ভাষার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতি-রাষ্ট্র গঠন

ভাষার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতি-রাষ্ট্র গঠন

ভাষার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতি-রাষ্ট্র গঠন

মা ন জু ম  উ মা য়ে র

মাতৃভাষা বিতর্ক, জাতিগঠন চিন্তা এবং ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব (১৯৪৮-৫২) একসূত্রে গাঁথা। আর এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়েই বাংলাদেশে বাঙালি তার নিজস্ব রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছে এবং ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৯-এ ভাষার মর্যাদা, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে, জীবন বিসর্জন দিয়েছে এবং ১৯৭১-এ মুক্তির লড়াইয়ে অংশ নিয়ে ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মাহুতির বিনিময়ে স্বাধীন, সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশর অর্জনকে সম্ভব করেছে।

এখানে উল্লেখ্য, ভাষা আন্দোলনের অমিত শক্তি ও সম্ভাবনা ছিল বহুমাত্রিক। শুধু বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যের মধ্যেই এর মূল নিহিত ছিল না। এর লক্ষ্য ছিল হাজার বছরের বাঙালি জীবনের প্রগতিশীল অন্তঃসারকে অন্বিত করে শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ ও ইহজাগতিক সাংস্কৃতিক মুক্তধারার সৃষ্টি করা। ভাষা আন্দোলনের নেতা-কর্মী ও অংশগ্রহণকারীদের ভাবনায় মূল লক্ষ্য ছিল নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তার সার্বিক বিকাশ। সেটি পাকিস্তানের ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে জাতিগত ত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ভিত্তিতে হতে পারত কিন্তু পাকিস্তানের স্বৈরশাসকরা পূর্ব বাংলাকে স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার দেয়ার পরিবর্তে জাতিগত নিপীড়নের পথই বেছে নেয়ায় সে আশঙ্কা বাতিল হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, বিষয় হলো, জিন্নাহ-লিয়াকত আলী ও অন্যদের বাংলাদেশের ওপর উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার অপতৎপরতাকে প্রত্যাখ্যান করে মাতৃভাষা বাংলার অনিবার্যতাকে তুলে ধরেন। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকেই বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বিতর্কের সুবাদে বা পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে শাসকদের উর্দু চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে ইসলামী প-িতদের যেসব বক্তব্য আসে তা ছিল সময়োপযোগী ও যুক্তিনিষ্ঠ।
অন্যদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষার প্রশ্নটিকে জাতিগঠনের নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন। মুসলমান ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি বলেন : ‘ভুলিয়া যাও কেন, তোমরা বাঙ্গালী? তোমাদের ধমনীতে আর্য্য, মোঙ্গলীয়, দ্রাবিড়ী, আরবী, পারসী, আফগানী ও তুর্কী রক্ত মিশ্রিত আছে’। শহীদুল্লাহর লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে বাঙালি মুসলমানের সম-অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘একজাতি গঠন’কে সম্ভব করে তোলা। একজাতি অর্থাত্ সমন্বিত বাঙালি জাতিগঠনের জন্য তিনি বাঙালি মুসলমানকে দেশীয় নাম গ্রহণের পরামর্শও দিয়েছিলেন। এবং এই জাতিগঠনের মূল ভিত্তি যে হবে বাংলা ভাষা সে সম্পর্কে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আর তাই বাংলা ভাষার ওপর অন্য ভাষা চাপিয়ে দেয়াকে তিনি বাংলাদেশে গণহত্যার শামিল বলে মনে করেছিলেন।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, মধ্যযুগে ভাষা বিতর্কে যে আন্দোলনের সূচনা যার লড়াকু যোদ্ধা ছিলেন সপ্তদশ শতকের সন্দ্বীপের কবি আবদুল হাকিম তার তাত্ত্বিক উত্তরসূরি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাকে জাতিগঠন প্রক্রিয়ার কাঠামোর মধ্যে বিন্যস্ত করেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সেই ধারাকে ভবিষ্যতের বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে বীজাকারে প্রত্যক্ষ করেন মনস্বী লেখক এস ওয়াজেদ আলী (ভবিষ্যতের বাঙ্গালী) ও সমাজবিজ্ঞানী নাজমুল করিম (সমকাল ৫৭)। আর এদের অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন করে তার সঙ্গে দুঃখী, বঞ্চিত বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রাম ও দেশগঠনের স্বপ্নকে রূপায়িত করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথের (আমার সোনার বাংলা) প্রেরণা, নজরুলের (নমঃ নমঃ নমঃ ‘বাংলাদেশ’ মম এবং জয় বাংলা) উদ্দীপনাময় দেশপ্রেম, তিতুমীর-সূর্যসেনের বীরত্বব্যঞ্জক স্বাধীনতার লড়াইয়ের দাঙ্গা এবং বাঙালির পুরাণের চাঁদ সওদাগরের মাথা না নোয়ানোর দার্ঢ্য এবং বাংলা সাহিত্যের তোরাপ ও হানিফের সাহস ও বীর্যবত্তাকে একত্রিত করে বাঙালির এক অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়ে শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠা করেন বাঙালির উদার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

এই রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার ফলেই বাঙালি একটি এথনিক, কম্যুনিটি থেকে নেশনে পরিণত হয়েছে। উপমহাদেশে বহু বড় বড় এথনিক কম্যুনিটি আছে, যেমন- পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু, গুজরাটী, তামিল, তেলেগু, মারাঠী, বাঙালি ইত্যাদি। কিন্তু তারা কেউ নেশন বা জাতি এবং নিজস্ব রাষ্ট্রের অধিকারী নয়। একমাত্র বাঙালিই নিজস্ব রাষ্ট্র এবং নেশনের অধিকারী। বাঙালির ভাষা, তার জন্য আন্দোলন এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই অসম্ভব সাধন সম্ভব হয়েছে। আর এখন তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আরও সার্বিক বিকাশ ঘটে চলছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *