প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা : আমার পেশা, আমার মর্যাদা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা : আমার পেশা, আমার মর্যাদা

ফিরে দেখা। মমতাজ পারভিন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা : আমার পেশা, আমার মর্যাদা

আজকের শিশুকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগি করে গড়ে তোলেন একজন শিক্ষক। দেশ-কাল জাতিভেদে শিক্ষকের মর্যাদা সবার উপরে । তাই জ্ঞান বিতরনের এই মহান পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে জীবন উৎসর্গ করা কোন অভিশাপ নয়, আর্শিবাদ।

বর্তমান প্রজন্মকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে, আগামী দিনের সুখী,সমৃদ্ধ বাস উপযোগী দেশ গড়তে নিজেকে নিবেদিত করার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র এই মহান পেশা। শিক্ষাস্তরের প্রথম ধাপ প্রাথমিক শিক্ষা। টাকা বা সম্মানীর বিষয়টি না ধরলে মর্যাদার দিক দিয়ে শীর্ষস্তরের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া প্রতিটি শিশুর নিকট তার শিক্ষক কথায় ও কাজে, পোশাক ও রুচিতে, পেশায় ও কর্তব্য পালনে আর্দশবান, ধর্মপ্রাণ, সত্যপ্রিয়, অনুসরণীয়, রোল মডেল, জ্ঞানের উৎস এবং অফুরন্ত আনন্দের ভান্ডার।

কোন জাতির মান নির্ভর করে সমাজের প্রতিটি নাগরিকের মানের উপর। আর নাগরিকের মান বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষার মানের উপর। এই জন্য প্রাথমিক স্তরের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের করতে হয় অক্লান্ত পরিশ্রম। যে কাজটি মোটেও সহজ নয়।একজন আর্দশ শিক্ষক হিসেবে শিশুদের যেকোন সমস্যায় ভালোভাবে বোঝানোর ক্ষমতা এবং দক্ষতা, সব ধরনের পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া, কোমলমতি শিশুদের সত্যের পথে চালিত করা, আত্মিক বন্ধন তৈরী করা, আনন্দের সাথে পড়ানো, পাঠে শিশুকে মনোযোগী ও সক্রিয় রাখা অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব।চ্যালেঞ্জিংও বলা যায়।

আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে, শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, মানবিক, নান্দনিক, নৈতিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্ববোধে, বিজ্ঞানমনস্ককতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শিশুদের ২৯ টি প্রান্তিক যোগ্যতা, শ্রেণি ও বিষয়ভিত্তিক ৩৩৯০ টি যোগ্যতাভিত্তিক শিখনফল অর্জন করতে হবে। এমনভাবেই প্রাথমিক শিক্ষাক্রম প্রণিত হয়েছে এবং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য এর ১৭ টি লক্ষ্যে অন্যতম লক্ষ্য: সবার জন্য ন্যায্যতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ। সহজ ভাষায় বললে, মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীকে সময়মত তার পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণসহ শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। যে বিষয়গুলো থাকলে মানসম্মত শিক্ষা অর্জিত হচ্ছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি সেগুলো হল : যে বয়স থেকে শিক্ষা অর্জন শুরু করার কথা ঠিক সে বয়সেই শিক্ষা অর্জন শুরু করা, ঠিকমত স্কুলে যেতে পারা, বই খাতা, কাগজ কলম, পোশাক পরিচ্ছদসহ যাবতীয় শিক্ষাউপকরণ সঠিকভাবে পাওয়া, শিক্ষকদের দ্বারা নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা নেয়াসহ শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারা এবং শিশুদেরকে দিয়ে পড়ালেখা বহির্ভূত অন্য কোনো কাজ না করানো।

সবার জন্য ন্যায্যতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ নিরলস প্রচেষ্টা করছেন।

এই শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় নানা কাজে দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিদ্যালয়ের যাবতীয় রেকর্ড, রেজিস্টার ও ফাইল সংরক্ষণ, শিশুজরিপ ও তথ্য সংরক্ষণ, বিদ্যালয়ে শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, অনিয়মিত শিশুদের হোমভিজিট, বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা ও সাপ্তাহিক রুটিন প্রণয়ন, পাঠটিকা ও প্রয়োজনীয় উপকরণসহ ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করে পদ্ধতি মাফিক পাঠদান নিশ্চিত করা, আন্ত:প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট, সরকারি পরিপত্র সম্পর্কে ধারণা অর্জন, সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্টদের অবহিতকরণ এবং বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, বিদ্যালয়ের স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পদের নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় তথ্য ও রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট যথাযথভাবে প্রেরণ, ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক অভিভাবক কমিটি, কাবদল, হলদে পাখির দল, স্টুডেন্ট কাউন্সিল, ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম নিশ্চিত করা, বছরের প্রথম দিনেই শিশু বরণের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শ্রেণিকক্ষ, আঙিনা, শৌচাগার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন, মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহযোগিতা, কৃষি শুমারী, ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধন, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সকল নির্বাচনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

একটা কথা স্বীকার করতেই হবে; আমাদের দেশ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশংসনীয় উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, এ দেশের সাধারন মানুষের সন্তানদের শিক্ষিত করতে না পারলে দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করা যাবে না। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও দু:সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে ছত্রিশ হজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন এবং প্রায় দেড় লাখ শিক্ষকের চাকরি সরকারি করণ করেন। একই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষায় আশার আলো জ্বালিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে পিতার পদাঙ্কই অনুসরণ করেছেন। ইতিমধ্যে ছাব্বিশ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন এবং প্রায় লক্ষ্যাধিক শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ করেছেন।

প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে নিয়েছেন নানামুখী পদক্ষেপ। শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথমদিনই নতুন বই তুলে দেয়া, প্রতিটি বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া, প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহ, শিওর ক্যাশের মাধ্যমে উপবৃত্তি প্রদান, অনগ্রসর এলাকায় স্কুল ফিডিং, মিড ডে মিল কার্যক্রম, দপ্তরি নিয়োগ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি কার্যক্রম চালু, নতুন পদ সৃষ্টি, প্রধান শিক্ষকের পদমর্যাদা বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের ভৌত-অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ওয়াশব্লক, শিক্ষাউপকরণ সরবরাহসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। তদুপরি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবশ্যই আর্থ-সামাজিক ভাবে উন্নত, নিরাপদ ও সুরক্ষিত জীবনের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অনেকেই না জেনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষাগত ও অন্যান্য যোগ্যতার প্রশ্ন তুলতে পারেন।

বর্তমানে তুমুল প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছ নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে; কিন্তু মানসম্মত বেতন এবং উন্নত গ্রেডের অপ্রাপ্তি এ পেশায় হতাশা এবং অনাগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এ ব্যপারে অনেক লেখালেখি, প্রস্তাবনা প্রেরণ, আন্দোলন, কর্মসূচির অবতারনা হয়েছে। তবে এবার সারা দেশের লাখ লাখ প্রাথমিক শিক্ষকের মধ্য থেকে আর ৬৫ ভাগ নয়, বরং প্রধান শিক্ষক পদে তারা পাবেন শতভাগ পদোন্নতি। কেবল প্রধান শিক্ষকই নয়, সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, সহকারি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, বিভাগীয় উপপরিচালক, এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদে পর্যন্ত পদোন্নতি পাবেন তারা। গত ১৩ মে, ২০১৯ সহকারি শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে এ আশ্বাস দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব জনাব মো: আকরাম আল হোসেন। তিনি বলেন, শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য তাদের পদমর্যাদা বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে।

বর্তমানে সারা দেশে ৬৫ হাজার ৬০১ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন তিন লাখ বাইশ হাজার ৭শ‘ ৬৬ জন। বিদ্যালয় সমূহে দুই কোটি উনিশ লাখ বত্রিশ হাজার ৬শ‘ ৩৮ জন শিক্ষর্থী রয়েছে।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে পদোন্নতির সোপান সৃষ্টি হবে। এতে প্রাথমিক বিদ্যালয়রের শিক্ষকতার চাকরি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে এবং এ পেশায় আকৃষ্ট হবেন মেধাবীরা। প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষকের পরিচয় তিনি শিক্ষক। শিক্ষকের মর্যাদাকে খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নাই। শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রস্তুত ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

লেখক : সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার, কুমারখালি, কুষ্টিয়া

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *