বদরুদ্দীন উমর আর নেই

বদরুদ্দীন উমর আর নেই

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বিশিষ্ট লেখক-গবেষক, প্রবীণ রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর আর নেই। গতকাল সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। বদরুদ্দীন উমর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। ছোট মেয়ে সারা আকতারই তার দেখাশোনা করতেন। তার লন্ডন প্রবাসী বড় মেয়ে আজ দেশে আসবেন।

প্রায় এক মাস ধরে বদরুদ্দীন উমর অসুস্থ ছিলেন। তাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে একাধিকবার। গতকাল সকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আবার হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বদরুদ্দীন উমরের লাশ আজ বেলা ১১টার দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুরে জানাজার পর জুরাইনে তার মা-বাবার কবরে দাফন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন বদরুদ্দীন উমর। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি। এক সময় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। ২০০৩ সালে তিনি জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল নামে একটি সংগঠন গড়ে সভাপতির দায়িত্ব নেন।

মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, লেখক ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরের জন্ম ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। তার বাবা আবুল হাশিম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৫০ সালে তারা সপরিবারে ভারত থেকে বাংলাদেশে চলে আসেন।

১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক ও ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্নের পর ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিপিই ডিগ্রি অর্জন করেন।

বদরুদ্দীন উমরের রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে চিন্তা, আগ্রহ বা দায়বোধ তৈরি হয় মূলত পারিববারিক সূত্রে। তার বাবা মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিম ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত।

পঞ্চাশের দশকে তিনি ঢাকায় ‘খেলাফত-ই-রব্বানী পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ইসলামী আদর্শ বাস্তবে রূপায়িত করাই ছিল এ দলের আদর্শ।

বদরুদ্দীন উমর লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক। ১৯৬১ সালে দেশে ফিরে আসার পর ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। গভর্নর মোনায়েম খানের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে ১৯৬৮ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতি ও লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। তার লেখা ‘পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ ভাষা আন্দোলনের ওপর প্রথম গবেষণাগ্রন্থ।

বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, শিক্ষা উপদেষ্টা, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী তামিম ও অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিনসহ অনেকে।

শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবন শুরু করে পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়া বদরুদ্দীন উমর ছিলেন মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতির সংগ্রামের এক উজ্জ্বল প্রতীক। ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা, গবেষণা, ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শনের প্রতি তার অবিচল নিষ্ঠা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকারের পরিবর্তনের জন্য শুরু থেকেই গণ-অভ্যুত্থানের কথা বলেছেন এবং জুলাই আন্দোলনকে উপমহাদেশের একটি অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর শুধু একজন তাত্ত্বিক ছিলেন না, বরং একজন সংগ্রামীও ছিলেন, যিনি আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশীল মানুষের জন্য তার লেখা এবং জীবনদর্শন এক অনন্য পথনির্দেশ হিসেবে কাজ করবে। শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বদরুদ্দীন উমরের শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন এক শোকবার্তায় মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনীতির পথিকৃৎ, লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমরের জীবনাবসানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও আমি গভীরভাবে মর্মাহত। স্বাধীনচেতা, নির্ভীক কণ্ঠস্বরের এই বুদ্ধিজীবীর এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া জনমনে হতাশার সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা এবং সব স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মরহুম বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা ও লেখনীসহ সক্রিয় তৎপরতা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Related Articles