বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হোন : প্রধানমন্ত্রী

বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হোন : প্রধানমন্ত্রী

বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হোন : প্রধানমন্ত্রী

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। এ উপলক্ষে ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আমরা সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ঘরে আলো জ্বালাব। এরই মধ্যে আমরা প্রায় ৯৭ ভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আশা করি, ২০২১ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে পারব। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ব্যবহারে দেশবাসীকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অনেক বেশি ভতুর্কি দিতে হচ্ছে আমাদের। কিন্তু এই ভর্তুকি সবসময় দেওয়া সম্ভব না। এটাও সবাইকে মাথায় রাখতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে ৩১টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন, ২টি পাওয়ার প্ল্যান্ট, ১১টি গ্রিড সাব-স্টেশন এবং ৬টি নতুন সঞ্চালন লাইন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এই ৩১টি উপজেলা উদ্বোধনের পর মোট ২৮৮টি উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতাভুক্ত হল। এর ফলে দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধাভোগীর অন্তর্ভুক্ত হলো।

ভিডিও কনফারেন্সে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জেলা প্রশাসক কার্যালয় সংযুক্ত ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছি না, পাশাপাশি সঞ্চালন ব্যবস্থাও করে যাচ্ছি। সেইসঙ্গে আমরা পল্লী বিদ্যুৎকেও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে দিয়েছি। তারা নিজেরাই এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, সঞ্চালনও করতে পারে, এমনকি বিদ্যুৎও দিতে পারে। সেই সুবিধাটাও আমরা তাদের জন্য দিয়ে দিয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এইভাবে আমরা বহুমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কিন্তু অনেক বেশি হয়। বর্তমানে আমরা যেমন এলএনজি আমদানি করছি। কাজেই এত বেশি খরচের পরও আমরা এখনও ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছি। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ যা হয়, তার চেয়ে কম পয়সার গ্রাহককে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি। সেক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছে অনুরোধ করব- আপনারা বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই মিতব্যয়ী হবেন, সাশ্রয়ী হবেন। অহেতুক বিদ্যুৎ অপচয় করবেন না।’

তিনি বলেন, ‘অহেতুক বিদ্যুৎ ব্যবহার না করা আপনাদের জন্যও লাভ। বিলটা কম উঠবে। তাই নিজেদের কথা চিন্তা করে, বিল যাতে কম ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রেখে সবাই বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন। এটা আমার বিশেষভাবে অনুরোধ। কারণ আমাদের অনেক বেশি ভতুর্কি দিতে হচ্ছে। কিন্তু এই ভর্তুকি সবসময় দেওয়া সম্ভব না। এটাও সবাইকে মাথায় রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যেহেতু আমরা উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি করছি। সেজন্য মানুষের অসুবিধাগুলো আমরা দূর করতে চাচ্ছি। মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা যত বেশি আসবে, তখন আমরা যেটা চাইব মানুষ দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু সেই সক্ষমতটা আগে আমাদের তৈরি করে দিতে হবে। তার জন্য আমি এই সুযোগ সুবিধাগুলো করে দিচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘তিনি তার সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন বাংলার মানুষের জন্য। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা এবং যারা ক্ষুধা দারিদ্র্যে জর্জরিত ছিল, শোষিত-বঞ্চিত ছিল, সেই শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের একটা সুন্দর জীবন উপহার দেবে- এটাই ছিল জাতির পিতার একমাত্র লক্ষ্য। সেজন্য নিজের জীবনটাকে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন।’

স্বাধীনতার পর জাতির পিতার নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শুধু একটা প্রত্যয় নিয়ে, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, যে লক্ষ্য নিয়ে জাতির পিতা স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তার সেই স্বপ্ন পূরণ করা, বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, বাংলার মানুষকে একটি সুন্দর জীবন উপহার দেওয়া এবং স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ছয়টি বছর আমাদের বিদেশে রিফিজিউ হিসেবে থাকতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ যখন আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে তখন ফিরে আসার সুযোগ পাই। তখন জোর করে দেশে ফিরে আসি। তারপর থেকেই এই প্রচেষ্টা; যে স্বপ্ন আমার বাবা দেখে গেছেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর শুরু হয় হত্যা ও ক্যু-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। মিলিটারি ডিকটেটররা ‘মার্শাল ল’ জারি করে এদেশের শাসনভার হাতে নেয়। তারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সেই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করবার জন্য স্বজনপ্রীতি, তোষামোদী, খোষামোদী ও দুর্নীতিকে স্থায়ী রূপ দিয়ে যায়। দেশের উন্নয়ন না করলেও তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়। কিছু লোককে তারা অর্থ ও সম্পদশালী করে দেয়। এভাবেই তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু দেশের মানুষ শোষিত-বঞ্চিতই থেকে যায়। এটাই হচ্ছে সব থেকে দুভার্গ্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮১ সালে আমি দেশে ফিরে এসে সমগ্র বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরেছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছি। আমি দেখেছি মানুষের হাহাকার, মানুষের দুঃখ কষ্ট। মানুষের ক্ষুধার জ্বালা, মানুষের কঙ্কালসার দেহ। রোগে ধুকে ধুকে মরা। দুর্ভিক্ষে দিনের পর দিন মানুষের মৃত্যু। আমি বাংলাদেশ ঘুরেছি এবং আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকারে আসার পর থেকে আমাদের প্রচেষ্টা দেশের উন্নয়ন। উন্নয়ন শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক না, উন্নয়নটা যেন সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যে মানুষগুলো থাকে তারা যেন নিজেদেরকে কখনও অবহেলিত মনে না করে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের সকল পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং আমরা তা বাস্তবায়ন শুরু করি। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ। বলতে গেলে বাংলাদেশ অন্ধকারই ছিল; দিনের পর দিন বিদ্যুৎই পাওয়া যেত না। যারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইন্ড্রাস্ট্রি চালাত তাদেরকে জেনারেটর কিনে চালাতে হতো। এভাবে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই দুর্বিসহ অবস্থা ছিল।’

সরকার প্রধান বলেন, ‘সার্বিক উন্নয়নের জন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন হয় রাস্তাঘাট বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। এছাড়া আরেক দিকে বিদ্যুতের ব্যবস্থা। যদি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যায়, স্বাভাবিকভাবে সেই সব এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হতে পারে। শুধু ঘরে আলো জ্বেলে ঘরে বসা থাকা না, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা শিল্প গড়ে তোলা অথবা কৃষি খামার গড়ে তোলা বা যেকোনো কাজের জন্য বিদ্যুৎ একান্ত অপরিহার্য। সেজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে সঞ্চালন বৃদ্ধি ও মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে। তার শুভ ফল আজ মানুষ পাচ্ছে।’
১৯৯৬ থেকে শুরু করে বর্তমানে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা আমাদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন। আমরা এই পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০২১ সালের মধ্য ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করব। এখন রয়েছে ২৩ হাজার ৫৪৮ মেগাওয়াট। আর ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট রয়েছে। ২০৪১ সাল অর্থ্যাৎ আমরা যে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা করেছি, সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছি। সেখানে যাতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান হয় তার জন্য আমাদের বিদ্যুৎ দরকার। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। এই ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যবহার যত বেশি বাড়বে, বিদ্যুতের চাহিদাও ততবেশি বৃদ্ধি পাবে। সেদিকে লক্ষ্য রেখে এবং সার্বিকভাবে যাতে অর্থনৈতিক উন্নতি হয় অর্থাৎ উন্নতিটা শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক না, শহর কেন্দ্রিক না, আমরা প্রত্যেকটা গ্রামকে শহরে রূপান্তর করতে চাই।’ এ সময় তিনি নাগরিক সুবিধা গ্রামের মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

এ সময় বিদ্যু বিভাগের সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। এদিন গণভবন প্রান্তে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিব সুলতান আহমেদ সূচনা বক্তব্য দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর উদ্বোধন ঘোষণার পর দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *