প্রতিবন্ধীরা পাচ্ছে বাঁচার সুযোগ

পটুয়াখালী প্রতিনিধি ● পটুয়াখালী পৌরসভার গোরস্থান রোডের বাসিন্দা বেলাল হাওলাদার, পেশায় দিনমজুর। সাত সন্তানের জনক বেলাল হাওলাদারকে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তবুও সব দুঃখ-কষ্ট, অভাব অনটন মেনে নিয়ে কোনমতে তার দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু, মড়ার উপর খাড়ার ঘা এর মত ধরা পড়ে তার সাত ছেলে-মেয়ের মধ্যে রাকিব ও সাকিব দু’জন জন্মগতভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী।

ওদের জন্মের পরপরই বেলাল হাওলাদার ও রুনু বেগম দম্পতি প্রথমে তা বুঝতে পারেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন তারা। পরবর্তীতে ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হয়ে ওদের মানসিক অসুস্থতার কথা তারা নিশ্চিত হন। তখন পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনরাই অনেকেই বলতে শুরু করে বেলাল হাওলাদার ও তার স্ত্রীর পাপের ফসল হলো তাদের ওই দুই সন্তান রাকিব ও সাকিব। লোকজনের এধরনের কথায় নিরাশ হয়ে পড়েন তারা। একদিকে সন্তানদের অসুস্থতা অন্যদিকে আর্থিক অস্বচ্ছলতা কারণে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন তারা।

বেলাল হাওলাদারের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে উপজেলা চেয়ারম্যান স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের সহায়তায় তার দুই ছেলের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। তারই ফলস্বরূপ প্রতিমাসে মাথাপিছু ৬০০ টাকা করে ৩ মাস পরপর ৩৬০০ টাকা সরকারি ভাতা গ্রহণ করে আসছেন তারা। যে টাকা দিয়ে শুধুমাত্র তার প্রতিবন্ধী ছেলেদের ওষুধপত্রই নয়, সংসারের দৈনন্দিন প্রয়োজনও মেটানো হচ্ছে। এ যেন তাদের কাছে কুঁজোর সোজা হয়ে শোয়ার স্বপ্ন পূরণ।

এমনই আরেক জন হলেন ৩৭ বছর বয়সী শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী মনোয়ারা খাতুন কমলা। ১৯৮০ সালে কুষ্টিয়ার খোকসার পল্লী বনগ্রামে দরিদ্র কৃষক ইসমাইলের ঘরে জন্মগ্রহণ করা কমলার শারীরিক অবকাঠামো ছিল খুবই দুর্বল। পরিণত বয়সেও তার উচ্চতা আড়াই ফুট। বাবা-মার একমাত্র মেয়ে কমলা যে শারীরিকভাবে অক্ষম সেটি জানতে তাদের সময় লেগে গিয়েছিল ৫ বছর। তখন আদরের ধন কমলাকে নিয়ে বাবা-মায়ের ভাবনার অন্ত ছিল না। কিন্তু তাকে নিয়ে এখন আর উদ্বিগ্ন নন তার বাবা মা।

মানুষের সব হাস্য-তামাশাকে উপেক্ষা করে উদ্যোগী কমলা ২০০০ সালে কৃতিত্বের সাথে ডিগ্রী পাশ করেন। ছোটবেলা থেকেই কমলার স্বপ্ন ছিল অবহেলিত অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু করার। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করতেন। তারই ফলস্বরূপ ২০০৩ সালে আরেক প্রতিবন্ধী আসলামকে সাথে নিয়ে অস্বচ্ছল, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান ও তাদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা সদরে গড়ে তোলেন খোকসা উপজেলা প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা। আর এ সংগঠনটিই এখন কমলা ও আসলামের মত অনেক প্রতিবন্ধীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কারখানা। বর্তমানে ৩৯৫ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী একযোগে কাজ করছে এ সমিতির কুটিরশিল্পে। কমলাসহ এখানের অধিকাংশ প্রতিবন্ধীই সরকারের দরিদ্র অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধীভাতার আওতাভুক্ত। তাছাড়া এ সংস্থাটি পরিচালনার জন্য সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর থেকে কমলা প্রতি বছর ১০০০০ টাকা করে পান।

প্রতিবন্ধীবান্ধব সরকার শুধু রাকিব-সাকিব কিংবা কমলার ভবিষ্যৎই সুনিশ্চিত করে নি; সরকারের সু-নজরের কারণে এখন অনেক রাকিব-সাকিব ও কমলা আত্মনির্ভরশীল ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ মোল্লার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে জানা গেছে, সরকার দরিদ্র অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন ও জীবনমান উন্নয়নে ২০০৫-২০০৬ অর্থ বছরে প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচি প্রবর্তন করে। সে সময় ১ লক্ষ ৪ হাজার ১৬৬ জন প্রতিবন্ধীকে মাসিক ২০০ টাকা হারে এ ভাতা প্রদান করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে সুফলভোগীর সংখ্যা ও টাকা পরিমাণ বাড়ানো হয়।

বর্তমানে এ কর্মসূচির আওতায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার প্রতিবন্ধীকে মাসিক ৬০০ টাকা হারে ৫৪০ কোটি টাকা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান ইউনিয়নের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনে বসবাসকারী প্রতিবন্ধীরাও এ সুবিধা পাচ্ছেন। তাছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার প্রাথমিক থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত উপবৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে যথাক্রমে প্রাথমিক স্তরে ৫০০ টাকা, মাধ্যমিক স্তরে ৬০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৭০০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরে মাসিক ১২০০ টাকা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধীদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ৫ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ এবং বিনামূল্যে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল করার জন্য এককালীন অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল নামে বিশেষ বইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে, পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর চাকরিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনীর চাকরিতে এক শতাংশ কোটা ঘোষণা করা এবং প্রতিটি উপজেলায় বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের মানসিক বিকাশে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘প্রয়াস’ নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, কুমিল্লা, চট্টগ্রামেও এর শাখা প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। পাশাপাশি সকল সেনানিবাসে এর শাখা চালু করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ভাতা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীত্বের ধরণ, মাত্রা ও আর্থিক অবস্থাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এক্ষেত্রে কাজ করতে পুরোপুরি অক্ষম ও আস্বচ্ছল ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ওয়ার্ড কমিটি দরখাস্ত আহ্বান করে। ভাতা গ্রহণে আগ্রহী আবেদনকারীকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করে ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি বরাবর জমা দিতে হয়। উপজেলা চেয়ারম্যানের পরামর্শে চূড়ান্ত তালিকা প্রনয়ন করা হয়। চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচনের পর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা উপজেলা কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদিত তালিকা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে পাঠান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরসহ আবেদনকারীকে একটি পাস বই দেয়া হয়। উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এ বই দিয়ে থাকেন। উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস আবেদনকারীর নাম, ছবি ও সম্ভব হলে নমুনা স্বাক্ষরসহ রেজিস্টার সংরক্ষণ করেন। অতঃপর স্থানীয় তফসিলি ব্যাংকে আবেদনকারীকে ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়। তিন মাস পরপর প্রার্থীর ব্যাংক হিসাবে ভাতার টাকা জমা হয়।

তিনি আরও বলেন, সরকারের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ প্রতিবন্ধী শিশুদের সমাজের মূলস্রোতধারায় সম্পৃক্ত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এ ভাতা দরিদ্র,অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধীদের জীবন যাপনের মান বৃদ্ধি করছে। তিনি সরকারের এ উদ্যোগকে সফল করতে সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেনীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *