মতামত । মু. জসীম উদ্দিন
প্রিয় বাবারা যেমন হয়
বারান্দায় বসে অপলক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন জয়নাল সাহেব। এসময় নাতি এসে চমকে দিয়ে বললো ‘দাদা আকাশে কি দেখ? জয়নাল সাহেব উত্তরে বললেন তোমার দাদীকে খুঁজছি। নাতি আবার জিজ্ঞেস করলো ‘দাদী কি আকাশে থাকে? এবার আর উত্তর দিতে পারলেন না তিনি, দুচোখ বেয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়লো সাথে একটি দীর্ঘনিশ্বাস।
জয়নাল সাহেবের বয়স এখন ৭২ বছর। দু’ছেলে মেয়ে নিয়ে ভালোই চলছিল জীবন। হঠাৎ এক দমকা ঝড়ে এলোমেলো হয়ে গেলো তার জীবন। আজ থেকে আঠারো বছর আগে এক সড়ক দূর্ঘটনায় প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু জয়নাল সাহেবের জীবনের সাজানো গল্পকে এলোমেলো করে দেয়। তারপর দীর্ঘ আঠারো বছর তিনি স্ত্রী হারানোর বেদনা নিয়ে বেঁচে আছেন। তিনি এখন ছোট ছেলের বাসায় থাকেন। ছেলে, বৌমা আর নাতি নাতনীদের নিয়ে তার সময় কাটে। একসময় ছেলেমেয়েরা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলেও তিনি আর বিয়ে করেননি। তাকে বিয়ের কথা বললেই তিনি বলতেন নতুন করে সংসারে আর অশান্তি চাই না। যে কটা দিন বাচঁবো ছেলেমেয়েদের সুখের দিকে তাকিয়ে বাচঁতে চাই।
আসলে আমরা অনেকেই বাবা/মা মারা গেলে জীবিতদের পুনরায় বিয়ে দিতে চাইনা। আমরা ভাবি নতুন করে বাবা/মায়ের বিয়ে দিলে সংসারে অশান্তি হবে এবং সম্পদের ভাগ দিতে হবে। কিন্তু কেহ এ কথা ভাবি না যে একটি মানুষ কিভাবে একা থাকবে। তার কথা বলার মানুষেরও তো দরকার আছে। আজ আমরা যে যার মতো চলছি কিন্তু বাবা যে আমার ঘরে একা আছেন তিনি কিভাবে ঘুমাচ্ছেন, তার কি সুবিধা অসুবিধা সেগুলো আমরা জানার চেষ্টা করি না। সময় তার নিজ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে পাশাপাশি একাকি বাবা মায়েরা আস্তে আস্তে একাকিত্বের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে আর এভাবে চলতে চলতে একদিন চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে।
জয়নাল সাহেবের কথায় ফিরে আসি, সংসারে অশান্তি আর সম্পদের ভাগের কথা চিন্তা করে তিনিও বিয়ে না করে একাকিত্বের জীবন বেছে নিয়েছেন। নিরবে, নিস্তবদ্ধে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে যাত্রার শেষ স্টেশনের দিকে। কিন্তু আমি বা আমরা এ বাবার জন্য কি করলাম। নিজের জীবন উপভোগ করছি ঠিকই অথচ বাবার চাওয়া পাওয়ার দিকটা একবারের জন্যও বিবেচনায় আনলাম না। অথচ তিনিই সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের জীবনকে একপ্রকার নিশ্বেষ করে দিচ্ছেন।
বাবা আসলে কি? বাবা হচ্ছেন সন্তানের জনক, অভিভাবক ও জন্মদাতা। শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর যে শব্দগুলো সবার আগে তার মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে তার অন্যতম হচ্ছে বাবা। এ যেনো সন্তানের কাছে চিরন্তন আস্থার প্রতীক। শিশু যখন বাবা ডাকতে শিখে তখন বাবার মন পুলকে ভরে যায়। বাবাদের হাস্যোজ্জল সেই অনুভূতি শিশুর মনকেও আনন্দিত করে। বাবা ছোট একটি শব্দ হলেও এর ব্যাপকতা বিশাল। বাবা ডাকের মাঝেই লুকিয়ে আছে কি গভীর ভালবাসা, নিরাপত্তা ও নির্ভরতা। জন্ম নেয়া সন্তান বুকে নিয়ে বাবার যে সুখ তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ছোটবেলা থেকে সবচেয়ে সুন্দরতম উপহারগুলো পাওয়া যায় বাবার কাছ থেকেই।
হাজারো কষ্ট সয়ে তিলেতিলে সন্তানকে বড় করে তোলেন একজন বাবা। ছোট-বড়, অখ্যাত-বিখ্যাত সকলের কাছে বাবা অসাধারণ। একজন আদর্শ বাবা তার সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল না হয়ে পারেন না। বাবা নামের মানুষটি সারাজীবন চরম কষ্ট হাসিমুখে স্বীকার করে যান সবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। কিন্তু আজকাল দেখা যায় অনেকেই বাবাকে অবজ্ঞা, অবহেলা করছেন, যা মোটেই ঠিক নয়। বাবা শুধু একজন মানুষ নন, বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবি প্রকাশ। বাবার ছায়া শেষ বিকেলের বটগাছের ছায়ার চেয়েও বড়।
বাবাকে নিয়ে সব সন্তানের অনুভূতিটা সমান হয় না। আবার সব বাবাও পারেন না সন্তানের প্রতি তার আবেগকে একইভাবে প্রকাশ করতে। বাবারা সন্তানের জন্য মঙ্গল কামনা করে যান তার জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। প্রকাশভঙ্গি যাই হোক সন্তানের জন্য পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য করে তুলতে চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না তার। তাই বাবা মাদের বন্ধু তারাই জানে কি করে নিজের সব ভাবনাকে বাবার হাতে সঁপে দিয়ে হালকা হতে হয়।
বাবার সেবা করা প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। আমরা যেন বাবার স্নেহের মাঝে বেড়ে ওঠা আমাদের শৈশব আর কৈশরের দিনগুলো ভুলে না যাই। বাবাকে সম্মান করলে জীবন পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর অবহেলা করলে জীবনে নেমে আসবে অন্ধকার। পৃথিবীর সব থেকে বড় ক্রেডিট কার্ড যদি কিছু থেকে থাকে তা হলো আমাদের বাবা। যে কার্ড দিয়ে আমরা পৃথিবীর সমস্ত সুখ কিনতে পারি। আমরা যত বড়ই হই না কেন বাবা ছাড়া যে আমরা প্রত্যেকেই অচল।
সন্তানের সঙ্গে বাবার যে নিবিড় সম্পর্ক তা আমাদের সমাজে কতটুকু বিদ্যমান? বাংলাদেশে অনেক সন্তান তাদের পিতাকে ভাবে দুর্জন। পিতার বুকফাটা আর্তনাদ না শোনার মতো সন্তানও এই সমাজে আছে। ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার/মস্তা ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার। নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি/সবচেয়ে কমদামি ছিলাম একমাত্র আমি/ছেলে আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম/আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম’ নচিকেতার এই গানের বাস্তবতা মিলবে গাজীপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ছোটবেলা হতেই আমরা পড়ে এসেছি। কিন্তু বিশ্বায়নের এ যুগে বড় হয়ে আমরা এ কর্তব্য ভুলে যাই। কয়েকদশক ধরেই এ উপমহাদেশের ঐতিহ্য যৌথ পরিবার ভেঙে পশ্চিমা অনুকরণে এক পরিবারের দিকে ধাবিত হচ্ছি, সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্ববোধ ভুলে গিয়ে পিতামাতাকে ভরণপোষণ করতে ভুলে যাচ্ছি। অথচ জীবজগতে একমাত্র মানবসন্তানকে জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে তাকে সাবালক করা পযন্ত মা-বাবাকে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাই আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বাবা-মাকে ভরণপোষণ করতে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পিতামাতার ভরণপোষণ সংক্রান্ত ‘পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মা-বাবারা সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ লাভের আইনি অধিকার লাভ করেছেন, যা ক্ষুদ্র হলে যে কোনো মা-বাবা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন।
এ আইনে ভরণপোষণ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গপ্রদানকে বোঝানো হয়েছে। এ আইনে প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ আইনে সন্তান বলতে সক্ষম ও সামর্থবান ছেলে ও কন্যা উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানদের নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এ আইন অনুসারে পৃথকভাবে বসবাস করলেও মা-বাবার সঙ্গে সন্তানরা নিয়মিতভাবে দেখাসাক্ষাৎ করবে এবং যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে প্রদান করবে। আবার যাদের মা-বাবা নেই কিন্তু দাদা-দাদি বা নানা-নানি আছে যাদের ভরণপোষণ করা সেই বাবা বা মায়ের দায়িত্ব ছিল তাদেরই বাবা মায়ের সে দায়িত্ব পালন করতে হবে অর্থাৎ ভরণপোষণ করতে হবে।
বাবারা সারাজীবন সন্তানের জন্য সুন্দর জীবনের স্বপ্ন বুনে গেছেন। নিজের সুখের দিকে না তাকিয়ে তারা সন্তানকে সুখী করতে চেয়েছেন। নিজে কম খেয়ে সন্তানকে খাইয়েছেন। নিজে আরাম আয়েশ ভোগ না করে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেছেন। আসলে বাবারা এমনই হয়, হয়তো আমরাও বাবা হয়ে এমনই হবো। পিআইডি নিবন্ধ
লেখক : কলামিস্ট


