বিনয় ও নম্রতা দ্বীনি রুচির প্রকাশ ঘটায়

বিনয় ও নম্রতা দ্বীনি রুচির প্রকাশ ঘটায়

বিনয় ও নম্রতা দ্বীনি রুচির প্রকাশ ঘটায়

ফয়জুল্লাহ আমান :: দিল্লির লালকুয়া মসজিদের ইমাম ছিলেন কট্টর বিদআতি আলেম। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা কাসিম নানুতুবি রহ.-এর প্রতি উক্ত ইমাম ছিলেন চরম বিদ্বিষ্ট। নানুতুবি রহ.-কে দিন রাত কাফের ফতোয়া দিতেন। একবার মাওলানা নানুতুবি দিল্লিতে আসেন। হযরতের শিষ্যরা হযরতের সাথেই ছিলেন। একদিন রাতে মাওলানা আহমাদ হাসান আমরুহি শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দি ও অন্য সাথিদের বললেন, চলো, কাল ফজর নামাজটা লালকুয়ায় পড়ি। লালকুয়া মসজিদের ইমামের তেলাওয়াত খুব সুন্দর।

শাইখুল হিন্দ খুব ক্ষোভের সাথে বললেন, জানো না, সে আমাদের উস্তাদকে রাত দিন কাফের বলে? তুমি তার পেছনে নামাজ পড়তে চাচ্ছ? তোমার এ কথা বলতে লজ্জা হলো না?

এই কথোপকথন কিভাবে যেন মাওলানা নানুতুবির কানে চলে যায়। তিনি তাহাজ্জুদের সময় উঠে সবাইকে বলেন, চলো, আজকের ফজর আমরা লালকুয়ায় আদায় করব। শিষ্যদের সহ তিনি লালকুয়ায় হাজির হন। নামাজ শেষে ইমাম সাহেব নতুন আগন্তুকদের দেখে কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কারা?

মাওলানা কাসেম নানুতুবি বলেন, আমি কাসেম নানুতুবি আর ইনি মাওলানা আহমাদ হাসান আমরুহি মুহাদ্দিস আমার ছাত্র। এরা সবাই আমার শিষ্য। আপনার পিছনে ফজর আদায় করতে আসলাম।
ইমাম সাহেব খুবই প্রভাবিত হন। তিনি বলেন, কিন্তু আপনার সম্পর্কে তো আমার খুবই খারাপ ধারণা ছিল, শুনেছি আপনি নবীজীর সাথে বেয়াদবি করেন আর এজন্য আমি আপনাকে কাফের ফতোয়া দিয়েছি। অথচ আপনি আমার পেছনে নামাজ পড়তে আসলেন? যে আপনাকে কাফের বলে তার পেছনে কী করে নামাজ পড়েন?

কাসেম নানুতুবি রহ. বললেন, জি জনাব, আপনি যে আমাকে কাফের বলেছেন এজন্য আপনার প্রতি আমার ভক্তি আরও বেড়ে গেছে। আপনার ইজ্জত আমার অন্তরে বসে গেছে। কারণ নবীজীর মহব্বতেই আপনি আমাকে কাফের বলেছেন। আপনি জানতে পেরেছেন আমি রাসূল সা.-এর শানে গোস্তাখি করেছি। আপনার হুব্বে রাসূল আপনাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করেছে। এটা আপনার মজবুত ইমানের আলামত। কিন্তু আমার অনুযোগ হচ্ছে, আপনি বিষয়টি তাহকিক করে নেননি। আমার সাথে আপনার কখনও দেখা হয়নি। আপনি আমার সাথে কথা না বলে ভালো করে যাচাই না করেই আমাকে কাফের ফতোয়া দিলেন। জেনে রাখবেন, আমিও প্রিয় নবীজীর সাথে সামান্য বেয়াদবি করলে তাকে ইসলাম থেকে খারিজ মনে করি। একজন মুসলিম হয়ে কিকরে নবীজীর শানে গোস্তাখি করতে পারে কেউ?

এই দীর্ঘ ভূমিকার পর মাওলানা নানুতুবি বললেন, এখনও যদি আমার সম্পর্কে আপনার সংশয় থাকে তাহলে এই যে আপনার সামনেই আমি কালেমা পড়ছি। দেখুন আমি মুসলমান। আমি প্রিয় নবীজীর একজন সাধারণ উম্মত। একথা শুনে ইমাম সাহেব মাওলানা নানুতুবির পায়ে পড়ে গেলেন। নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

আরেকটি ঘটনা শুনুন। কারি তৈয়ব রহ. বলেন, মাওলানা আশরাফ আলি থানভী রহ.কে দেখেছি মাওলানা আহমাদ রেজাখান বেরেলভির নাম নিলে সব সময় মাওলানা বলতেন। মাওলানা ছাড়া তার নাম উচ্চারণ করতেন না। একবার কেউ তার মজলিসে আহমাদ রেজা খান নাম উচ্চারণ করল। ‘মাওলানা’ লকব ছাড়াই এমন নাম নিল। সাথে সাথে মাওলানা থানভি বললেন, তুমি মাওলানার নাম নিলে; মাওলানা লকব কেন লাগালে না? তার সাথে আমার মতানৈক্য আছে কিন্তু তিনি তো একজন আলেম? তার নাম নেওয়ার সময় অবশ্যই আদবের রেয়ায়েত করা উচিত ছিল তোমার।

এই মাওলানা আহমাদ রেজাখান বেরেলভী শুধু আশরাফ আলি থানভি নন, তাঁর সব উস্তাদকে কাফের ফতোয়া দিয়েছিলেন। জালিয়াতি করে হারামাইন থেকে দেওবন্দি মাশায়েখদের বিরুদ্ধে কুফুরির ফতোয়া এনেছিলেন। হুসামুল হারামাইন সহ অসংখ্য পুস্তক রচনা করেছেন। এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারেও মাওলানা থানভীর এমন সহিষ্ণুতা ও আদব। ভাবা যায়?

মাওলানা নানুতুবি ও মাওলানা থানুভির এ ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। এটাই আমাদের উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। সম্পূর্ণ ভিন্নমতের আলেমকেও তারা শ্রদ্ধা করতে জানেন। সবাইকে কাছে টানতে পারেন। চরম শত্রুকেও ইযযত করা শেখাতে পারেন। এভাবেই তো উম্মতের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। জোড়ানোর কাজ করেছেন উলামায়ে দেওবন্দ।

আজ আমরা চেতনার নামে কত বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে চলেছি। চেতনাবাজি করে নিজেদের পাক্কা মুসর্লিম বানাতে চাচ্ছি। অথচ বোঝা উচিত, চেতনা বাইরে উগ্রে দেবার বস্তু নয়। ভেতরে ধারণ করতে হয় উন্নত চিন্তা। বাইরে সুন্দর আখলাকের প্রকাশ ঘটাতে হয়। যেটা যেখানে রাখার সেটাকে সেখানে রাখাই নিয়ম। একটার স্থলে আরেকটা রাখলে তা ভালো হয় না।

মানব শরীরের যত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সব থাকে দৃষ্টির আড়ালে। বৃক্ক, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড, যকৃত আরও কত যন্ত্রাংশ। রক্তবহন তন্ত্র, শ্বসন তন্ত্র, রেচনতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও অসংখ্য তন্তু অভ্যন্তরে থেকেই তাদের কাজ করে যায়। বাইরে প্রকাশিত হয়ে পড়ে না। এসব অভ্যন্তরীণ অঙ্গই পরিচালিত করে পুরো মানবদেহ। সবচেয়ে সূক্ষ্ম হচ্ছে অন্তর। সেটা তো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় খুঁজেই পাওয়া যায় না। স্নায়ুগুলোও কী সূক্ষ্মভাবে কাজ করে তা আমরা সবাই উপলব্ধি করি।

কিছু বিষয় হজম করা শিখতে হয়। পেটের সব উগরে দিলে তাকে ডায়েরিয়া বলে। কিছু খাবার উদরে রাখতে হবে তা না হলে আপনি চলতে পারবেন না। চেতনা হচ্ছে ভেতরের বিষয়। বাইরে বের করার বিষয় নয়। কিডনি, হার্ড, লিভার, অগ্নাশয়, কোলন, বৃহদন্ত প্রভৃতি তন্তু, তন্ত্র, গ্রন্থি ও প্রয়োজনীয় হরমোন বাইরে নিয়ে ঘুরে বেড়ালে স্বাস্থ ঠিক থাকে না। পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হতে হয়। ধরে নিচ্ছি কিডনি বা হার্ডের মত গুরুত্বপূর্ণ আপনার এসব চেতনা। চেতনা হারিয়ে গেলে জীবনের কোনো মূল্য থাকে না। তাই সুদৃঢ়ভাবে চেতনা ধারণ করুন।

দয়া করে বাইরে নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন না। ভেতরে রাখলে যে চেতনা নষ্ট হয়ে যাবে এমন নয়। বরং বেশি বের করলে তাতে পঁচন ধরতে পারে। একেই বলে বিনয়। এই বিনয়ের কারণেই পরিবেশের ভারসাম্য থাকে। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় অস্বাভাবিক আচরণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিনয়ের চর্চা। সবাই যার যার পেটের ময়লা আবর্জনা সবার সামনে বমি করে দিয়েই শয়তানি সুখ অনুভব করছে। আহা এসব মুর্খতা যে তাদের ব্যক্তিত্ব বিনষ্ট করে দিচ্ছে তা তারা বুঝতেই পারছে না। সমাজের মানুষগুলো সব ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। এমন ব্যক্তিত্বহারা লোক ইতিবাচক কোনো কাজের ক্ষমতা রাখে না। কেবল পারে অন্যকে খাটো করতে। অন্যের ত্রুটি খুঁজে বের করাকেই তারা মহত্ব মনে করে। আহা কী দুঃসময়ে আছি আমরা। কী মন্দ পরিস্থিতি অতিক্রম করছি।

আবারও বলছি বিনয়ের অগণিত সুন্দর রূপ আছে। ইসলাম আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়। ভদ্র সভ্য হতে বলে। আর বলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে। সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টাই পারে আপনাকে সুসভ্য বানাতে। তাই আসুন ইসলামের নামে জটিল কুটিল তর্কে সময় নষ্ট না করে ঔদার্যের সবকগুলো মুখস্থ করি। বিদ্বেষের রূপ পরিগ্রহ করে এমন বিতর্ক আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেই। একে অপরকে সম্মান করা শিখি। স্বার্থ চিন্তা ত্যাগ করে নিজের চিন্তার বিপরীত লোকদেরও কাছে টানার চেষ্টা করি।

করোনার এই সময়ে ওয়াজ মাহফিলের আয় নিয়ে দ্বন্দ্বের সুযোগ নেই। কাজেই এসময় তুলনামূলক আমরা একে অপরের আরও কাছে আসতে পারি। শারীরিকভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছি, মানসিক দূরত্ব রাখার প্রয়োজন নেই। মানুষকে মূল্য দিতে শিখুন। মনকে উদার আকাশ বানাতে শিখুন। কূপম-ুকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য উপযুক্ত সময়ে আছি আমরা এই মহামারির দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তগুলোয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়াত করুন। আমীন।

লেখক : খতিব, মুহাদ্দিস ও গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *