মাহমুদুল হক আনসারী : পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহারে পরিবেশের মারাত্মক হুমকিতে দেশ। দেশব্যাপী পলিথিন সামগ্রী যেমন প্লাস্টিক, বস্তা, পলিথিন, কভার, খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহৃত প্লাস্টিক, বোতল ও নানা প্রকারের প্লাস্টিক সামগ্রীতে গোঠা পরিবেশ হুমকির মুখে। এসব সামগ্রী জনগণ যত্রতত্র ফেলে দেয়া, নালা-নর্দমা হতে নদীতে গিয়ে পড়ছে।
হাজার হাজার মণ এসব প্লাস্টিক পলিথিন নদীর নব্যতা ধ্বংস করছে। নদী সাগরের প্রাণীর জীবনহানি করছে। তাদের জন্ম ও বেড়ে উঠা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাগরের মাটি ও পানিতে মিশে বিষাক্ত করছে সাগরের পরিবেশকে। মৎস্য শিল্পের বিরাট ক্ষতিসাধন করছে। জেলেদের জালে এসব উচ্ছিষ্ট পলিথিনের কারণে জেলে মাছ আসছে না। মাছের পরিবর্তে উচ্ছিষ্ট প্লাস্টিক সামগ্রী মিলছে। মাছের প্রজনন, বিচরণ, অবাধ চলাফেরা বড় ধরনের ক্ষতি করছে।
সম্প্রতি নদী ড্রেজিং করতে গেলে এসব সমস্যা উঠে আসে। কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের বড় প্রতিবন্ধক হচ্ছে এসব পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী। সারাদেশে নদীর ড্রেজিং করার সময় এসব পলিথিনের কারণে ড্রেজিংয়ের ব্যাঘাত ঘটছে। সময়মতো নির্দিষ্ট অর্থ জনবল ব্যবহার করে ড্রেজিং করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংবাদমাধ্যমে জানা যায়। ফলে সময়, অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে।
পলিথিনের আগ্রাসী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নালা নর্দমা, খাল বিল ও নদী শুধুমাত্র ড্রেজিং করেই নিস্তার পাওয়া সম্ভব হবে না। এসব পলিথিন সামগ্রী ফসলী জমি ও ক্ষেত খামারের মারাত্মক ক্ষতি করে চলছে। এতে করে দেশের ফসলী জমি খাদ্য উৎপাদনে অক্ষম হয়ে পড়ছে। দেশের মৎস্য শিল্পের লাখ লাখ মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছপালা, বাগানবাড়ি বেড়ে উঠা প্রতিবন্ধকতায় পড়ছে। প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার শহর, গ্রাম সম্মিলিতভাবে একই নিয়মে চলছে। দেশের ১৮ কোটি জনগণের নিত্য পণ্যের সাথে মিশে আছে প্লাস্টিক সামগ্রী। এর ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পলিথিনের ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণের আইন থাকলেও বাস্তবে তা কার্য্কর নয়।
প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে সামান্য কাজে পলিথিনের ব্যবহার চোখে পড়ে। আইনের কর্তা থেকে সমাজের সব শ্রেণী পেশার মানুষ পলিথিন নির্ভর হয়ে পড়েছে। যেহেতু এর ব্যবহার অপ্রতিরোধ্য, সেহেতু এসব প্লাস্টিক উচ্ছিষ্ট কীভাবে সংরক্ষণ ও ধ্বংস করা যায় তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। শুধুমাত্র আইন করে মারাত্মক ক্ষতিকারক প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে সমাজকে রক্ষা করা কতটুকু সফল করা যাবে তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। জনগণের সচেতনতা, এলাকা ভিত্তিক এসব সামগ্রী সংরক্ষণ ও ধ্বংস করার উদ্যোগ সঠিকভাবে গ্রহণ করলে হয়তো কিছুটা ফল আসতে পারে। এক্ষেত্রে জনগণকে নিজের পরিবেশ সুস্থ, সুন্দর পরিচ্ছন্ন রাখার উপর ধারণা থাকতে হবে। শহর নগরের সবগুলো দায়িত্বশীল প্রশাসনকে এ বিষয়ে কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে।
দেশের মধ্যে যেসকল এনজিও পরিবেশসহ নানা বিষয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছে তাদেরকেও কর্মসূচীভিত্তিক এগিয়ে আসতে হবে। মসজিদের ইমাম, খতিব, মকতবের শিক্ষক স্কুল কলেজে ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে হবে। গোটা সমাজ ও পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক সামগ্রীর বিরোদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমস্ত সামাজিক, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্টানে এ বিষয়ের গুরুত্ব ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে।
বিশেষজ্ঞগণ মনে করছে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে গোটা পরিবেশ ধ্বংসের মুখোমুখী হবে। প্রতিদিন হাজার হাজার টন এসব উচ্ছিষ্ট নির্দিষ্টভাবে সংরক্ষণ ও ধ্বংসের কর্মসূচী রাখতে হবে। এখন থেকেই তা সবখানেই সকলকেই বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। শুধুমাত্র পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করলে একমাত্র সমাধানের পথ নয়। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে। যদি তা হয় তাহলেই রক্ষা পাবে নদী, সাগর ও তার প্রাণীকূল। বাঁচবে সমাজ, বাঁচবে মানুষ, রক্ষা হবে এ জাতির। তাই সময় থাকতেই এ বিষয়ে সমাজের সব শ্রেণী পেশার সচেতন জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: মাহমুদুল হক আনসারী ।। গবেষক, প্রাবন্ধিক


