনন করেছে সরকার। ইতোমধ্যে ২৪টি নদীপথে নাব্য ফেরানোর কাজ শুরু করা হয়েছে করেছি। তার মধ্যে ১২টিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে ১১৮টি নদীপথ খননের কাজ করা হবে। নদীবন্দরগুলোতেও কাজ করা হবে। নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর আশুগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৯০০ কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিং হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *