বিবৃতির ছোবলে দেশ; একটি মানবিক আবেদন | মুফতী তামীমুল ইসলাম ফরিদী
বিশ্বব্যাপী করোনা সংকটে মসজিদে নামাজের জামাতে মুসল্লির সংখ্যা সীমিত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকার স্বেচ্ছাচারিতামূলক ভাবে চাপিয়ে দেয়নি। দেশের সব ঘরানার শীর্ষস্হানীয় ওলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সরকার ও আলেমদের যৌথ বৈঠকে কুরআন-হাদীস-ইজমা-কিয়াসের ভিত্তিতে উরুফ তথা প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের মতামতের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার৷
হযরত শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী হাফিজাহুল্লাহ উক্ত মিটিংয়ে অসুস্থতার দরুণ উপস্থিত ছিলেন না, তথাপি বিষয়টি কেউ যেন হালকাভাবে না নেয় সেজন্য তিনি গণমাধ্যমে এর স্বপক্ষে বিবৃতি ও প্রদান করেছেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো পাকিস্থানের একটি বিবৃতির উপর ভিত্তিকরে আমাদের দেশে মসজিদ উম্মুক্ত করে দেওয়ার বিবৃতির হিড়িক পড়েছে, অথচ বিবৃতিতে যাদের নাম এসেছে এদের অনেকেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উক্ত মিটিংয়ে উপস্থিত থেকে মতামত প্রদান করে ঐক্যমত ছিলেন। তাহলে ভোল পাল্টে আজ আবার দ্বিমত পোষণ করে জাতির কাছে হাসির খোরাক হওয়ার কী যৌক্তিকতা ?
আমাদের দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী দেশীয় সব ঘরানার শীর্ষস্হানীয় আলেমদের সম্মিলিত ফায়সালা দরকার৷ বিচ্ছিন্নভাবে বিবৃতি এর কোনো সমাধান নয়৷ বরং আমি বলবো এটি স্পষ্ট ফিৎনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
যেকোন বিষয়ে বিবৃতি দেওয়া হতে পারে এটিও একটি অধিকার কিন্তু এইসব বিবৃতি রাজনৈতিক কর্মসুচিতে ফলপ্রসু হয়৷ শরয়ী কোন সমাধান এভাবে বিবৃতি বানিজ্য দিয়ে হয়না। শরীয়তে এর কোন নজির নেই।
পাকিস্তানের ওলামায়ে কেরাম বিশেষ করে জাস্টিজ আল্লামা তাক্বী উসমানী দাঃ বাঃ এর বিবৃতিতে যেসব শর্ত লাগানো হয়েছে তা কি আমাদের দেশের মানুষ মেনে চলতে পারবে?
প্রশ্নগুলো কখনো ভেবেছেন কি? আগে ঠান্ডা মাথায় একটু ভাবুন, বুঝুন, তারপরই না হয় সিদ্ধান্ত নিন!!
উফ! ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। দেশে করোনা সংকট কত ভয়াবহ!! তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে৷ শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভয়াবহ মহামারির আকার ধারণ করেছে। সিলেটে মরহুম ডাক্তার মুঈন এর করোনায় মৃত্যু ,ময়মনসিংহে ডাক্তার দম্পতির করোনায় আক্রান্ত। নরসিংদীর ইমাম সাহেবের করোনায় মৃত্যু । মগবাজার মসজিদের ইমাম সহ অনেক ইমাম-মুয়াজ্জিনের করোনায় আক্রান্ত হওয়া আমাদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবায় যেমন মনোবল হারাচ্ছে তেমনি মানুষের মানসিকতাও ব্যাপক পরিবর্তন সহ ঈমানী দুর্বলতাও দেখা দিয়েছে৷
অথচ নবীয়ে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চির অম্লান বানী : فر من المجذوم فرارك من الاسد -‘কুষ্ঠ রোগী থেকে ঐভাবে পালাও যেমন সিংহ থেকে তোমরা পালিয়ে যাও’।
সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)এর ঈমানের বিবেচনায় তো আমরা অতি তুচ্ছ। অথচ সত্যের মাপকাঠির গুণে গুণান্বিত এই মহান মানুষেরাই ছিলেন এ হাদিসের প্রথম মেছদাক।
এই ভয়াল পরিস্থিতির সময় পরামর্শহীন সবার জন্য মসজিদ উম্মুক্ত করে দেওয়ার বিবৃতি শরিয়তসিদ্ধ কী?
ইরশাদ হচ্ছে : ولا تلقوا بايديكم الى التهلكة -‘তোমরা নিজেদেরকে ধংশের দিকে ঠেলে দিওনা’। এই মহাবাণী তাহলে কোথায় প্রয়োগ করতে হবে?
তাছাড়া যদি সরকারের কাছে এই দাবি করতেই হয় তাহলে দেশের সব ঘরানার শীর্ষস্হানীয় আলেমদের নিয়ে একটি পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতনা?
আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ এখনও আলেম-উলামাদের প্রতি আস্থাশীল৷ এবং দায়িত্বশীলতার আচরণই আশা করে। কাঁদা ছোড়াছুড়ি নয়৷ মসজিদে আজান নামাজ বন্ধ করে দেয়া হয়নি। আযান হচ্ছে মাইকে, সীমিত আকারে জামাতও হচ্ছে, জুমার নামাজ ও হচ্ছে সীমিত আকারে৷ কোন মসজিদ বন্ধ হয়নি। মসজিদ আবাদ আছেই৷ সবকিছুতেই রাজনীতি আর বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা চলেনা৷ চালানো যায়না।
`জাতীয় সংকটে আলেমদের দায়িত্বপূর্ণ মতামত, অবদান ও সহযোগিতা জাতি আশা করে। তাই জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।’
অনেক অপরিপক্করা ব্যাংক, বাজার, গার্মেন্টস বা রাস্তায় মানুষের ভীড়ের সঙ্গে কিয়াস বা তুলনা করে মসজিদ সবার জন্য উম্মুক্ত দেবার কথা বলি। যা গাহরায়ী ফাকাহাত তথা গভীর ইলমের পরিচয় বহন করে না৷ আমাদের দেশ সংকটমুক্ত হলে মসজিদ মাদরাসা আবার স্বাভাবিক হবেই ইনশাআল্লাহ। এতে কোন সন্দেহ নেই । এই সাময়িক সীমিতকরণ বা বাধ্য-বাধকতাতো কোন গোষ্ঠী বা সরকারের কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা অসৎ উদ্যেশ্য নয় বরং সতর্কতা৷
সুতরাং যার যার মতো বিবৃতি নয় প্রয়োজন ওলামায়ে কেরাম ও সরকারের সঙ্গে যৌথ বৈঠক এবং কুরআন-সুন্নাহ-ইজমা-কিয়াসের ভিত্তিতে সব ঘরানার আলেম-উলামাদের যৌথ সিদ্ধান্ত৷ জাতীয় সংকটে আলেমদের দায়িত্বপূর্ণ মতামত, অবদান ও সহযোগিতা জাতি আশা করে। তাই জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইসলাম কেবল আজিমতের (কঠোরতা) কথা বলেনা, প্রয়োজন সাপেক্ষে রূখসাতের (উদারতা) কথাও বলে৷ এমনকি তখন রূখসাতটাই আজিমতের স্হলাভিষিক্ত হয়। উদাহরণ স্বরূপ কছরের নামাজের কথাই বলা যায়। যখন আপনি মুসাফির তখন আপনাকে চার রাকাতকে দু রাকাত ই পড়তে হবে। অন্যথায় আদায় হবেনা।
সুতরাং আসুন, অপরাজনীতি আর বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করে বিবৃতির পেছনে না ছুটে, জাতির কল্যাণে সামগ্রিক পরিস্থিতির অনুকূলে শরিয়তসিদ্ধ একটি ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচেষ্ট হই। মহান আল্লাহ তায়ালাই তাওফীক দানকারী।
পরিশেষে মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা তিনি যেন বিশ্ববাসীকে করোনাভাইরাস সহ সকল সংকট থেকে মুক্ত করে দেন। হজ্ব-ওমরা সহ মসজিদ-মাদরাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করার পরিবেশ তৈরি করে দেন। হে আল্লাহ! আপনার রহমত দ্বারা আমাদের গুনাহগুলো মুছে দিন৷ আমাদেরকে এক ও নেক হওয়ার তৌফিক দান করুন, আমীন।
লেখক: শিক্ষক ও সুবক্তা।


