দিল্লীর নিজামুদ্দীন মারকাযের আমীর মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর বংশধর মাওলানা সাদ কান্ধলবীর বিরোধিতা করতে গিয়ে বিশ্ব তাবলীগ এমারত ও আলমী শূরার নামে বিভাজনের মুখে এখন তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম। ঐক্যের কান্নাধ্বনি এখন বাতাসে বাতাসে। উম্মাহর মধ্যকার এই বিভাজন রুখতে কী করণীয় আছে? বর্তমানে মসজিদে মসজিদে যে গণ্ডগোল আর শোরগোল চলছে তা কী নিরসনের কোনো পথ নেই? সেসব বিষয়ে স্পষ্ট কিছু পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার গ্র্যান্ড ইমাম শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।
গুণী এই চিন্তাশীল আলেমের মুখোমুখি হয়েছেন পাথেয় টোয়েন্টিফোরডটকমের সহকারী সম্পাদক মাসউদুল কাদির ও সহসম্পাদক কাউসার মাহমুদ।
নিচে পাঠকের উদ্দেশে চুম্বুকাংশটুকু তুলে ধরা হলো-
পাথেয়: বর্তমান কিছু পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে চাই। আমরা শুনেছি, আপনি তবলীগে এক সাল লাগিয়েছেন। এটা কত সালে?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: একটানা সাল লাগাইনি আমি। তবে খণ্ড খণ্ড করে বহু সময় লাগিয়েছি।
পাথেয়: তখন কি সাল লাগানোর রেওয়াজ ছিলো?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : হ্যাঁ! ছিলো।
পাথেয়: ভারতে দারুল উলূম দেওবন্দে পড়তে গিয়ে কি আপনি তাবলীগে সময় লাগিয়েছিলেন?
ফরীদ: হ্যাঁ! আমি তো দারুল উলুম দেওবন্দে হালকার আমিরও ছিলাম এবং দিল্লী নিযামুদ্দীন মারকাযে কিছু দিন সময়ও লাগিয়েছিলাম।
পাথেয়: নিযামুদ্দীন তখনও কি আলেমদের তত্ত্বাবধানেই চলতো?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : নিযামুদ্দীন সবসময়ই আলেমদের তত্ত্বাবধানেই চলেছে, এখনও চলছে। বরং পাকিস্তানের রায়বেন্ডে আলেম ছাড়া অন্যদের প্রভাব ছিলো বেশি। এমনকি দীর্ঘসময় যারা সেখানে আমীর ছিলেন, তারা অনেকেই আলেম ছিলেন না। যেমন, বর্তমানে হাজী আবদুল ওয়াহাব সাহেব। তিনি বুযুর্গ ও দায়ী হিসেবে প্রসিদ্ধ কিন্তু এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক আলেম হিসেবে প্রসিদ্ধ নন। এর আগেও যিনি ছিলেন বাবা বশির পাকিস্তানের আমীর, তিনিও ইংরেজি শিক্ষিত ছিলেন কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক আলেম ছিলেন না। পাকিস্তানিদের ওখানে খুব কমই আলেমরা আমীর ছিলেন। বিশেষত ঢাকার কাকরাইলে বড় হুযূর মাওলানা আবদুল আজিজ রহ.-এর পর ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মুকিত রহ., জনাব আজিজুল মকসুদ, ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম প্রমুখরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
পক্ষান্তরে দিল্লীর নিজামুদ্দীনে সবসময় আলেমগণের নেতৃত্বেই তাবলীগের কাজ এগিয়ে চলেছে। গাইরে আলেমদের নেতৃত্ব কখনো ছিল না বা দেখা যায়নি।

পাথেয়: আমরা একটা তথ্যের ভিত্তিতে জেনেছি, ৪৭ এ- মানে দেশভাগের সময় পাকিস্তানীরা এবং মুসলিম লীগ মানসিকতার যারা ছিলেন তারা দাবী করছিলো যে, একটি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। তখন রায়বেন্ডে তাবলীগ জামাতের কেন্দ্র হোক- এ লড়াই শুরু করেছিল?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : লড়াই তো না, তারা চেয়েছিল। কিন্তু তখনও যেহেতু বড়ো বড়ো উলামায়ে কেরাম জীবিত ছিলেন। হযরত শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ:,উনাকে মৌলিকভাবে তাবলীগের অভিভাবকই বলা যায়, আর হযরত আবদুল কাদির রায়পুরী রহ., হযরত শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.। তখন আমীর ছিলেন মাওলানা ইলিয়াস রহ.-এর ছেলে মাওলানা ইউসুফ রহ.। তিনি তাদের পরামর্শেই পাকিস্তানের রায়বেন্ডে চলেআশাকে গ্রহণ করেন নাই। দিল্লীতে থেকে গিয়েছিলেন। তাই তখনও বিশ্ব তাবলীগের মারকায হিসেবে রায়বেণ্ড হয়নি। দিল্লী আগেও দিল্লী ছিলো, তখনও দিল্লী ছিলো, এখনও দিল্লী আছে। পাকিস্তানে রায়বেণ্ড একটি শাখা হিসেবে ছিলো। যেমন ঢাকায় আমাদের কাকরাইল একটি শাখা মারকায হিসেবে কাজ করছে।
পাথেয়: ইসলামের মূল দর্শন’টা আসলে কী? এটা কি শুরায়ী নেযাম নাকি আমীরি নেযাম?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : মৌলিকভাবে এ দুটোকে আলাদাভাবে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। ইসলামে আমীর আছে, আমীর হয়, আমীরেই চলে। এমারতের মাধ্যমেই চলছে। কিন্তু আমীরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তুমি তোমার শুরার মাধ্যমে পারিচালনা করবে। রাসূল সা. আমীর ছিলেন নিঃসন্দেহ। রাসূল সা.কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে ‘শাবিরহুম ফিল আমর’। তাই কেবল শুরার মাধ্যমে চলছে এ কথাও বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কেবল এমারতে চলছে এটিও বলা ঠিক না। আমীরের সাথে একটা শুরায়ী নেযামও ছিলো। এভাবেই চলে আসছে। রাসূল সা.-এর যমানায় অধিকাংশ বিষয়ে হযরত আবুবকর রা., হযরত উমর রা.এবং অন্যান্য সাহাবীদের সঙ্গেও মাশওয়ারা করতেন। বিশেষ করে আযানের বিষয়টিতে সাধারণ সাহাবীদের সঙ্গে রাসূল সা. আলাপ করেছেন। ঠিক এমনিভাবে হযরত আবুবকর রা., হযরত উমর রা., হযরত উসমান রা.-উনাদের প্রত্যেকের আমলেই শুরা ছিলো। এ শুরাটাকে আমীরই নির্বাচন করতেন।
মতবিরোধ তো সবসময়ই থাকে। এখানেও যে মতবিরোধ হয়েছে এর সমাধান আসলে যাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে অর্থাৎ তাবলীগওয়ালাদের মধ্যে যারা এই মেহনতের সঙ্গে শামিল তারাই এর সমাধান করতে পারবে। বাইরে থেকে এর সমাধানের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
পাথেয় : বাংলাদেশে একটি বিষয় নিয়ে আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি। সেটা হলো, মাওলানা সাদ কান্ধলবী এবং নিযামুদ্দীন মারকাযকে নিয়ে বাংলাদেশে হট্টগোল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিছুদিন আগে হযরতুল আল্লাম মাওলানা আহমদ শফীর নেতৃত্বে মোহাম্মদপুরে ‘ওয়াজাহাতি জোড়’ নামে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও সেখানে কাকরাইল মারকাযের ১১ শুরা সদস্যের কেউই উপস্থিত ছিলেন না। অথবা সেখানে বক্তৃতাও করতে দেখা যায়নি তাদের কারও। তো আমরা জানতে পেরেছি ওই সম্মেলনের পরে মসজিদে মসজিদে একটি বিবাদ শুরু হয়েছে। এটা নিরসনের উপায় কী আসলে?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আগে জানতে হবে এই সমাবেশ কি তাবলীগের উনারা ডেকেছিলেন নাকি অন্য কেউ? যদি তাবলীগের উনারা ডেকে থাকেন, তাহলে নিশ্চয় তাবলীগের মনোনীত শুরা সদস্যরা থাকতেন। যেহেতু তাবলীগের উনারা উপস্থিত ছিলো না। তাই এতে বুঝা যায় এটা তাবলীগের কোন জোর ছিলো না। বরং সম্পূর্ণ আলাদা উলামায়ে কেরামের নিজস্ব সম্মেলন ছিলো। আর উলামায়ে কেরামের মধ্যেও কিছু রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী লোকদের সমাবেশ ছিলো। যেখানে অতীতেও তারা হযরত আহমদ শফী মাদ্দাযিল্লুহুল আলী সাহেবের নামের অপব্যবহার করেছে। এখানেও তার ব্যক্তিত্বকে তারা ব্যবহার করেছে। এই স্বার্থান্বেষী মহল। আর ঝগড়া হওয়া মতবিরোধ হওয়া এগুলো তো আছেই। মতবিরোধ তো সবসময়ই থাকে। এখানেও যে মতবিরোধ হয়েছে এর সমাধান আসলে যাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে অর্থাৎ তাবলীগওয়ালাদের মধ্যে যারা এই মেহনতের সঙ্গে শামিল তারাই এর সমাধান করতে পারবে। বাইরে থেকে এর সমাধানের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
পাথেয় : সম্প্রতি আমরা একটি মসজিদে দেখেছি একজন মুহতামিম সাহেব ছোটছোট মাদরাসার ছাত্রদের পাঠিয়ে মসজিদে তালীম বন্ধ করে দিচ্ছেন। এ কাজগুলো আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : একটা চালু কাজকে বন্ধ করা, যে কাজে ফায়দা হচ্ছিল। যেমন কেউ যদি একটি চালু মাদরাসা বন্ধ করে দেয় কেউ কি গ্রহণ করবে এ কাজ! যে, এ মাদরাসায় পড়াশুনা ভালো হচ্ছে না তাই মাদরাসা বন্ধ করে দিলাম। তেমনি এ কাজগুলো বন্ধ করা উচিৎ হবে না, কারণ কাজগুলোর সাথে তাবলীগের কর্মসূচি জড়িত। এ কাজগুলোর বাইরে তো আর তাবলীগের কোন কর্মসূচি নেই। হ্যাঁ! আলেমরাও যদি পরিচালনা করে, তাহলে এই কাজের যে মেজাজ আছে সে অনুযায়ী পরিচালনা করলে তো ভালো কথা। আলেমদের নেতৃত্ব যদি চলে আর তা যদি তাবলীগের মেজাজ অনুযায়ী হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
দারুল উলুম দেওবন্দ কি তাকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বাইরে মনে করেছে? দারুল উলুম থেকে এমন কোনও ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে বলে তো আমার জানা নেই যে, মাওলানা সাদ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত থেকে খারেজ হয়ে গেছে।
পাথেয়: আপনি মাওলানা সাদ কান্ধলবী সাহেবকে চিনেন, জানেন ইজতেমার সময় কাছে থেকে দেখেছেন, দিল্লীতে দেখেছেন। তো হযরতকে কি আপনি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বাইরে মনে করেন?
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : দারুল উলুম দেওবন্দ কি তাকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বাইরে মনে করেছে? দারুল উলুম থেকে এমন কোনও ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে বলে তো আমার জানা নেই যে, মাওলানা সাদ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত থেকে খারেজ হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তো দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে একমত এ বিষয়ে। দারুল উলুম দেওবন্দ তাকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত থেকে খারেজ মনে করে না, তাই আমিও মনে করি না। ভুল তো সবারই হয়। আম্বিয়া কেরাম সা. ছিলেন মাসূম। সাহাবায়ে কেরাম রা. ছিলেন মাহফুজ। এরপর আর কেউ মাহফুজও নেই। সুতরাং ভুল হতেই পারে। এখন যারা উলামায়ে কেরাম তাদের কি কোনও ভুল নেই নাকি? যারা দেওবন্দে পড়াচ্ছেন তাদের কি কোনও ভুল নেই নাকি? ভুল তো অনেকেরই হয়। দেওবন্দের শাইখুল হাদীস মাওলানা সায়ীদ পালনপুরী। উনারও অনেক ভুল আছে। ইলমী বহু ভুল আছে উনার। তাই বলে এটাকে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করবো নাকি আমি! মানুষের ভুল হয়। সাদ সাহেবেরও ভুল ছিলো, তিনি তা থেকে রুজুও করেছিলেন। তো একজন যখন তাওবা করে, তখন তার উপর আর প্রশ্ন থাকতে পারে না। এখন তাওবা আল্লাহ কবুল করেছেন কি করেন নি এই মাথাব্যথা তোমার না, এ বিষয় আল্লাহর। আল্লাহ যা মর্জি করবেন তাই হবে। আল্লাহ তো বান্দাকে ডেকেই বলছেন, তাওবা করলে মাফ করে দিবে।

পাথেয়: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আপনাকেও ধন্যবাদ
আরও পড়ুন এ সংক্রান্ত খবর…
দেওবন্দ ও আহলে দেওবন্দের পথই আমাদের পথ | মাওলানা সাদ
বক্তৃতায় মাওলানা সাদের নাম নিলেন না আল্লামা আহমদ শফী
ওয়াজাহাতী জোড়ে ছিলেন না তাবলীগী ১১ শূরা সদস্যের কেউ
তাবলীগ কারো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জায়গা নয়
সাক্ষাৎকারের ভিডিও দেখতে পারেন, ইকরা মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গেও থাকতে পারেন সাবস্ক্রাইব করে..


