প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনতে স্বজনদের ভোগান্তি

প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনতে স্বজনদের ভোগান্তি

নিজস্ব পতিবেদক : কেরানীগঞ্জের মো: মিলন ভাগ্য বদলাতে গিয়েছিলেন কুয়েতে। প্রবাসে তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শেষবারের মতো তার মুখ দেখতে ও মরদেহ দাফন করতে মিলনের পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪৩ দিন। প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে মারা গেলে, তাদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে এভাবেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এ অভিযোগ স্বজনদের।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে কুয়েতে গিয়েছিলেন মো. মিলন। এ বছরের পহেলা মে কুয়েতে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান তিনি। মারা যাওয়ার পর থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ শুরু করেন মিলনের ভাই ইব্রাহিম খলিল। দূতাবাসের কোনও সাড়া না পেয়ে হতাশ হয়ে দেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তিনি। একই সঙ্গে কুয়েতে মিলনের সঙ্গে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে থাকেন। অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ৪৩ দিন পর কুয়েত থেকে দেশে ফিরে মিলনের মরদেহ।

এ প্রসঙ্গে মিলনের বড় ভাই মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আমার ছোট ভাই মিলন সুস্থ শরীরেই কুয়েতে যায়। একজন সুস্থ মানুষ কীভাবে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলো, সেটাই আমরা মেনে নিতে পারছি না। সে মারা যাওয়ার খবর পেয়ে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসে ইমেইল করি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে যথাযথ সাড়া পাইনি। বাধ্য হয়ে দেশে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ শুরু করি। এরপর থেকে মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করি। কুয়েতে মিলনের বন্ধু, পরিচিতরা খুব সহায়তা করেন। কিন্তু দূতাবাস যথাযথ সহায়তা করলে মরদেহ দেশে আনতে এত সময় লাগতো না।

অভিযোগ আছে, প্রবাসে কোনও শ্রমিক মারা গেলে তাদের মরদেহ ফিরে পেতে দেশে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় স্বজনদের। বরগুনার রনি মীর এ বছরের ২৪ এপ্রিল মারা যান কুয়েতে। তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয় ২৫ মে। কুয়েতে রনির স্বজন ছগির হোসেন অনেক ছুটাছুটি করে মরদেহটি দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

এ প্রসঙ্গে রনির বড় চাচা মোতালেব মীর বলেন, রনি মীরের মৃতদেহ পেতে আমরা দেশ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়েছি। কিন্তু নানা কারণে মরদেহ দেশে আসতে দেরি হয়েছে। দূতাবাস সহায়তা করলে আমাদের এত সময় অপেক্ষা করতে হতো না।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টি দেশে প্রায় এককোটি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। তাদের পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা  দেশের  অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশি কর্মীর লাশ তার পরিবারের মতামত সাপেক্ষে দেশে আনার উদ্যোগ নেয় মন্ত্রণালয়। যদি কোনও প্রবাসীর পরিবার স্বজনের লাশ সংশ্লিষ্ট দেশে দাফনের ইচ্ছা প্রকাশ করে, তাহলে সেদেশে দাফনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মৃতের লাশ দেশে পাঠাতে নিয়োগ কর্তা খরচ বহনে অপারগতা প্রকাশ করলে এবং মৃতের পরিবার লাশ দেশে আনার খরচ বহনে অক্ষম হলে; ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের অর্থায়নে লাশ দেশে আনা হয়।

প্রবাসী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনও বাংলাদেশি বিদেশে মারা গেলে, সেদেশে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা থাকে। মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত, প্রকৃত স্বজনদের যাচাই, ঠিকানা, মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, মূল পাসপোর্ট, বকেয়া বেতন ও ইন্স্যুরেন্সÑএসব বিষয় সামনে চলে আসে। এ ক্ষেত্রে দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ভেরিফিকেশন করে সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দূতাবাসের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, কোনও  প্রবাসী অবৈধ পথে বিদেশে গেলে,তার ক্ষেত্রে ভোগান্তি হয় আরও বেশি। তার নাগরিকত্বসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতা মিটিয়ে মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়। এছাড়া, মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে বিমানের কার্গো খালি পেতেও অপেক্ষা করতে হয়।

বসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের হেড শরিফুল হাসান বলেন, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৩৫ হাজার প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষও আছে। বেশির ভাগ হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা গেছেন। কেন এত মানুষ প্রবাসে গিয়ে মারা যান এটিও ভাবনার বিষয়। এটাও গুরুত্ব সহকারে ভাবা দরকার।

নানা কারণে প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আসতে দেরি হয় উল্লেখ করে শরিফুল হাসান  বলেন, আর্থিক সমস্যা ও বিমানের শিডিউল না থাকা অন্যতম কারণ। এছাড়া, যারা অবৈধ পথে বিদেশে যান, তাদের ক্ষেত্রেও জটিলতা হয়। কারণ, অনেক সময় তাদের কাছে বাংলাদেশের বৈধ পাসপোর্ট থাকে না।

এ প্রসঙ্গে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বক্তব্য হলো, কোনও প্রবাসী যে দেশে মারা যায়, সেদেশের কিছু আনুষ্ঠানিকতা থাকে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সময় লেগে যায়। আর যাদের বৈধ পাসপোর্ট থাকে না, তাদের ক্ষেত্রে দূতাবাসের কিছু কার্যক্রমে সময় লাগে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ জুলহাস বলেন,কোনও প্রবাসী মারা গেলে তাকে দ্রুত দেশে আনার জন্য সব সময় আমাদের চেষ্টা থাকে ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *