বেফাকের দরিদ্র শিক্ষকদের অনুদান প্রসঙ্গে

বেফাকের দরিদ্র শিক্ষকদের অনুদান প্রসঙ্গে

বেফাকের দরিদ্র শিক্ষকদের অনুদান প্রসঙ্গে

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: ছোট বেলায় স্কুলে পড়ার কথা মনে আছে। ইংরেজী ক্লাসে স্যার পড়াতেন” ইংরেজী কর, ডাক্তার আসিবার পুর্বে রোগীটি মারা গেল”। তখন ইংরেজী করতাম। বুঝে আসুক চাই না আসুক, মুখস্ত করে ফেলতাম।

তবে সেই ছোট বেলা থেকে মনের ভিতরে একটা বিষয় বার বার ধাক্কা খায়। বিষয়টা কি? ডাক্তার আসার আগেই রোগী মারা গেল? ইস, বেচারা ডাক্তার যদি একটু আগে আসত, তাহলে রোগী মারা যেতনা। মনে হয় রোগী সুস্হ হয়ে যেত।

মনে মনে সব সময় ডাক্তারকে গালমন্দ করতাম। ডাক্তারের গাফলতির কারণে অসহায় রোগী শেষ হয়ে গেল।

আসলে এ বিষয় গুলো একদম ফেলে দেওয়ার বিষয় নয়। সমাজের বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তারদের গাফলতি দেখা যায়। ডাক্তারদের খাম-খেয়ালীপনার কারনে বহু রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এই করোনা ভাইরাসের সময় তো আরো বেশী অবহেলা চলছে ডাক্তারদের। ঠিকমত কেউ রোগী দেখছেনা। রোগীর সাথে অসাদাচারন করা হচ্ছে। জায়গায় জায়গায় অভিযোগ আসছে, চেম্বার থেকে রোগী বের করে দেওয়া হচ্ছে। কিছু দিন আগে ব্রাম্মণবাড়িয়াতে একজন গর্ভবতী মহিলাকে চেম্বার থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল। যে বিষয়টা নিয়ে তখন সারা দেশে ওঠেছিল সমালোচনার ঝড়।

আচ্ছা যাইহোক, আজকে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি, সেটা হল, আমাদের কওমী মাদ্রাসার বৃহৎ শিক্ষা বোর্ড, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াকে নিয়ে। কেননা, উনারাই এখন জাতির বড় ডাক্তার। জাতির বড় অভিভাবক। বিশেষ করে কওমীর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকদের অভিভাবকত্ব করছেন তারা।

কওমী মাদ্রাসা গুলো বিগত মার্চ মাসের আঠারো তারিখ থেকে বন্ধ হয়েছে। শিক্ষকগণ বেতন ভাতা পান নি আজো। বিশেষ করে মফস্বলের শিক্ষকদের তো বেহাল দশা। হঠাৎ করে মাদ্রাসা বন্ধ হওয়াতে হাজার হাজার শিক্ষক মানবেতর জীপন যাপন করছে।

আমাদের বেফাক অভিভাবকত্ব করলেন। সরকারের অনুদান নেওয়া যাবেনা। কেননা, সরকারের অনুদান নিলে, স্বকীয়তা নষ্ট হবে। উসুলে হাশ্তেগানার খেলাফ। আকাবির আছলাফের নীতি আদর্শের শানের বিপরীত।

কওমীর শিক্ষকগন আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করেছেন। আর কেউ বাড়াবাড়ি করেন নি। কেউ আর সরকারী অনুদান নিতে উদ্যত হয়নি।

ওদিকে বেফাকের পক্ষ থেকে বলা হল, শিক্ষকদের লিষ্ট পাঠান। অনুদানের ব্যবস্হা করা হচ্ছে।ত্রাণ তহবিল গঠন করা হয়েছে। অনেক আশার বাণী আমরা শুনতে পেলাম।

আমরা তো সেই লক ডাউনের মধ্যে অনেক কষ্ট করে মুদাররিসদের লিষ্ট পাঠিয়ে দিলাম। মনে মনে বেফাককে ধন্যবাদ দিলাম, যাক, বেফাক কাজের -কাজ করে যাচ্ছে।

কদিন পরে আবার বেফাকের ঘোষণা আসল, আগের লিষ্ট চলবেনা। নতুন করে আবার লিষ্ট চাই। তবে সেটা হবে দরিদ্র- অস্বচ্ছল শিক্ষকদের লিষ্ট। বেফাক আরো কিছু শর্ত জুড়ে দিল, রাজধানী ঢাকা এবং বিভাগ,জেলা শহরের শিক্ষকগন কেউ সাহায্যের জন্য দরখাস্ত করতে পারবেনা।

একটা ফরম পাঠানো হল, বেফাকের জেলা কমিটিকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হল। সবাই তো মোটামুটি এবার তৈয়ার হয়ে আছেন।

দরিদ্র শিক্ষকদের নামের তালিকা, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর সহ বেফাক থেকে প্রদত্ত ফরম পুরণ করে পাঠানো হল।

আমরা তো এবার আশ্বস্ত হলাম, যাক, গরীব শিক্ষকগন কিছু মনে হয় এবার পাবে। যাদের নাম ঠিকানা পাঠানো হয়েছে, তারাও আশায় বুক বেঁধে আছে, বেফাক যেহেতু এত শর্ত- শরায়েত দিয়ে নামের তালিকা চাচ্ছে, মনে হয় কিছু পাওয়া যাবে।

রমজান প্রথম দশক পার হল, দ্বিতীয় দশক পার হয়ে গেল। ওদিকে যাদের তালিকা পাঠানো হয়েছিল, তারা তো দু একদিন পরপর খোঁচাতে থাকে, হুজুর! কই, বেফাকের থেকে তো কোন খবর এলনা?

আমরা যারা এই দরিদ্র শিক্ষকদের লিষ্ট কার্যক্রম করেছি, খুব বিপাকে। নামের তালিকা নিলেন, কিন্তু এখনো কোন অনুদান আসল না।

গতকাল কাল বেফাকের মিটিং হয়েছে। অনলাইনে নাকি ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিয়েছেন বেফাকের কর্মকর্তারা।

যাতে আলোচনা হয়েছে , ঈদের পরে মাদ্রাসা খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। খুশি হলাম এ সংবাদে। কিন্তু দরিদ্র শিক্ষকদের অনুদানের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। একদম আশাহত হলাম। এত ঢাক- ঢোল পিটিয়ে শিক্ষকদের নামের ফিরিস্তি নিয়ে এখন খোঁড়া অজুহাতে পিছিয়ে যাওয়া হচ্ছে, বড় দুঃখজনক।

দরিদ্র শিক্ষকগণ আশা করেছিলেন, আমাদের মুরুব্বীগণ যেহেতু গরীব – অসহায় উস্তাদদের নামের তালিকা প্রণয়ন করছেন, হয়ত ঈদের আগে কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি।

এখন ঈদের পরে অফিস খুললে চিন্তা করা হবে। এখন নাকি লোকজন নেই। জনবল কম।

বড় আফসোস! এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোন প্রয়োজন ছিলনা। বরং বেফাকের নিরব ভুমিকা পালন করলেই ভাল হত।

শিক্ষকদের দুরাবস্হা। অসহায়ত্বের মধ্যে জীপন- যাপন করছে তারা। আর ওদিকে বেফাক আসছে সাহায্য নিয়ে। আজ না কাল। কাল নয় পরশু। এখন শুনছি ঈদের পরে।

মানে ডাক্তার আসার আগেই রোগীর বারটা বেজে যাবে। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।
লেখক : কওমী মাদরাসার মুদাররিস

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *