বিশ্ব ইজতেমায় প্রথম বাংলায় আখেরি মোনাজাত

বিশ্ব ইজতেমায় প্রথম বাংলায় আখেরি মোনাজাত

পাথেয় ডেস্ক ● আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো টঙ্গীর তুরাগ তীরের ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে নিয়ে বিতর্ক তৈরির পর বাধার মুখে তিনি এবারের ইজতেমায় অংশ না নিয়ে চলে যাওয়ায় কাকরাইল মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা জোবায়ের বাংলায় মোনাজাত পরিচালনা করেন। আখেরি মোনাজাতের আগে হেদায়তি বয়ানও বাংলায় করা হয়। হেদায়েতি বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন।

জানা গেছে, ইসলামের দাওয়াতি কাজকে ত্বরান্বিত করতে মাওলানা ইলিয়াছ শাহ (রহ.) দিল্লীর নিজামুদ্দিন মসজিদ থেকে তাবলিগের কাজ শুরু করেন। মাওলানা ইলিয়াছের (রহ.) ছেলে মাওলানা হারুন (রহ.)। তাঁরই ছেলে হলেন মাওলানা সাদ কান্ধলভী। তাবলিগ জামাতের সূচনা করার পর থেকে মূলত: উর্দূতেই ইজতেমায় বয়ান ও মোনাজাত হয়ে আসছিল। ভারতের মাওলানা জোবায়রুল হাসান মারা যাওয়ার পর ২০১৫ সাল থেকে মাওলানা সাদ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন। এর আগে তিনি টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে শুধু তাবলিগের বয়ান দিতেন।

বিশ্ব ইজতেমায় উর্দুতে বয়ান করা ছাড়াও মাওলানা সাদ একই ভাষায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করতেন। কিন্তু বিতর্কের মুখে এবার মাওলানা সাদ বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে না পারায় বাংলায় মোনাজাত পরিচালনা করা হয়, যা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়া ৫২ বছরের তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার ইতিহাসে প্রথম। এছাড়া এবারই প্রথম হেদায়াতি বয়ানও হয় বাংলায়। মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশি আলেম আব্দুল মতিন।

এদিকে নানা বিতর্কের অবসান ঘটাতে মাওলানা সাদ এবারের বিশ্ব ইজতেমায় অংশ না নিয়ে ফিরে যাওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অনুসারীরা। তাই অর্ধশতাধিক বিদেশি মুসল্লি ইজতেমার প্রথম পর্ব সম্পন্ন হওয়ার আগেই ময়দান থেকে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।

প্রায় আধা ঘণ্টারও কিছু বেশি সময় ধরে চলা এই মোনাজাতে মুসলিম জাহানের কল্যাণ কামনা করা হয়। মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। মোনাজাতে অংশ নিতে আসা মুসল্লিদের যেন সমস্যা না হয় সেজন্য আজমপুর, উত্তরাসহ আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাইকের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।

মোনাজাত বাংলা করায় খুব ভালো হয়েছে জানিয়ে ইজতেমায় আসা ঢাকার মতিঝিলের বাসিন্দা ইমদাদুল হক বলেন, ‘অন্যান্যবার আরবি আর উর্দুতে মোনাজাত করা হতো। তখন কিছুই বুঝতাম না। শুধু আমিন আমিন বলতাম। মোনাজাতে হুজুর কী বলতো তা বুঝতাম না। এবার বাংলায় মোনাজাত করায় ভালো হয়েছে।’

উত্তরার আব্দুল্লাপুরে রাস্তায় চটি পেতে মোনাজাতে অংশ নেয়া মোজাম্মেল হোসেন জানান, তিনি সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন। ইজতেমা মুল ময়দানে ঢোকার জন্য চেষ্টা করলেও আব্দুল্লাপুরেই তাকে মোনাজাতে অংশ নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুরুর দিতে মনে হয়েছিল এবারও আরবি আর উর্দুতে মোনাজাত হবে। পরে যখন বাংলায় মোনাজাত করা হলো তখন অনেক ভালো লেগেছে। বাংলায় মোনাজাত করলে ভালো হয়। এতে বুঝতেও সুবিধা হয় আর মনে প্রশান্তিও লাগে।’

আগারগাঁও থেকে বিশ্ব ইজতেমার মোনাজাতে অংশগ্রহণ করতে আসা সাইফুল ইসলাম জানান, ‘যেহেতু আমরা বাঙ্গালি, আমাদের ভাষা বাংলা। বাংলা ভাষাটা বাংলাদেশের সবাই সহজে বুঝতে পারে। তাই বাংলা ভাষায় মোনাজাত করলে মনের আবেগটা অনুভব করতে পারা যায়। তাই প্রতিবছর বাংলাতে মোনাজাত হলে আমরা খুশি হতাম।’

গাজীপুর থেকে পায়ে হেটে ইজতেমার মোনাজাতে অংশ নিতে এসেছেন আওলাদ হোসেন। বাংলায় মোনাজাতে অংশ নিয়ে তিনিও খুশি। তিনি বলেন, প্রতিবছর উর্দূতে মোনাজাত হওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারতেন না। কিন্তু এবার বাংলায় মোনাজাত হওয়ায় মুসল্লিরা সহজে বুঝতে পেরেছেন।

পঞ্চগড় থেকে জামাতবদ্ধ হয়ে ইজতেমায় এসেছেন দেলোয়ার হোসেন। মোনাজাত শেষে ফেরার পথে তিনি বলেন, প্রতিবছর বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ মুসল্লি বাঙ্গালি হওয়ায় বাংলায় মোনাজাত হওয়া উচিত।

শুধু তারাই নন ইজতেমায় আসা যে কয়েকজনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছে তারা সবাই বাংলায় মোনাজাত করায় খুশি হয়েছে। এর পাশাপাশি আগামী প্রতি বছরই যেন বাংলায় আখেরি মোনাজাত করা হয় সে ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

উল্লেখ্য, আগামী ১৯ জানুয়ারি শুরু হবে এবারের ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *