পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ন্যাটো ও ওয়ারশ সামরিক জোট এবং শীতল যুদ্ধ (কোল্ড ওয়ার) এর প্রেক্ষাপটে ’৭০ এর দশকে বিশ্বে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ঘঅগ) ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের গন্ডিপেরিয়ে বিশ্ব নেতায় পরিণত হতে থাকেন। ১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আরজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন ওইসময়ে এর পূর্ণ সদস্য ৭৮টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা। আরও যোগ দেন ২১টি পর্যবেক্ষক দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
এছাড়া বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দেন অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং জাতিসংঘসহ ১১টি আন্তর্জাতিক সংস্থা। ওই সময়ের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আলজিয়ার্স জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন।
ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের সুপরিচিত বাঘা বাঘা নেতা ও বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা তথা মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতারা। তাদের সকলকে ছাপিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোটা সম্মেলনের মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তা, সততা, সুমহান অকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, বাগ্মিতা, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর দরদ এবং সেই তার সৌম্য-কান্তি মুখাবয়ব আন্দোলনের সকল নেতাকে মুগ্ধ করে। সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিতে গিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলেন, ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে শোষক শ্রেণি, আরেক ভাগে শোষিত। আমি শোষিতের দলে।’
ওই ভাষণের পর কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারে বুমেদিন, তৎকালীন যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল ব্রজেস টিটো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ সম্মেলনের নেতারা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। অনেক বিশ্ব নেতারা বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেন।
ওই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু নেতার নেতা, এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষের নেতা তথা বিশ্ব নেতায় অভিষিক্ত হন। তাকে বিশ্ব নেতা হিসেবে সম্মান জানান, ফিদেল ক্যাস্ট্রো। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, আমি হিমালয় দেখিন, তোমাকে দেখিছি। তিনি আরও বলেন, তুমি আজ যে ভাষণ দিলে, এখন থেকে সাবধানে থেক। আজ থেকে তোমাকে হত্যার জন্য একটি বুলেট তোমার পিছু নিয়েছে। ওই সম্মেলনের পর ন্যাম নেতাদের সাথে একটি উষ্ণ ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। সেইসাথে ন্যাম দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে মার্শাল ব্রজেজ টিটো বাংলাদেশ সফর করেন।
বঙ্গবন্ধুর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দৃঢ় ভূমিকার জন্য তিনি বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের নন্দিত নেতায় পরিণত হন আর চক্ষশূলে পরিণত হন সা¤্রাজ্যবাদ তথা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির। তাদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চলতে থাকে। সেইসাথে দেশের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে বিশ্বাসঘাতক খুনি খন্দকার মুশতাকচক্রের। তাদের সম্মিলিত চক্রান্তের পরিণিতি হলো ১৯৭৫ সারের ১৫ আগস্টের ট্রাজেডি, সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কতম ঘটনা সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-।
উল্লেখ্য, কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক ফিদেল ক্যাস্ট্রো ন্যাম সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে যে কথা বলেছিলেন সেই কথা ঠিক দুই বছরের মাথায় সত্য হয়ে যাওয়ায় তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের খবরে গোটা জোট নিরপেক্ষ অন্দোলন, শান্তিকামী, মুক্তিকামী বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। বিশ্ব নেতারা বলেন, তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তাঁর অনন্যসাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে বাংলাদেশই শুধু এতিম হয়নি, বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান নেতাকে।
১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় তখন তিনজনের একটা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের টিম বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাঁদের একজন ব্রায়ান ব্যারন। যাদের তিন দিন শেরাটনে আটকে রেখে তৎকালীন সরকার সরাসরি বিমানবন্দর দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে লিখিত তার সংবাদ বিবরণীতে বলা হয়, ‘শেখ মুজিব সরকারিভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং জনসাধারণের হৃদয়ে উচ্চতম আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। এটা যখন ঘটবে, তখন নিঃসন্দেহে তাঁর বুলেট-বিক্ষত বাসগৃহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারক-চিহ্ন এবং তাঁর কবরস্থান পুণ্যতীর্থে পরিণত হবে’। (দি লিসনার, লন্ডন, ২৮ আগস্ট, ১৯৭৫)।’ আজ টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর সমাধি বাঙালির তীর্থস্থানের মতো রূপ লাভ করেছে। জীবিত বঙ্গবন্ধু অশুভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিপীড়িত মানুষের প্রেরণা ছিল। আজ মৃত মুজিবও বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অশুভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিরন্তর প্রেরণা হয়ে আছেন। আজ শোকাবহ আগস্টে বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এটি সমাপ্ত করার জন্য তার রক্তের উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জাতিকে থাকতে হবে ঐক্যবদ্ধ ।


