ফরীদ সাহেবের বিরুদ্ধে নির্জলা মিথ্যা প্রচারের উদ্যোক্তা কারা?
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: বড় দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে লিখছি, কওমী মাদ্রাসাগুলো তার আগের অবস্হা হারাতে বসেছে। নবীন আলেম এবং তালেবুল ইলমদের যে অবস্থা, তাতে কলেজ- ভার্সিটি- আলীয়া মাদ্রাসার মত রূপ নিচ্ছে। আমরা আগে কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়কে দোষারোপ করতাম, তাদের কোন আদব- কায়দা নেই। তারা শিক্ষকদের সন্মান দিতে জানে না। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত- অপমানিত করে থাকে। শিক্ষকদের শানে নানান তোহমত ছড়ায়। তাদেরকে রুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু বর্তমান কওমী অঙ্গনে যা শুরু হয়েছে, তাতে কলেজ- ভার্সিটি থেকে কম কী? বরং আরো অধঃপতনে যাচ্ছি আমরা।
বড় আফসোস! আমাদের সন্তানেরা কোনদিকে? কোথায় পা বাড়িয়েছে তারা? অথচ চিন্তা করে দেখুন তো? দুনিয়ার সবচেয়ে আদবী – আখলাকী ছাত্রের মিলনমেলা হল কওমী মাদ্রাসা। আদব- আখলাকের মডেল বলা যায়। আজ পর্যন্ত কোন কওমীর সন্তান মাথা উঁচু করে উস্তাদের সাথে কথা বলেছে কিনা জানা নেই। নিজের উস্তাদ দেখলে ভক্তি- ভালবাসায় মাথা নুইয়ে আসে। কখনো উস্তাদের সামনে জোর গলায় কথা বলে না। সেই কওমীর আজ কী বেহাল দশা।
আহ, দুঃখ লাগে, যখন অনলাইনে- অফলাইনে উস্তাদদের দোষ-ত্রুটিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করে জাতির সামনে উপস্হাপন করা হচ্ছে, তখন লজ্জায় মুখ ঢাকতে হয়। কারো সামনে মুখ দেখানো যায় না। এরকম বেহাল অবস্হা মনেহয় ইতিপুর্বে আর হয়নি। যে পজিসন চলছে, তাতে আরো ভয়াবহ অবস্হার দিকে ধাবিত হচ্ছে আমাদের কওমীর ছাত্রসমাজ।
ঐ যে বেআদব, বেআমল, উশৃঙ্খল, বাহিনীর মত শুরু করে দিচ্ছে কওমীর অবলা সন্তানেরা। ওদের মত সত্যমিথ্যার মিশ্রন ঘটিয়ে কওমী অঙ্গনকে কলুষিত করা হচ্ছে বারবার। সুস্হ- সাবলিল পরিবেশ হচ্ছে বিনষ্ট। রুহানিয়্যাত বিদায় নিচ্ছে আমাদের থেকে। বেআমল আর বদ আমলে ভরে যাচ্ছে আমাদের কওমী পরিবার।
তবে কেন হচ্ছে এমনটি? কেন আজ আদবের খোলস পাল্টে বেয়াদবির খোলসে ছাত্ররা? কোন শক্তি কাজ করছে তাদের পিছনে?
আমি আজ অন্য কাউকে দায়ী করতে চাই না। সবসময় যে বহিরাগত শক্তি কাজ করে তা নয়। বরং কখনো ভিতরকার শক্তি কাজ করছে। যার দ্বারা ছাত্ররা বিপদগামী হচ্ছে।
আজ আমাদের সন্তানেরা বেয়াদব হচ্ছে, নীতিহীন হচ্ছে, আকাবির- আছলাফের মত-পথ ত্যাগ করে বাতিলের রাহুগ্রাসে বন্দী হচ্ছে, এরজন্য আমরা নিজেরাই বেশী দায়ী। আমাদের কিছু ত্রুটির কারণে আমাদের সন্তানেরা হণ্যে হয়ে ছুটে চলেছে।
একটু লক্ষ্য করে দেখবেন, আমাদের সন্তানদের আমরাই বেয়াদব বানিয়ে দিচ্ছি। অন্য জগৎ থেকে কেউ আসেনি। কয়েকটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করুন, বুঝতে পারবেন।
এক
২০১৭ সনের ১৭ অক্টোবর আরজাবাদে যখন বেফাকের মিটিং ডাকা হল, উপস্হিত হল, হাজারো আলেম এবং ত্বলাবা। অথচ উপস্হিত হওয়ার কথাছিল শুধু মাদ্রাসার প্রতিনিধিগণ। কিন্তু সেটাকে উপেক্ষা করে ঢাকা শহরের মাদ্রাসার ছাত্রদের উপস্হিত করা হল। কিশোরগঞ্জের আজহার আলী আনোয়ার শাহ যখন বক্তৃতা করলেন, তখন তাঁকে অপমান করা হল। একটা ভরপুর মজলিসে, একজন খ্যাতিমান আলেমকে অপমান- অপদস্হ করা, কত বড় দুঃখজনক ঘটনা।
যারা বেয়াদবি করেছিল, তাদের কি কোন বিচার করা হয়েছে? শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে? কিছুই হয়নি। সে বেচারা মনের কষ্ট নিয়ে দুনিয়া ছেড়ে চলেগেছেন।
দুই
টঙ্গীর তাবলীগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রখ্যাত আলেমদ্বীন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের বিরুদ্ধে রাজপথে কিছু লোক নিরীহ মাদ্রাসার তালেবুল ইলমদের নিয়ে যেভাবে হম্বি- তম্বি করা হল। ফরীদ সাহেবের সম্পর্কে নির্জলা মিথ্যাচার করে, তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রদের উস্কে দেওয়া হল। এখানেই শেষ নয়, ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের দাঁড়ি- টুপি সম্বলিত ছবি রাজপথে পদদলিত করা হয়েছিল। ফরীদ সাহেবের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হল।
এগুলো কারা করেছিল সেদিন? আমাদের কওমী সন্তানেরা।
এর মদদ দাতা উস্কানি দাতা কে? আমাদের কওমীর কিছু আলেম?
এই ন্যাক্কারজনক কাজের নেতৃত্বে কে ছিলেন? তিনিও কওমীর বিখ্যাত ইয়ং নেতা।
সেই চরম বেয়াদবির কোন শাসন হয়নি। বিচার হয়নি। আমাদের মুরুব্বীগণ মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন।
দেখুন! একজন শায়খুল হাদীস, ফেদায়ে মিল্লাতের খলিফা, তাঁর সম্পর্কে তোহমত দিয়ে কওমীর সন্তানদের লেলিয়ে দিলাম আমরা। আর নেতৃত্বে কওমীর এক বিখ্যাত ব্যক্তি।
ছাত্রদের বেয়াদব কারা বানাল? নিরীহ তালেবুল ইলমদের যে ভাবে ব্যবহার করা হল, তাতে ছাত্ররা বেয়াদব না হয়ে পারে? সেই বেয়াদব ছাত্র, সেই উস্কানী দাতা, মদদ দাতা, সেই নেতা আজো বহাল তবিয়তে। যদি কোন প্রতিকার করা হত, শাসন করা হত, তাহলে কিন্তু আর এরকম হত না।
সেই নেতৃত্বে যিনি ছিলেন, তাকে বহু লকব দিয়ে মাথায় তোলা হয়েছে। ওসব ছাত্রদের কি অবস্থা? তারা শুধু ব্যবহৃত হয়েছে। এবং তাদের বেয়াদব বানানো হয়েছে।
তিন
হেফাজতের আন্দোলনের সময়কার কথা চিন্তা করুন। তখন প্রায় সকল আলেম- উলামা এক প্লাট-ফরমে ছিল। কেউ ভিন্ন প্লাট- ফরমে থাকলেও মৌনভাবে সমর্থন করেছিলেন। আবার কেউ ভিন্ন মতের যে ছিল না তা নয়। কারো ব্যক্তিগত কোন মতামত থাকতে পারে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হল, সেই হেফাজতের মঞ্চ থেকে কিছু আলেম নেতাকে নামিয়ে দেওয়া হল। আবার কোন কোন নেতাকে মঞ্চে উঠতে দেওয়া হল না। কোন নেতাকে অপমান করা হল, মঞ্চে ঘেষতে দেওয়া হয়নি। এটা কারা করেছিল? আমাদের কওমীর কিছু নবীন আলেম। কওমীর কিছু তালেবুল ইলমকে ব্যবহার করা হল।
চার
আল্লামা আহমাদ শফির পক্ষ নিয়ে সারাদেশে যারা হেফাজতের আন্দোলনের সাথে নেই, তাদের বিভিন্ন ভাবে গালিগালাজ করা হয়েছে। আল্লামা আহমাদ শফির মতের খেলাফ যারা তাদের হেনেস্তা করা হয়েছে বহুবার। এখানে কারা এগুলো করেছে, সবই কওমীর নবীন আলেম এবং তালেবুল ইলম। এখানেও তালেবুল ইলমদের ব্যবহার করা হয়েছে।
পাঁচ
তবলীগে মতানৈক্য। যারা আলেমদের সাথে আছে তারা দুধে ধোয়া। আর যারা নিজস্ব চিন্তা- চেতনায় খামোশ আছেন, বা পর্যবেক্ষণ করছেন পরিবেশ পরিস্হিতি, তাদের সবাইকে সাআদ সাহেবের দোসর বলে আখ্যা দিয়ে কম বেইজ্জতি করা হয়েছে?
সাআদ সাহেবের বেশুমার ভুল আমি জানি, তাই বলে সাআদ সাহেবের বিরুদ্ধে যেভাবে জিহাদের ময়দান কায়েম করা হল, তা তো বেগতিক অবস্থা। সব মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে ইয়ারপোর্ট ঘেরাও করে , যা ইচ্ছে – তাই ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল সে সময়ে।
সাআদ সাহেবকে আমি ফেরেস্তা বলছি না। তার ভুল অবশ্যই আছে। কিন্তু আমরা প্রতিবাদের এ কী সিষ্টেম বের করেছি? কিছু হলে মাদ্রাসার নিরীহ ছাত্রদের ব্যবহার করব? আর ছাত্রদের বেয়াদবি শেখাব? আচ্ছা, মাদারে ইলমী দারুল উলুম দেওবন্দে কী সাআদ সাহেবের সাথে এরকম আচরণ করা হয়েছে? দেওবন্দের ছাত্ররা কী নিজামুদ্দীন ঘেরাও করতে গিয়েছিল কখনো?
ইখতেলাফ বা মতানৈক্য যুগ যুগ ধরে ছিল। আমাদের পুর্বসুরীদের মাঝে হাজারো মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। কিন্তু তারা নিজের ছাত্র- ভক্তদের ব্যবহার করেনি কখনো।তারা কেউ নিজের ছাত্রদের অন্যের বিরুদ্ধে উস্কে দেন নি। কাউকে এভাবে রাজপথে নেমে বেইজ্জতি করেন নি।
কিন্তু আমরা কী করছি? কারো সাথে মতের খেলাফ হলেই তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ময়দানে নেমে পড়ছি। আর সাথে নিচ্ছি ছাত্রদের। নিরীহ তালেবুল ইলমদের ব্যবহার করে যাচ্ছি।
ছয়
ছাত্রদের ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনীতির ময়দানে। আমাদের অনেক সংগঠনের আওয়াম তথা সাধারণ মানুষের সাথে সম্পর্ক নেই। আমরা রাজনীতি করছি নিরীহ ছাত্রদের নিয়ে। ঢাকা শহরে যে কোন আন্দোলন সংগ্রাম হয়, সকল মিছিল- মিটিং- এ ছাত্ররা ব্যবহৃত হচ্ছে। পাবলিকের সাথে কোন সম্পর্ক নেই । কিন্তু ছাত্ররা অগ্রভাগে।
এসব ছাত্ররা বিপক্ষ সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছে। তাদেরকে এসব কে শেখাচ্ছে? আমরাই তো তাদের শিক্ষা দিচ্ছি! বর্তমানে আমাদের মুরুব্বীদের দোষত্রুটি খুঁজে বের করা হচ্ছে। বড় জঘন্যতম কাজ। আমি এসবের কোনটাকেই সাপোর্ট করিনা। কখনো এক মুরুব্বীর পক্ষ নিয়ে আরেক মুরুব্বীর বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে।
দেখুন! ছাত্ররা কিন্তু ” শাখের করাত”। আসতেও কাটে আমার যাইতেও কাটে। আজ একদল এক মুরুব্বীকে আসমানে উঠাচ্ছে। কদিন পরে ওরাই আবার এই মুরুব্বীকে ধরাশায়ী করবে।
আপনি আজ ছাত্রদের অন্যের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছেন? দেখবেন, অদুর ভবিষ্যতে ঐ ছাত্র আপনার বিপক্ষে চলে যাবে। আপনি যে তাকে শিখিয়েছেন,সেটা আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে। আমাদের খ্যাতিমান আলেম- উলামা এবং মুরুব্বীদের শানে যা কিছু বলা হচ্ছে, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, কোনটার পক্ষে আমি নই।তীব্র নিন্দা জানাই।অনেকে বেফাক মহাসচিবের পদত্যাগ চাচ্ছেন, সেটার পক্ষেও আমি নই।
বেফাকের কে মহাসচিব হবে বা হবে না, সেটা বলার আপনি আমি কে? তার জন্য মুরুব্বীগণ আছেন।দেশের আলেম সমাজ রয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নিবেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঠিক নয়।
এরকম নানান সমস্যায় জর্জরিত আমাদের কওমীর সন্তানেরা। বিশেষ করে মুরুব্বীদের একে অপরের ইখতেলাফ বা মতানৈক্য কেন্দ্র করে আমরা ছাত্রদের ব্যবহার করছি। ছাত্রদের উস্কে দিচ্ছি অন্য মুরুব্বীদের বিরুদ্ধে। হেনেস্তা করছি আমার মতের খেলাফ বিপক্ষ আলেমকে। এভাবে ছাত্রদের বেয়াদবি হাতে- কলমে আমরা শিক্ষা দিচ্ছি। ভাল মেধাবী ছাত্রগুলো বেয়াদবের তকমা লেগে যাচ্ছে। তাদের দেখাদেখি নষ্ট হচ্ছে বাকি অন্যগুলো।
এজন্য নিজের স্বার্থ- সিদ্ধি রক্ষার জন্য, নিজের মত-পথ প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্রদের ব্যবহার করা যাবে না। ইখতেলাফ হলে মুরুব্বীগণ নিজেরাই ফায়সালা করুন। সেখানে ছাত্রদের কেন ব্যবহার করবেন? রাজনীতিতে কেন ছাত্রদের ডেকে নিবেন? মাসয়ালাগত ইখতেলাফে র কারণে কেন অন্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদের উস্কে দিবেন?
আসুন! এসব গর্হিত কাজ বর্জন করি। ছাত্রদের আদব- কায়দা বজায় থাকুক সেই প্রচেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সহী বুঝ দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রবন্ধিক ও কওমি মাদরাসার উস্তাদ


