ফেদায়ে মিল্লাতের যোগ্য খলিফা আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ. যখন ফরিদপুর সফর করেছিলেন, সে সময়ে কাছে বসে শায়েখের অনেক বিষয় লক্ষ্য করেছিলাম। সে সব স্মৃতিগুলো এখনো ভুলতে পারি না। বারবার মনে পড়ে সেই দৃশ্যগুলো।
আর সেটাই ছিল ফেদায়ে মিল্লাতের ফরিদপুরের শেষ সফর। এর পরে আর কোনদিন ফরিদপুরে আসা হয়নি তাঁর।
ফরিদপুর সফর শেষ করে শায়েখের গাড়ির বহরের সাথে সাথে ঢাকা যাচ্ছিলাম, আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, ফেদায়ে মিল্লাতের একজন খাস ভক্ত, খুলনা মাদানীনগর মাদ্রাসার মোহতামিম, মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী সাহেব বলেছিলেন, আমিন ভাই, আজ ফেদায়ে মিল্লাতের গাড়ির পিছনে পিছনে আমরা ছুটে চলেছি, একটা সময় আসবে, যখন তিনি থাকবেন না, এই স্মৃতিগুলো বড্ড পীড়া দিবে আমাদের। তখন বুঝে আসবে, কি নেয়ামত আমরা হারিয়েছি।
সত্যি সত্যি ইমদাদুল্লাহ কাসেমী সাহেবের সেই কথা বারবার স্মরণ হয়, সাইয়্যেদ আসআদ মাদানীর সেই স্মৃতিময় সফর আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় সব কিছু।
ফেদায়ে মিল্লাতের একজন খাস খলিফা হলেন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। তাঁকেও সেই সফরে অনেক কাছে থেকে দেখে ছিলাম আমরা।
ফরীদ সাহেব যে একজন প্রতিভাধর আলেম, সেটাতো অনেক আগে থেকেই আমরা জানতাম। তাঁর ইলম, আমল, দক্ষতা, সব কিছুর ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলাম পুর্বের থেকে। তারপরেও সেদিন আরো অনেক কিছু সরেজমিনে দেখে ফরীদ সাহেবের প্রতি ভক্তি- ভালবাসা বেড়ে গিয়ে ছিল অনেক গুণ।
সেই ২০০০ সালের কথা। ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ. আমাদের ফরিদপুর সফরে আসলেন। হযরতের আগমন উপলক্ষে সেদিন বহু উলামায়ে কেরামের সমাবেশ ঘটেছিল ফরিদপুরে। ঢাকা সহ দেশের অনেক শীর্ষ স্থানীয় উলামায়ে কেরামের সেদিন আমাদের ফরিদপুরে উপস্থিত হয়ে ছিলেন।
হযরত আসআদ মাদানী ( রহঃ) সে সময়ে সড়ক পথে যশোর থেকে ফরিদপুরে সফর করেছিলেন। সফরে অনেক বড় গাড়ীর বহর ছিল। সব গাড়ীতেই ছিল আলেম উলামায়ে ভরপুর। আবার অনেক ওলামায়ে কেরাম ঢাকা থেকে সরাসরি ফরিদপুর এসেছিলেন হযরত মাদানী সাহেবের সাথে সাক্ষাতের জন্য।
হযরতের গাড়ি ফরিদপুর আসার অনেক পূর্বেই তুমুল আকারে ঝড়- বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। যার কারণে গাড়ির বহর হয়ে গিয়ে ছিল এলো -মেলো। কেহ হযরত মাদানীর গাড়ির সঙ্গে ফরিদপুরে পৌঁছাতে পারলেন না।
ওদিকে যারা ঢাকা থেকে মাদানী সাহেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য ফরিদপুর এসে ছিলেন, তারাও কেহ মাদানী সাহেবের আগে পৌছাতে পারলেন না।
মোটকথা, হযরত মাদানী সবার আগে ফরিদপুরের শামসুল উলুম মাদ্রাসায় পৌঁছালেন।
মাদানী সাহেব পৌঁছানোর পর একেক করে আলেমদের গাড়ী আসা শুরু হল। সবাই এসে আসআদ মাদানী সাহেবের সাথে দেখা করতে লাগলেন। হযরত মাদানী রহ. উর্দুতে তাদের কে প্রশ্ন করতে ছিলেন, ‘দের কিঁউ’ দেরী কেন? সবাই উর্দুতে জওয়াব দিতে লাগলেন। কিন্তু হযরত মাদানী তাদের জওয়াবে লুকমা দিলেন ( উর্দু ভাষাগত ভুল ধরলেন)। এভাবে যেই আসে হযরত তাদের কে প্রশ্ন করেন, আর সবাই যে উত্তর দেয় সেটা হযরতের মনঃপুত হয় না। সবার উর্দু বলার মধ্যে ভুল ধরা পড়ে।
সর্ব শেষে সেদিন এসেছিলেন, আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব। অত্যান্ত বিনয়ের সাথে এসে হযরতের সামনে বসলেন। হযরত মাদানী সেই একই প্রশ্ন ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব কে করলেন। ফরীদ সাহেব হুজুর সুন্দরভাবে তার জওয়াব দিলেন। এবার আর কোন লোকমা নয়। ফরিদ সাহেবের উত্তর ছিল নির্ভুল। মাদানী সাহেবের চেহারা যেন আলোকিত হয়ে উঠল।
সেদিন আমরা বহু মানুষ সেখানে বসা ছিলাম।সব ওলামায়ে কেরাম।অনেকেই বলতে লাগলেন। মাওলানা ফরীদ সাহেব আসলে বে-মেছাল ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাথে কারো তুলনা হয় না।
হযরত কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ, রহ যিনি একজন যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন। তার প্রিয় শাগরেদ হলেন, আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। কাজি সাহেব( রহঃ) সারা জীবনই বলে গেছেন, মাওলানা ফরিদ আমার উস্তাদ তুল্য ছাত্র।
একজন উস্তাদের এমন সার্টিফিকেট কল্পনা করা যায় না।
আসলে ব্যতিক্রম ধর্মী এক মেধার অধিকারী আল্লামা মাসঊদ।আকাবির আসলাফের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। আপোসহীন বাতিলের ব্যাপারে।
ফরীদ সাহেবের ইলম, আমল সব কিছু ঈর্ষনীয় পর্যায়ের। কত যে ঝড়- ঝঞ্জা গেল তাঁর উপর দিয়ে, হিংসুকদের হিংসা, দুশমুনদের দুশমুনি, কত মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা, কিন্তু তিনি এমন সবরমান্দ একজন মানুষ, সব কিছুকে উপেক্ষা করে হক- হক্কানিয়্যাতের উপর অটল- অবিচল।
বর্তমানে উলামায়ে দেওবন্দের তরজুমান। তাঁর চলার পরিসীমা বিশ্বব্যাপী। ফেদায়ে মিল্লাতের নেক দোয়ায় যেন তিনি আরো অগ্রসর হচ্ছেন সম্মুখে। দিনে দিনে তাঁর ইজ্জত, মাকাম বেড়েই চলেছে।
আসলেই তিনি ফেদায়ে মিল্লাতের সুযোগ্য খলিফা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই মহান ব্যক্তির মঙ্গল কামনা করি।আল্লাহর নিকট দুআ করি, আল্লাহ তাঁকে নেক হায়াত দান করেন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


