প্রাথমিকে মিড ডে মিল

প্রাথমিকে মিড ডে মিল

আলোর পরশ। মোঃ আবদুর রহমান

প্রাথমিকে মিড ডে মিল

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কোটি ৭৩ লক্ষ ৩৮ হাজার শিশুর মধ্যে ঝরেপড়া শিশুর হার ১৮.৬ শতাংশ। ঝরেপড়া রোধ করতে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ‘মিড ডে মিল’ এর আভিধানিক অর্থ হছে মধ্যা‎হ্ন ভোজ বা দুপুরের খাবার। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘মিড ডে মিল’ বলতে বোঝায় দুপুরের খাবার নিশ্চিত করা। এটি মূলত প্রযোজ্য তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য, যারা দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। দুপুর ১টা ৩০ মিনিট থেকে ২টা পর্যন্ত মধ্যা‎হ্ন বিরতিতে তারা এ খাবার গ্রহণ করবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে পড়াশোনায় মন দিতে পারে না। এতে করে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। আবার যেসব ছেলে-মেয়েরা মধ্যা‎হ্ন বিরতিতে বাড়ি যায়, তারা প্রায়শই আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসে না। অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধি এবং ঝরেপড়ার এটাও একটা উল্লেখযোগ্য কারণ। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝরেপড়া রোধ করার লক্ষ্যে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিগত ৮/৯ বছর ধরে স্কুল পর্যায়ে এ কর্মসূচি চললেও এবছর এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা প্রসূত অনন্য এ উদ্যোগ ‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯’ শিরোনামে অবশেষে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাভ করেছে। এর ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার সরবরাহে স্থায়ী একটি ব্যবস্থা হলো। দেশের ১০৪টি উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রতিদিন স্কুল খোলা অবস্থায় দুপুরে রান্না করা খাবার পাওয়া নিশ্চিত হলো।

বস্তুত শিশুদের জন্য দুপুরবেলা মানসম্মত ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার সরবরাহ করা হলে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের স্কুলে উপস্থিতির আগ্রহ বেড়ে যাবে, একই সাথে দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের ঝরেপড়া হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি এ কর্মসূচির মাধ্যমে এসব শিশুর পুষ্টির যোগান দেয়াও সম্ভব হবে।

বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের কয়েকটি উপজেলায় ‘মিড ডে মিল’ চালু হয়েছে। কীভাবে তা সমন্বিতভাবে সারা দেশে শুরু করা যায়-সেজন্যই এই নীতিমালা। এতে বলা হয়েছে – প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে এমন তিন থেকে বারো বছরের শিশুদের জন্য এই নীতিমালা প্রযোজ্য হবে। তাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরির ন্যূনতম ৩০ শতাংশ স্কুল মিল থেকে নিশ্চিত করার বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে নীতিমালায়।

‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯’ এ বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত খাবার সরবরাহের বিস্তারিত নীতিমালায় বর্ণিত হয়েছে। দেশের সকল বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় স্কুল মিল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সহকারী উপপরিচালক ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার সম্পৃক্ত থাকবেন। এছাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারও এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্বপালন করবেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলা পরিষদ এ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত থাকবে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ বিভিন্ন বিত্তশালী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

প্রাথমিক শিক্ষার টেকসই মানোন্নয়নে শিশুদের পড়াশুনার প্রতি আগ্রহীকরণের বিকল্প নেই। দুপুরে রান্না করা পুষ্টি সম্পন্ন গরম খাবার পরিবেশন করা গেলে শিশুদের স্কুলে আসার আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং স্বাস্থ্যগত উন্নতিও সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তাদের স্কুলমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়বে, ফলশ্রুতিতে ঝরেপড়া হার হ্রাস পাবে। এক গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়, ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। বরগুনার বামনা উপজেলায় পরিচালিত এ গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, মিড ডে মিল কার্যক্রমের ফলে ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর হার ১.০২ শতাংশে তে নেমে আসে, যেখানে অন্যান্য উপজেলাতে এ হার ৭.৮ শতাংশ। দুপুরে স্কুলে রান্না করা খাবার দিলে উপস্থিতির হার ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আর শুধু বিস্কুট দিলে উপস্থিতি ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি ২০১৯’ অনুমোদনের পর জানুয়ারি ২০২০ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হছে। নীতিমালার আলোকে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সারাদেশে এবং ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ কর্মসূচিতে চর ও হাওড় এলাকাকে প্রাধান্য দেয়া হছে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *