বিবেকের কাঠগড়ায় এক নবীর ওয়ারিশ

বিবেকের কাঠগড়ায় এক নবীর ওয়ারিশ

বিবেকের কাঠগড়ায় এক নবীর ওয়ারিশ

মুহাম্মাদ আইয়ুব :: সাইকেল যোগে বাড়ি থেকে মসজিদে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে রাস্তার সাথে লাগোয়া এক বাড়িতে কিছু একটা জটলার মতো দেখলাম, যেখান থেকে ভেসে আসছে উলুধ্বনির করুণ সুর। হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ মরে গেছে বুঝতে আর বাকি রইল না। তারপরও আরো নিশ্চিত হতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে থাকা এক কিশোরকে জিজ্ঞেস করলাম, কেউ কি মারা গেছে?
হয় মইরি গেছে।
উত্তর শুনেই নির্বাক হয়ে গেলাম।
উদাস মনে সাইকেল চালাতে লাগলাম ভাবনার বিশাল এক পাহাড় মাথায় নিয়ে। বিবেককে বললাম ও বিবেক!
জুমার বয়ানে অথবা ওয়াজ মাহফিলে করে কিংবা দরসে খুব রয়েসয়ে বলে বেড়াও তুমি নবীর ওয়ারিশ, অথচ তোমার যাতায়াতের রাস্তায় পড়া এই হিন্দু বাড়িটায় এসে কোনদিন এদের খোঁজ খবর নিয়েছ?
আজ যে এই লোকটা তার ফিতরাতের উপর না থেকে মুশরিক হয়ে পরপারে পাড়ি জমাল, এর জন্য কি তুমি কিছুটা হলেও দায়ী নও?

কি দোষ ছিল এ বেচারার যে, সে তোমার তাওহিদ ও ঈমানী দাওয়াত পেল না? সে কি তোমার এ আবশ্যকীয় দাওয়াতের উপযুক্ত ব্যাক্তি ছিল না? কি ভুল ছিল তার যে, সে তোমার কাছ থেকে কালিমার দাওয়াত নিয়ে যেতে পারল না? মহানবী সা. আজ বেঁচে থাকলে তাকে দাওয়াত, মেহনতের মতো মহা মূল্যবান সম্পদ থেকে বঞ্চিত হত?

মক্কার অলিগলিতে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে, ঘাম ঝরিয়ে, রক্তে রঞ্জিত হয়ে, ঘরবাড়ি পরিত্যাগ করে, সহায় সম্পত্তি ফেলে নিরন্তর এক সাধনায় ছুটছেন এক মহামানব। মক্কার রুক্ষ জমিনের রুক্ষ লোকগুলোর শুষ্ক আচরণে অতিষ্ঠ হয়েও হাল না ছেড়ে তাওহিদের শাশ্বত পয়গাম নিয়ে ছুটে গেলেন সুজলা সুফলা তায়েফে, সেখানকার জঘন্য মানুষদের অভিশপ্ত আচরণ সত্ত্বেও উম্মতের কান্ডারী তিমির রাত্রীতেও এক বুক আশা আকাঙ্ক্ষায় ঈমানী দৃঢ়তায় টইটম্বুর হয়ে আবারো ছুটলেন দাওয়াতের ময়দানে। মহানবীর দাওয়াতের অদম্য এ রথ যাত্রাকে মৃত্যু ব্যতীত আর কিছুই থামিয়ে রাখতে পারেনি কিন্তু তুমি? তুমি কেন আচমকা থেমে গেল? বন্ধ করে দিলে দাওয়াত ইলাল্লাহর নূরানী পয়গাম?!

মাত্র ছাব্বিশ বছরের এ নবীন যাত্রায় কতজন মানুষকে তুমি ঈমানের পথে, খোদার রাহে, নবীজীর ২৩ বছরের ঘামকে রক্তের বিনিময়ে দাঁড় করানো দ্বীনে ইসলামের পথে কতজনকে ডেকেছ? আবু তালিব কিংবা আবু জেহেল, নবীজী সা. কতটা আশা নিয়ে তাদের দ্বারে দ্বারে নিজের ইজ্জত সম্মানকে বগলদাবা করে দিন-রাত দাওয়াতের জন্য একাকার করেছেন, তা কি তোমার স্মরণ থেকে বিস্মৃত হয়ে গেছে?

এসব ঘটনা তো তুমি রসিয়ে রসিয়ে ওয়াজ মাহফিলে বয়ান কর কিন্তু আমল কোথায়? তাহলে তোমার জন্ম কি তাহলে শুধুই ওয়াজের জন্য? ওয়াজ করেই কি তোমার নববী ওয়ারাসাতের দায়িত্ব খতম? আহারে ওয়ায়েজ? বড় বিস্ময় লাগছে তোমাকে দেখে যে, তুমি নবীর ওয়ারিশ! আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন যে, হযরত ওমরের সামনে পড়নি, নইলে ধড় থেকে কল্লা হারানোর সমূহ আশংকা ছিল। কি ভেবেছ তুমি, মরে যাওয়া এই হিন্দু লোকটা তোমাকে ছেড়ে দিবে?! আল্লাহর কাঠগড়ায় তোমাকে দাঁড় করাবে না?!

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই তোমাকে সে দাওয়াত না পাওয়ার কারণে সে দিন মালিকের আদালতে দাঁড় করাবে। সে দিন তোমার ইয়া বড় আরবী জুব্বা, তালেবানি পাগড়ি আর পীর ওলীদের বিশাল বড় বড় দানার তসবিহ কিছুই কাজে আসবে না। তাই সাবধান হে অহংকারী মন! ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া এ মিরাসের যথাযথ কদর কর নইলে পস্তাবে! আবারও বলছি পস্তাবে!! কান খাঁড়া করে শোন বলছি, নইলে পস্তাবে!!!

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *