প্রাইভেট পরীক্ষার নামে প্রতারণার ফাঁদ

প্রাইভেট পরীক্ষার নামে প্রতারণার ফাঁদ

নিজস্ব প্রতিবেদক :‘সরকারি সার্টিফিকেট প্রয়োজন? একটি সার্টিফিকেট আপনার জীবন ও ক্যারিয়ার হান্ড্রেড পার্সেন্ট বদলে দেবে। পূরণ করতে পারে আপনার স্বপ্ন। খুব সহজে নিশ্চিত পাসের সমাধান দিচ্ছি আমরাই। সরকারিভাবে প্রাইভেট পরীক্ষা দিন। অর্জন করুন স্বপ্নের সার্টিফিকেট।’ এমন চটকদার বিজ্ঞাপন দেখা যায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বৈদ্যুতিক পিলারে, গণপরিবহনের জানালায়, এমনকি দৈনিক পত্রিকায়। শুধু তা-ই নয়, ফেসবুকে প্রাইভেট পরীক্ষার নামে খোলা বিভিন্ন পেজেও দেখা যায় এমন প্রচারণার বাহার। এমনকি মোবাইল ব্যবহারকারী গ্রাহকদের কাছেও পাঠানো হয় এসএমএস। এভাবেই রাজধানীজুড়ে প্রাইভেট পরীক্ষার নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে বেশ কয়েকটি চক্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে বিভিন্ন কলেজে ভর্তি করিয়ে এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স, ডিগ্রি, মাস্টার্সের সার্টিফিকেট পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। অথচ ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে কোনও তথ্য নেই। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসএসসি পাসের পর টানা ৩ বছরের বেশি শিক্ষা বিরতি থাকলে ওই শিক্ষার্থীকে আবারও উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তাকে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তির সুযোগ না দিয়ে ভর্তি করানো হয় প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে। সারাদেশের বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত সরকারি কলেজগুলোতেই কেবল প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ভর্তির সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময়ের শিক্ষা বিরতি থাকলেও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি থেকে শুরু করে অনার্স-মাস্টার্সের বিভিন্ন প্রোগ্রাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পাস কোর্স এবং মাস্টার্স পাস কোর্সেও শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করতে পারেন।

এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গজিয়ে ওঠেছে বেশ কয়েকটি প্রতারক চক্র। যারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত করছে সাধারণ মানুষকে। ‘সার্টিফিকেট লাগবে? সরকারিভাবে প্রাইভেট পরীক্ষা দিন’, ‘স্টাডি হেল্প সেন্টার’, ‘একটি সার্টিফিকেট বদলে দেবে জীবন’ এরকম নানা প্রলোভনযুক্ত কথা দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে লিফলেট সেঁটে, ফেসবুকে পেজ খুলে এমনকি মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

গত এক মাস ধরে রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতারণার ফাঁদ পাতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে তাদের প্রতারণার নানা কৌশল।

মহাখালী ডিওএইসএসের ৩২ নম্বর রোডে (স্টাডি হেল্প সেন্টার), তেজগাঁও এলাকার নাবিস্কো’র হাজি মরণ আলী রোডের ২৬১/এইচ নম্বর ভাঙাচোরা একটি বাড়িতে, উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে, ফার্মগেটের তেজগাঁও কলেজের সঙ্গে সাকসেস কোচিং, বনানী ১৭ নম্বর রোডে, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীতে প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রাইভেট পরীক্ষার নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে।

এমন একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে রাজধানীর মতিঝিলের (৪০, হাটখোলা রোড) একটি অফিসে কাস্টমার সেজে কথা বলতে গেলে সেখানকার একজন কর্মী বলেন, ‘যারা এসএসসি পাস করার পর বেশ কয়েক বছর পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন তাদের ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এছাড়া উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে ডিপ্লোমা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ডিগ্রি পাস কোর্স, এমনকি মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েও সার্টিফিকেট পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেক্ষেত্রে স্ট্যাডি গ্যাপ কোনও ব্যাপার নয়।’

ওই কর্মী বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিকে দুই বছরের সেশন হলেও মাত্র এক বছর পড়েই কারেন্ট বছরেই পরীক্ষা দিতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করা যাবে। এছাড়া, আমরা শত ভাগ পাসের নিশ্চয়তা দেবো। নোট-গাইডসহ নানা ধরনের সাজেশনও দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘সময় নষ্ট করবেন না, একটি সার্টিফিকেট জীবনের জন্য খুবই মূল্যবান। যত দ্রুত নেবেন ততই ভালো। পরীক্ষা দেবেন, পাস করবেন, শত ভাগ গ্যারান্টি।‘

এমন গ্যারান্টি দিচ্ছেন কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আপনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী, ফলে আমরা কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে আলাদা কক্ষে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করি। সেখানে দেখে দেখে পরীক্ষা দেয় পরীক্ষার্থীরা। ফলে পাস তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট।’

রাজধানীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এইচএসসির মতো একই পদ্ধতিতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি পরীক্ষা, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অর্ধীনে ডিপ্লোমা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পাস কোর্স এবং মাস্টার্স পাস কোর্সে ভর্তি করিয়ে শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট পাওয়ায় সহযোগিতা করেন তারা। যদিও পড়াশোনা করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নিজেরাই সরাসরি ওই সব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিতে পারেন। তারপরও অজ্ঞতার কারণে অথবা সহজে পাসের সুবিধা নিতে এসব এডুকেশন হেল্প সেন্টার নামের প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েন।

মহাখালী ডিওএইচএসের এডুকেশন হেল্প সেন্টার নামের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতারিত হয়েছেন এক পরীক্ষার্থী। সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়া ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘আমার এসএসসি পরীক্ষার পরে বেশ কয়েক বছর গ্যাপ (বিরতি) ছিল। পরে এই প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়ার পর এখানে আসি। পরে ভর্তিও হয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। প্রথম ধাপে ভর্তি বাবদ দিয়েছিলাম ৫ হাজার টাকা। এরপর পরীক্ষায় বসার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের শিট ও সাজেশন ধরিয়ে প্রতিমাসে নিয়েছে আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা। পরীক্ষায় বসার ঠিক আগ মুহূর্তে দাবি করা হয় আরও ৩০ হাজার টাকা। সেই টাকা না দিলে আমাকে অ্যাডমিট কার্ড দেবে না বলে হুমকি দেয়। পরে অনেক কাকুতি-মিনতি করে বলেছি, ২০ হাজার দেবো। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা দিয়ে অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি, সঙ্গে এসএসসি’র সার্টিফিকেট রেখে দিয়েছে। বাকি ১০ হাজার টাকা এখন দেওয়ার কথা। না হলে আমার এসএসসি’র সার্টিফিকেট দেবে না।’

পরীক্ষায় কোনও সহযোগিতা করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরা তো প্রতারক। আমাকে কোনও সহযোগিতাই করেনি। আমি পরীক্ষায় পাস করবো কিনা, সেটা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘এরা মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যায়। তাদের অফিস ছিল প্রথমে উত্তরা। পরে শুনি বর্তমানে তারা মহাখালীতে অফিস নিয়েছে। আমার জানামতে, হাজার হাজার মানুষে এদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে। এটা আমি এখন বুঝতে পারছি।’

এডুকেশন হেল্প সেন্টারের কর্মী তানিয়ার কাছে তাদের এই প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং দিয়ে থাকি। তারা সহজে কীভাবে পাস করবে তার টিপস দিয়ে থাকি। প্রাইভেটে ভর্তি হতে সহযোগিতা করি। এখানে কোনও প্রতারণার মাধ্যমে বাড়তি অর্থ নেওয়া হয় না। কলেজে ভর্তি হতে যা লাগে সেটাই নিয়ে থাকি। আর মাসিক বেতন ও আমাদের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা ক্লাস করিয়ে টাকা নিই।’

প্রতিবছর উচ্চ মাধ্যমিকে কতজন শিক্ষার্থী প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষায় বসেন, তার কোনও পরিসংখ্যান নেই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কাছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সাহা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এমন আলাদা করে প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের হিসাব করা হয়নি। তাছাড়া তাদের সার্টিফিকেটেও ওসব উল্লেখ থাকে না। এ কারণে এর কোনও পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।’

রাজধানীজুড়ে প্রতারক চক্রের বিষয়ে কোনও অভিযোগ অথবা তথ্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেবেন কিনা জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনও বৈধতা নেই। তারা ফৌজদারি অপরাধ করছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তো শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য সুযোগ রয়েছে, সেখানে তারা নিজেরা সরাসরিই ভর্তি হতে পারেন। ফলে এমন সব প্রতারক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।’

_____________

patheo/105

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *