ভারতে নিহত মাদরাসা শিক্ষার্থী, নিরব কেজরিওয়াল

ভারতে নিহত মাদরাসা শিক্ষার্থী, নিরব কেজরিওয়াল

কাউসার মাহমুদ : ভারতের রাজধানী দিল্লীতে ৮ বছর বয়সী এক মাদরাসা শিক্ষার্থী শিশু ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় যুবকরা। এই নির্মম ঘটনায় আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হলো ভারতীয় আইন ও ক্ষমতা পরিচালনা। হট্টগোল ও হাঙ্গামা বাঁধিয়ে এইসব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তাদের যে আইন করা হয়েছে তা কতোটা কার্যকর। লাগাতার তো এমন ঘটনা ঘটছেই। শেষবধি এই নৃশংসতার স্বীকার হলো আট বছর বয়সী একজন শিশু।

আসেম হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ভারতের সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মাদরাসার কয়েকজন ছাত্র মিলে পাশের মাঠে প্রতিদিনকার মতোই খেলাধুলা করছিলো। হঠাৎ কয়েকজন এসে তাদের উপর হামলা করে। তাদের মারার চেষ্টা করে। এসময় অন্যরা দৌড়ে চলে গেলেও আসেম পারেনি। ছোট বাচ্চা সে। তার শক্তিই বা কতটুকু। পাষণ্ডগুলো তাকে ধরে ফেলে। বেধরক পেটাতে থাকে। এইটুকু বাচ্চা ছেলেকে এমন মার মারলো তারা! তার উপর আবার মোটরসাইকেলের সঙ্গে তার মাথা ধাক্কা দেয়া হয়। এই আঘাতগুলো সহ্য করতে পারেনি আসেম। লুটিয়ে পড়ে। অজ্ঞান হয়ে গেলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর এ খবর জানাজানি হলে ককর্তৃপক্ষ এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু নিলে হলে হবে কী! এতক্ষণে যে দেরী হয়ে গেছে। মনুষ্যত্বকে ধিক্কার জানিয়ে বিদায় নিয়েছে আসেম। হাসপাতালে পৌঁছুতেই কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে।

শিশু আসেমের মৃতুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোকগ্রস্ত হয়ে আছে মহল্লার সবাই। সবার একটাই আকুতি এই নৃশংস শিশু হত্যার বিচার হোক। সবার ভিতরেই জেগে উঠছে একধরনের ক্ষোভ। তবে কী আসেম হত্যার তদন্তে নামবে পুলিশ! বিচার হবে কী খুনীদের? না এটা অত সহজ নয়। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, এভাবেই বলতে হবে- ভারতে বর্তমানে চলছে উগ্র হিন্দু জাতীয় গোষ্ঠী বিজেপির শাসনামল। এ আমলে মুসলমানের পক্ষে কথা বলবার শক্তিটুকু কার? কেইবা লড়বে এর বিরুদ্ধে! মুসলমানদের কোনঠাসা করতেই তাদের যত প্রয়াস। সেখানে আসেম খুনিদের বিচার অনেক দূরের পথই বলা চলে।

তবুও থামা যাবে না । এ অবস্থায় আসেমের বাবা-মা, আত্মীয়দের স্পষ্ট করে বলা উচিৎ। ‘আমরা ইনসাফ চাই’। এই আওয়াজে সমস্বরে সবাই ডাক তুললে যদি কিছু হয়। মানবতা একটু মুক্তি পাক না! তবে আশঙ্কা যখন এই। এমন নির্মমতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে জনরোষ। তখন একটি স্বার্থান্বেষী দল চাচ্ছে আসেমের পরিবারকে থামিয়ে দিতে। তাদের মহল্লার চারপাশে ব্যাপক পুলিশি প্রহরা বসিয়ে রেখেছে প্রশাসন।

২৬ অক্টোবর জুমআর পরে শহীদ আসেমের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে শোকাতুর দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি। অথচ সবার চোখেই কেমন কষ্ট। সবাই যেন ক্লান্ত। আর পারা যাচ্ছে না। শেষপর্যন্ত একটি শিশুকেই!!

এই ঘটনায় সবচেয়ে আশ্চর্য ছিলো আম আদমি নেতা দিল্লীর প্রধানমন্ত্রী কেজরীওয়ালের নিরবতা। উঠতে, বসতে সবসময় যিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ধুয়ে দেন। এ ঘটনায় সে একদম নির্জীব। একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি সাধারণ মানুষের নেতা দাবি করা কেজরীওয়াল। না সে একটিবারের জন্য সমবেদনা জানিয়েছে নিহত আসেমের পরিবারকে। না সামান্য একটা টুইটও করেছে দুঃখ প্রকাশ করে। নিহতের পরিবারের সাথে দেখা করা তো দূরের কথা। এই সাহস বুঝি কেজরীওয়ালের হয়ই’নি! কারণ, আসেম তো মুসলিম। এতে যদি হিন্দুদের আঁতে ঘা লাগে। যদি নির্বাচনে সমস্যা হয় সাধারণের ভাব ধরে ভোট কুড়ানো এই দিল্লী নেতার। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাই তো তার ভরসা।

অথচ এই কেজরীওয়ালই কি না লক্ষ্মৌতে তিওয়ারি হত্যার ঘটনায় শক্ত টুইট করে বিজেপির কাছে প্রশ্ন রেখেছিল ‘ বেচারা তিওয়ারি তো একজন হিন্দু ছিল, তাহলে কেন মারা হলো তাকে’? কিন্তু এখানকার চিত্রটা কেমন উল্টো। একটি মুসলিম শিশু হত্যায় তার অন্তরে এতটুকু মায়া জন্মায়নি। তারই শাসনাধীন এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড অথচ তার কোন পদক্ষেপ নেই। রাজ্যের কর্নধার হিসেবে মুসলিমদের সাথে এই তার আচরণের নমুনা। তাই এখন আর বুঝতে বাকী নেই যে মুসলমানরা কতটুকু নিরাপদ আছে সেখানে? শুধু দিল্লীতেই নয় এই অবস্থা সারা ভারতেই। অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর সহিংসতা ছড়ানোর এক নিদারুণ চরিত্র দিনদিন প্রকট হয়ে উঠছে ভারতের সবখানে।

এ ঘটনায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে হত্যাকারীদের বলা হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাই তাদের জেলে নয় পাঠানো হয়েছে ‘চাইল্ড হোমে’। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, কয়েকজন যুবক এসে আসেমদের উপর হামলা করে। সবাই দৌড়ে চলে গেলেও আসেম পারেনি। তখন তাকে বেধরক পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

আসেম দিল্লির মালভিয়া নগর এলাকার দারুল উলুম ফরিদিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিলো। এ ঘটনায় মাদরাসার শিক্ষক আলী জোহর জানান, আসেম হিফজ বিভাগে পড়তো এবং খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। তাদের মাদ্রাসা এবং একটি মসজিদ মিলে যে জায়গাটি রয়েছে সেটি স্থানীয় কিছু লোক দখলের জন্য বহুদিন ধরে পাঁয়তারা করছে। মাঝে মাঝে কিছু যুবক মাদ্রাসার উঠানে এসে জুয়া খেলে। কখনো মদের বোতল ছুড়ে মারে। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ধারণা, কোনো কুচক্রী মহল যুবকদেরকে উস্কিয়ে দিয়ে মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে বিবাদ তৈরির মাধ্যমে এটা দখল করতে চায়।

তবে এ কথা নিশ্চিতই বলা চলে, এই নৃশংসতা থামবে না। ভারতে মুসলমানরা সর্বাংশেই অনিরাপদ। তাদের জীবন, ধর্ম, সম্পদ, ইজ্জত কোনটারই নিশ্চয়তা দেয়নি ভারতীয় প্রশাসন। মুসলিম বিদ্বেষী কট্টর বিজেপি সরকারের মদদে নানা সময়ে মুসলমানদের উপর অত্যাচার করছে উগ্রবাদি বিভিন্ন কট্টর হিন্দু সম্প্রদায়। সত্যিই মানবতা ভুলণ্ঠিত ভারতে। এই প্রহসনের শেষ কােথায়!!

তথ্য সূত্র : এনডিটিভি, ডেইলি আখবারে মাশরিক, ভারত
সম্পাদনা : মাসউদুল কাদির

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *