ফিরে দেখা লালসালু এবং নোয়াখালী

ফিরে দেখা লালসালু এবং নোয়াখালী

ফিরে দেখা লালসালু এবং নোয়াখালী

আশরাফ উদ্দীন রায়হান : অসামান্য প্রতিভাধর লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর লালসালু উপন্যাসে তৎকালীন সমাজবাস্তবতাকে তোলে ধরেছেন স্বভাবগত মুনশিয়ানায়। ছেলেবেলায় মা-হারানো ওয়ালীউল্লাহ ধর্মীয় কপটচারিতা আর ভণ্ডামিকে খড়্গহস্ত করেছেন লক্ষ্যভ্রষ্টহীনভাবে। ধর্মের নামে অধর্ম তথা ধর্মব্যবসাকে তিনি তুলোধোনো করেছেন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক শব্দচয়নে। প্রশস্তজমিনে বুনেছেন একের পর এক কাহিনি।

তাই লালসালু উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদের প্রতি পাঠকের ঘৃণার উদ্রেক হয় সহজাতভাবেই। বলাবাহুল্য ধর্মের আসল চর্চা নোয়াখালীতেই হয়ে থাকে অধিক। বাংলাদেশের বর্তমান ঢাউস ঢাউস উলামা-বুযুর্গই নন কেবল, বৃটিশ আমলেও এই নোয়াখালী ছিল ইতিহাস-স্বীকৃত বহু অলি-আল্লাহর জন্মভূমি।

কাকতালীয়ভাবেই কি-না কে জানে, লালসালু উপন্যাসের মজিদকেও নোয়াখালীর লোক বলে দেখানো হয়েছে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে লেখা লালসালু উপন্যাসের তদানীন্তন প্রেক্ষাপটে দেখা যায় নোয়াখালী ছিল দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত একটি জনপদ। খাদ্যাভাবে মানুষ ছিল বিকারগ্রস্ত। যেদিকেই চোখ যায়, সেদিকেই ছুটেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ধর্মকে পুঁজি বানিয়ে জীবনধারণের কসরত করেছেন। মজিদ ছিল ঠিক এ কাতারেরই।

ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের অদূরেই সে তার আস্তানা গাঁড়ে। এলাকার সহজ-সরল মানুষের সরল ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আস্তে-ধীরে জমজমাট করে তোলে তার মাজারব্যবসাকে। দুরভিসন্ধি পরিপক্ক হয় মাজারটি ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ায়।

আমরা এক চিল্লার সফরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকায় গিয়েছিলাম। মজার আমাদের জামাতে একজন সাথী ছিলেন নোয়াখালীর। সোনাইমুড়ি উপজেলার কাঁঠালিয়া পৌরসভায় তাঁর বাড়ি। জামাতের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি তিনি। নাম : হাজী আবদুল মান্নান। বয়স পঁচাশি। আমরা তাকে ‘দাদুভাই’ বলে ডাকতাম। তিনিও আমাদেরকে পৌত্রস্নেহে দেখেছেন। আমি নিবিড়ভাবে তাঁকে লক্ষ করেছি।
স্বাভাবিকভাবে এরকম বয়সের মানুষ খুব একটা ‘স্বাভাবিক’ থাকেন না। তবু আমি তাঁকে স্টাডি করেছি একনিষ্ঠভাবে। শুনেছি তাঁর জীবনের গল্প। যৌবনে অভাব-দারিদ্র্যে পার করেছেন সময়। খুলনা ও সুনামগঞ্জে মিলে কাজ করেছেন। বিয়ের পর শ্রমিক হয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন লেবানন। সেখান থেকে ফিরে এসে সৌদি আরব। সৌদি আরবে থাকার দশবছর সময়ই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্বচ্ছলতা আসে সংসারে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান এভাবেই।

পাঁচজন ছেলের সবাই থাকে বিদেশে- ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন আর দক্ষিণ আফ্রিকায়। বাড়িতে নির্মাণ করেছেন মসজিদ-মাদরাসা। এখনও নিজেই এসবের দেখভাল করেন। অনেক সময় ব্যয়ভারের অধিকাংশই বহন করতে হয় তাঁকে। তার স্ত্রীও আছেন বহাল তবিয়তে। তাঁর ভাষায়, আঁর বিবিরে আঁই কলুম : “বিবি! আঁই কাকরাইল যাই, তুই ফড়ি থাক্, ক্যান?” বিবি কইলো : “আনহে এখন চলি যাইবেন, আনহেরে দেখাশুনা করবো কেগ গা?”

প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন দাদুভাইকে অত্যন্ত নেক মানুষ হিসেবেই পেয়েছিলাম আমরা। জামাতের আরেক সাথী ক্যাম্পাসের বড়ভাই সুদর্শন মুর্শেদ ভাইকে তিনি “মাওলানা সাব” বলে ডাকতেন
আর আমাকে বলতেন “আশরাফ আলী থানভী”। এতে সবাই খুব মজাও পেতাম। তাহাজ্জুদের সময় আগে আগে ওঠে যেতেন তিনি। কয়েক রাকাত নামাজ পড়ে কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল বনে যেতেন অবলীলায়।

বিশেষ করে দাদুভাইকে এলাকার মুরুব্বিদের সাথে ভাব জমাতে সিদ্ধহস্ত দেখেছি। বয়ানে বসলে সবাইকে কুপোকাত করে দিতেন। তাঁর আঞ্চলিক ভাষার ঈমানী কথা এলাকার লোকজন তন্ময় হয়ে শুনতো। আমরা উঠতি বয়সের এরাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাদুভাইয়ের কথাগুলো শুনেছি। দয়ার্দ্রচিত্তের এই মানুষটি মুনাজাত ধরেই হাউমাউ করে কেঁদে দিতেন। দিল নরম হয়ে আসতো আমাদেরও।
হালুয়াঘাটের শাকুয়াই ইউনিয়নের চরপাড়ায় ছিল আমাদের দ্বিতীয় রুখ। মজার ব্যাপার হলো, গারো পাহাড় সেখান থেকে বেশি দূর নয়। যাহোক, সেখানে একটি মাদরাসা। প্রত্যন্ত গ্রামের মাদরাসা যাকে বলে। মাদরাসার আর্থিক অবস্থার দৈন অবস্থা দাদুভাইকে পীড়িত করলো। মোটামুটি অঙ্কের হাদিয়াও পেশ করেছিলেন। বিকাশের নম্বরও নিয়েছিলেন মুহতামিম সাহেবের কাছ থেকে। বাড়িতে গিয়ে আরও টাকা পাঠাবেন বলে।

লালসালুর প্রেক্ষাপটের সত্তর বছর পরে সৈয়দ ওয়ালীওল্লাহর রচিত কাহিনিগাথা আজ বিপরীত প্রমাণিত হয়েছে। নোয়াখালীর মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছে। ঔদার্য এসেছে তাদের স্বভাবে-চরিত্রে। ময়মনসিংহের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতাবোধও বজায় রেখেছে, লালসালুতে যদি সত্যের ছিটেফোঁটাও থেকে থাকে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *