ম. জাভেদ ইকবাল : বাজার অর্থনীতির যুগে নিরাপদ, গুণগত মানসম্পন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য ও সেবা পাওয়া প্রত্যেক ভোক্তার অধিকার। ভোক্তা অধিকার বর্তমান সময়ে একটি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন দেশ আইনও পাস করে। বাংলাদেশেও ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও ক্রমবিকাশমান বাজার ব্যবস্থাপনার দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজগুলো প্রতিরোধ করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। বেসরকারি সংস্থা ক্যাব (কনজুমারস এসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ) ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশকে নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। অবশেষে নবম জাতীয় সংসদে ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ প্রণয়ন করা হয় এবং ২০১০ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ গঠিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদের চেয়ারম্যান হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
আইনটি বাস্তবায়নে জনসচেনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, উপজেলা, ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনটি বাস্তবায়নে সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি কাজ করে যাচ্ছে। একটি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, অন্যটি জেলা প্রশাসন। অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ, ক্যাব প্রভৃতি সহায়তা করে থাকে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বর্তমানে দুটি পদ্ধতিতে কাজ করে। সরাসরি বাজার মনিটরিং, আর অন্যটি হলো ভোক্তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে শুনানির মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি।
ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ অনুসারে একজন ভোক্তা পণ্য ক্রয় করে যদি ওজনে কম, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল পণ্য, বাটখারায় কম ওজন, নকল পণ্য, মিথ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা, অতিরিক্ত দাম নেওয়া, অবৈধ উপায়ে পণ্য উৎপাদন, পণ্যের মোড়কে বিস্তারিত বিবরণ না লেখা থাকে- এগুলোর শিকার হন তাহলে ভোক্তা হিসেবে তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপযুক্ত প্রমাণসহ (দ্রব্য ক্রয়ের রসিদ কিংবা উপযুক্ত দলিল) লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। এই আইনের অন্যতম একটি দিক হলো, যদি বিক্রেতা দোষী প্রমাণিত হয় তবে বিক্রেতার ওপর জরিমানাকৃত অর্থের শতকরা ২৫ ভাগ ভোক্তাকে প্রদান করা হবে। অর্থাৎ আইনটি অত্যন্ত জনবান্ধব। এই আইনের মাধ্যমে জনগণকে অনেকখানি ক্ষমতায়িত করা হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা একটি ত্রিপাক্ষিক বিষয় যার সাথে জড়িত রয়েছে উৎপাদনকারী, বিক্রেতা এবং ভোক্তা বা ক্রেতা। শুধু জেল জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য ভোক্তা তথা সাধারণ জনগণকে যেমন সচেতন হতে হবে একইভাবে উৎপাদকারী ও বিক্রেতাকেও সচেতন হতে হবে। কারণ আমরা সকলেই ভোক্তা। উৎপাদনকারী বা বিক্রেতা এবং ভোক্তার সমন্বিত আন্তরিক প্রচেষ্টাই ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এ কারণে বাজার মনিটরিং-এর পাশাপাশি সাধারণ জনগণ তথা ভোক্তা এবং উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করার বিষয়টিকে বর্তমানে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর এ উদ্দেশ্যে শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের হাটবাজার পর্যন্ত পোস্টার, প্যাম্ফলেট, লিফলেট, স্টিকার বিতরণ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের সাথে মতবিনিময় সভা, গণশুনানি ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিবছরই হোটেল রেস্টুরেন্ট মালিক, বেকারি মালিক, ফল ব্যবসায়ী, মিষ্টি ব্যবসায়ী, কসমেটিকস দোকান মালিক, এলপিজি ডিলার ও পরিবেশক সমিতি এবং ইলেক্ট্রনিক পণ্যসামগ্রী ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মতবিনিময় করে যাচ্ছে।
জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ; ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ, পুলিশ প্রশিক্ষণ ও আনসার ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে এবং বাজার এলাকায় মতবিনিময় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রতিটি ইউনিয়ন কমিটিকে কার্যকর করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এত সব উদ্যোগ স্বত্ত্বেও বিশাল ভোক্তার এ দেশে প্রতিনিয়ত আমাদের নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যেমন- ইটের পরিমাপে কম দেওয়া, পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি কম দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অননুমোদিত ঔষধ বিক্রি করা, মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক ও সার বিক্রয়, মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার, অধিক বিদ্যুৎ বিল, চালের বস্তা ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য প্রস্তুত, নকল ঔষধ ও কসমেটিকস তৈরি ও বিক্রয়, খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের ব্যবহার, পঁচা-বাসি খাদ্যদ্রব্য বিক্রি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য সংরক্ষণ ও তৈরি, কলা পাকাতে কার্বাইড ব্যবহার, মোবাইল ডাটা প্যাকেজ নিয়ে প্রতারণা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রতারণা, পরিবহণখাতে স্বেচ্ছাচারিতা, দই ও মিষ্টির প্যাকেটের অধিক ওজন, সোনালি মুরগিকে দেশি মুরগি বলে বিক্রি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল ব্যবহার, প্রশিক্ষণবিহীন টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে ল্যাব টেস্ট ইত্যাদি।
বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্মার্ট পণ্য এবং ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থার পরিসর অত্যন্ত সীমিত হলেও ধীরে ধীরে পরিধি বাড়ছে। ইতিমধ্যে ই-কমার্স, ই-স্বাস্থ্য, ই-টিকেটিং, ই-ভ্রমণ, ই-সার্ভিসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এক্ষত্রে যথাযথ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন সেট, ইন্টারনেট ডাটা প্যাকেজ, রাইড শেয়ারিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-ব্যাংকিং, এটিএম, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডসহ স্মার্ট ডিভাইসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
পরিশেষে উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী বা বিক্রেতা যেই হই না কেন সকলের আগে আমরা সবাই ভোক্তা। সবাই মিলে নিজেদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করার জন্য একসাথে কাজ করে যাওয়া হোক সকলের মূল লক্ষ্য। জনসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আইনটি বাস্তবায়নে জনসাধারণকেই এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী


