আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ১৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা না হওয়া, বিলম্বিত ফল প্রকাশের কারণ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে যান্ত্রিক গোলযোগের কথা বলা হলেও বিরোধীরা কারচুপির অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে পাকিস্তানজুড়ে এখন নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে ফলাফলের বিলম্ব আর কারচুপির অভিযোগ।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর সবশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী ৪৭ শতাংশ ভোট গণনা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে ১১৩টি আসনে এগিয়ে রয়েছে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই)। বুধবার রাতে পিটিআইর অফিসিয়াল ফেসবুক পাতায় ইমরান খানকে ‘উজিরে আজম’ সম্বোধন করে অভিনন্দনও জানিয়েছে তারা। পিটিআই কর্মী ও সমর্থকরা চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগেই বিজয় উৎসব শুরু করে দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সামাজিক মাধ্যম কিংবা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কোনও মন্তব্য করেননি ইমরান খান।
ইমরানের দলে যখন বিজয় উদযাপনের প্রস্তুতি, বৃহস্পতিবার দিনের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে ব্যাপক বিলম্ব আর কারচুপির অভিযোগ। নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগ আর বিলাওয়াল ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে ফল প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে। পাকিস্তানের শীর্ষ ধারার রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ’ (পিএমএল-এন), ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ (পিপিপি) এবং ‘মুত্তাহিদা পাকিস্তান মুভমেন্ট-পাকিস্তান’ (এমকিউএম-পি) নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে প্রাথমিক ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে মূলত পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে থাকতে না দেওয়া ও তাদের হাতে ভোট গণনার পর পাওয়া ফলাফল না দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
পাকিস্তান মুসলিম লীগের (পিএমএল-এন) সভাপতি শাহবাজ শরিফ এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, ব্যাপক মাত্রায় অনিয়মের ঘটনার স্পষ্ট প্রমাণ থাকায় পিএমএল-এন ২০১৮ সালের নির্বাচনের এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছে। আমাদের কর্মীদের ফরম-৪৫ দেওয়া হয়নি, ফলাফল ঘোষণা স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল এবং আমাদের পোলিং এজেন্ট ছাড়াই ভোট গণনা করা হয়েছে। এটা না সহ্য করার মতো, আর না গ্রহণযোগ্য।’
পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি একই অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষ্য, বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনাটি ‘ভয়ঙ্কর ও ক্ষমার অযোগ্য।’ তার দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পোলিং এজেন্টদের ভোট গণনার ফলাফল জানতে দেওয়া হয়নি। বিলাওয়াল ভুট্টোর একজন মুখপাত্র টুইটারে মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের কর্মীদের ভোট গণনার পর ফল জানতে না দেওয়াটা কোন ষড়যন্ত্রের অংশ?’ এমকিউএম-পি একইভাবে তাদের অনাস্থা জানিয়েছে করাচিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে। দলটির মুখপাত্র ফয়সাল সাবজাওয়েরি দাবি করেছেন, হায়দ্রাবাদ ও করাচিতে তাদের পোলিং এজেন্টদের ফলাফলের সার্টিফাইড কপি দেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইসিপি প্রধান সরদার রাজা খান নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে দাবি করেছেন। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ঠিকমতো কাজ করেছি বলে প্রমাণিত হয়েছে। শুধু কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। কিন্তু পুরো ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি নেই। বিলম্ব চলছে এবং এই বিষয়ে আমাদের করার কিছু নেই। এদিকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনার সময় কমিশন সচিব বাবর ইয়াকুব জানান, ফল ঘোষণায় বিলম্বের ঘটনায় কোনও ষড়যন্ত্র বা চাপ নেই। ফল পাঠানোর ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণেই তা প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে।
পাকিস্তানে এমন সময় এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দুর্নীতির দায়ে আদালত কর্তৃক অযোগ্য ঘোষিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। লন্ডনের ফ্ল্যাট ক্রয় সংক্রান্ত এক দুর্নীতির মামলায় তার বিরুদ্ধে দ- ঘোষিত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ইমরানকে পেছন থেকে মদত দিতে নওয়াজকে নির্বাচন পর্যন্ত কারাগারে রাখতে সে দেশের সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগ এক হয়ে কাজ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করা হয়েছে নওয়াজের পরিবারকে। অভিযোগের সমর্থন পাওয়া গেছে পাকিস্তান হাইকোর্টের এক বিচারকের কথায়। তিনি গত রোববার বলেছিলেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বিচার বিভাগের কাজেও হস্তক্ষেপ করছে।
গ্যালাপ পাকিস্তানের জনমত জরিপকে উদ্ধৃত করে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, প্রায় ১০ কোটি ৬০ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ বুধবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ২০১৩ সালেও একইরকম পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।


